দূর বাস, অপেক্ষা নিঃশ্বাস

ফেরদৌস নাহার



ক.
প্রতিবার আমার উড়োজাহাজটি যখন বাংলাদেশের মাটি থেকে ধাপে ধাপে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে, বুকের ভেতর তখন এক না-বর্ননা করতে পারা কষ্ট চাপে চাপে বাড়তে থাকে। এই কষ্ট-ব্যথা আসলে কার জন্য! পেছনে ফেলে আসা জীবনের জন্য, দেশের জন্য, নাকি অন্য কিছুর জন্য। বিমানের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, ঢাকা শহর ক্রমশ দৃষ্টি থেকে মিলিয়ে যায়। আমার চোখের জল তাকে আরও ঘোলাটে করে দেয়, আরও ঝাপসা, ধুয়ে যেতে থাকে সব ছবি। আমি ‘মা!’ বলে মাথা নিচু করে চোখ চেপে ধরি। কখনো পাশের সিটে বসে থাকা অচেনা কোনো মেয়েকেও অঝরে কেঁদে দেখি। আমরা কেউ কাউকে চিনি না। কিন্তু এ মুহূর্তে খুব আপন কেউ হয়ে পাশাপাশি কাঁদছি। আমরা দেশ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। এক একটি অনির্দিষ্ট সময়ের বনবাস বুকেপিঠে বেঁধে চলে যাই দূর-বাসে। এত দূরে যে, যেখানে সকাল হলে আমার দেশে রাত, আর এখানে রাত হলে সেখানে সকাল। সম্পূর্ণ বিপরীত সময় সূচিতে চলছে আমার দুই পরিচয় ভূমি। কিন্তু ‘মা’ বলতে আমি কিন্তু মা তোমাকেই বুঝি।
খ.
স্পষ্ট দেখতে পাই, মা চেয়ে আছে টেলিফোন সেটের দিকে, কখন বেজে উঠবে! কখন জানতে পারবেন ঠিকাঠাক পৌঁছে গেছি কিনা! আমার খবরের জন্য ভূমধ্যসাগরীয় দুটি চোখ চেয়ে আছে। মা’র কি মনে পড়ছে, বাইরে থেকে ঘরে ফিরে বাড়ির বড়ো গেইট থেকেই মা মা চিৎকারে পুরো বাড়িটা মাথায় করে ঢুকতে থাকা আমাকে! এ জন্য কত না বকেছে! স্পষ্ট দেখতে পাই, গুটি গুটি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে মা। খুঁজছে হারিয়ে যাওয়া আমার ডাক, যা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার চারপাশে। পরবাসের জানালা দিয়ে দেখতে পাই, একটি আঁচল উড়ছে উত্তর আমেরিকার আকাশে। তাকে দেখতে পতাকা মনে হয়, সে এক গভীর মমতা। মাঝে মাঝে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয়, মা এসেছে আমার প্রবাসের ঘরে।
গ.
বেশ কিছু দিন বনে বেড়াতে গিয়ে ফিরিনি আমি। না জানিয়ে এদিক সেদিক চলে যাওয়ার অভ্যাস আচ্ছন্ন করে ছিল পুরোটা যৌবন। উদ্বিগ্ন মাকে কত না অশান্ত রেখেছি, কষ্ট দিয়েছি। সেবার বন থেকে ফিরে চোরের মতো ঘরে ঢুকেছি, শান্ত মা আমার গভীর চোখে দেখছে, আসলেই আমি ফিরেছি কিনা!
মে মাসের উত্তর আমেরিকার আকাশে ভিজে ওঠা বাতাসে ভেসে এল শেষ যাত্রার শব্দ। আমি মাকে হারালাম। সেদিন থেকে অনেক দিন পর্যন্ত পথে পথে, বাসস্ট্যান্ডে, ট্রামে, সাবওয়ে স্টেশনে ঘুরে বেড়িয়েছি, বসে থেকেছি মাঝরাত অবধি। হয়তো ভোররাতে ফিরে এসেছি। আমার যে প্রবাস ঘরে মা কখনোই আসেনি, সে ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করতো না। কেউ আমাকে খুঁজে পায় না। আমি যেন এক প্রলম্বিত শোকযাত্রায় প্রবেশ করেছি, হারিয়ে গেছি। ঝমঝম বর্ষা-ধারায় ভিজে নবজাতক শিশু হয়ে, আবারও জন্ম নেই মা-শূন্য মায়ের কোলে।