মেয়েটি আমার গ্রহ, আমি তার আশ্রিত

আশরাফ জুয়েল



মা এক বিষণ্ণ নৌকা। শুধু ভাসে, ভাসতে ভাসতে কোথায় যে চলে যায়? পাখি হয়ে ফিরে আসে। পাখি! সেও তো এক নৌকা – মায়ের মতো; উড়তে উড়তে দানা বাঁধে, ফিরেও আসে, এসেই জিজ্ঞেস করে, তোর পশম কই বাবা? আমি তখন আকাশ হয়ে যায়, ভ্যাকুয়াম ভর্তি স্নেহের আঁচলে ঘুড়ি হয়ে যাই। মা, রান্নার অভ্যাসে ঢুকে যায়, তার হাতের তালুতে পৃথিবীর সঞ্চয় জমা হয়, আর আমি বেয়াড়া সুতোর ভঙ্গিতে এসে তার বুকে সেঁটে যাই। আমাদের নদী তখন স্রোতের গন্ধভেজা আদরে আমাকে স্তন শেখায়, আমি পুষ্টি হই, অংক ফেল করা ছাত্র, হয়ে উঠি আর্কিমিডিস, কি আশ্চর্য! কাদার স্বার্থে মা হস্তশিল্প, আমাদের, বালিশের ঢেউয়ে পৃথিবী লুকায়, আমি আর মা হয়ে উঠি পরস্পরের সূবর্ণদ্বীপ, আমি আর মা তখন থেকে জাহাজ আঁকি-
...
আব্বা ফোন করেছে। কাঁদছে। আমি ফোন কেটে দেই। আবার ফোন আসে। বাতাসের চুল ধরে ভেসে আসে সেই কান্না। আমার হাসি পায়, আব্বা কাঁদতে শিখেছে কবে থেকে? একটা ঘড়ি এসে আমার ঘোরের ভেতর ঝুপ করে নেচে ওঠে। রাত সোয়া বারোটা? আব্বা হোক বা না হোক- একজন মানুষ, যে কোনদিন কেঁদেছে বলে মনে হয় না, সে কাঁদছে- ফোন ফেরাই, আব্বার মতন কেউ একজন কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘তোর মা আগুনে পুড়ে গেছে।’ আগুন আমার প্রিয়, মায়ের মতন প্রিয়- অতএব দুই প্রিয় জিনিস মাখামাখি খাচ্ছে- আমার আনন্দ উপলব্ধি শবেবরাত রাতের পটকার শলাকা হয়ে দিক হারায়। কিন্তু আব্বার কান্না যেহেতু আমি কোনদিন শুনিনি, সন্দেহের পোর্টেট আমার দৃষ্টি ক্ষেতে বীজফাটা শিশুর হয়ে নাচে।
...
মেয়েটি তের বার বয়স খেয়েছে- তারপর হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়ার সাথে তার তফাৎ ঠিক তের। এরপর আর বয়স দোল উৎসবে মেতে উঠেনি, বরং কোলের ভেতর ভাসার চেষ্টা করছে আরেক নৌকা। তেরবার বয়স খাওয়া মেয়েটি বন্যা চেনা আরম্ভ করেছিল সবে! এর ভেতরই বাঁধ? হোক, তবুতো উজানে কিছু জমা হচ্ছে। উজান আর মেয়েটি নিজেদের বয়স বাড়াতে লুডুর ঘুঁটি হয়ে যায়- ঘুরতে ঘুরতে ঘরে, ঘুরতে ঘুরতে বাহির, ঘুরতে ঘুরতে পাকা, ঘুরতে ঘুরতে কাঁচা। জোড়া হয়ে হাঁটছে ওরা। পৃথিবী ভাসান দেয়া নুন, মানুষের প্রিয় নুন, গলে যায়, দেহ গলে, দেহ ফোলে- ভেতরে কে যেন হাসছে, খেলছে, কথা বলছে! একুশ হতে না হতেই মেয়েটি মোম-গলা শিখে গেছে বলে তার সে কি আনন্দ। সে এখন আর বয়সের জন্য লুডু খেলে না। একদিন আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম মেয়েটি আমার গ্রহ, আমি তার আশ্রিত, আমিও নৌকা-
...
মা একদিন সমুদ্র টাঙিয়ে আমাকে তাতে ভিজতে দিলেন, আমার জ্বর বকবক করছিল বলে। তখন থেকেই মা সম্পর্কে আমার ধারণা ‘মা’ হয়ে গেছে। এরপর থেকে আমি জীবনের সমস্ত সঞ্চয় শুকিয়ে সমুদ্র দেখতে যাই- পৃথিবীর তামাম দেশের সমুদ্র- দেখতে যাই কথাটা ভুল, আসলে সমুদ্র খুঁজতে যাই, করুণা ছিটিয়ে ফিরে আসি আমি, কোথায় সমুদ্র? শুধু কি কিছু ঢেউকে সযত্নে তুলে এনে সৈকতে আছড়ে ফেলার নাম সমুদ্র? না। মোটেও তা না। তা না বলে আমি পৃথিবীর কোথাও সমুদ্র খুঁজে পাইনি। ঢেউকে ধারণ করতে পারার নাম সমুদ্র। অতএব পৃথিবীতে একটিও সমুদ্র নেই আমার মা ব্যতীত।
...
আমি শেষবারে আব্বার কল এটেন করি। কান্নার কানাগলিতে ঢুঁ মেরে দেখি সত্যি আমার আব্বা কাঁদছে। আমার মা পুড়ে গেছে বলে কাঁদছে না- তার স্ত্রী পুড়ে গেছে বলে কাঁদছে। আমার ভীষণ আনন্দ হয় তখন, আমি হাসতে হাসতে পাথর হয়ে যাই, আমি আব্বাকে বলি, আরও কাঁদুন। আমি আব্বাকে বলি, আমার মায়ের জন্য আপনার কাঁদার প্রয়োজন নেই। কাঁদুন, আপনার কান্না আমার খুব ভালো লাগছে- কাঁদুন প্লিজ, আপনার সন্তানের মা পুড়েছে বলে কাঁদছেন না জেনে খুব আনন্দ লাগছে আমার। আব্বা আপনি আরও কাঁদুন, মা পুড়েছে তো কি হয়েছে? আমার মা আজ একজনের স্ত্রী হতে পেরেছে, এই আনন্দে আমি হাসতেই থাকি- পাথর হয়ে যাওয়া আমার হাসি ফেটে অনেক অনেক মা আমার দিকে উড়ে আসতে থাকে...! আমি দুই হাতে কয়েকশো নদী ধরে ভীষণ আনন্দচিত্তে আমার মায়ের মত একটি মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি...