মা

প্রলয় মুখার্জী



মা আমার বোধ। অনুভূতি। মুক্তি। আমার স্বাধীনতা। এভাবেই জন্মেছি যে তার মুখের বর্ণমালা চেনার আগেই প্রথম ভাগ কেড়ে নিল কেউ। পুড়িয়ে দিল তখন কত আমি! সবে বুঝতে চাইছি আকাশ নীল। লাল পিঁপড়ে কামড়ায়। আগুন গরম। সবে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। তার কাপড়ের গন্ধ। স্তনের ছোঁয়া চেনার আগেই দেখি লম্বা উটের পিঠে চড়ে মা মরুভূমির দিকে যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে! কি হয়ে উঠছে বোঝার আগেই বিশাল আমগাছ কেটে নিয়ে গেল কেউ। সেই ডালে গর্ত।গর্তে আমার খড়। উষ্ণতা শুদ্ধ চুরি করে নিল। ফলে তার পাশে শুয়ে থাকার যে শূন্যতা রইল। আমায় সাজিয়ে গুছিয়ে দেয়ালে টাঙানোর কথা ছিল যার। সেই দেয়াল শাবল দিয়ে ভেঙে দিল বাবা। ঘুম ভেঙে দেখি অতিকায় উটের ছায়ায় বসে আছি। পাশে তোবড়ানো বাটি। বাটিতে মুড়ি। জল। বাতাসা। দাদু মাথায় পিঠে হাত বোলাচ্ছে।


দাদু গামছা নিয়ে এসেছে।আমায় বাঁধল পিঠে। মরুভূমি থেকে হেঁটে এলো বাঁধাকপির ক্ষেতে। মুলোর শিকড় থেকে মাটি এনে কপালে দিল। ফুসফুস নিংড়ে মুখে দিল দই মিষ্টি সন্দেশ। আমার খোস প্যাঁচরা, পেচ্ছাপ, পুঁজ রক্তে ঘষে দিল তুলসী। সরিষার তেল শূন্য বুকে ডলে দিয়ে বলল আজ থেকে মা তোমার অনুভূতি। তোমার খণ্ডিত বোধ। এই মুখ ভুলে যাও। বাঁচব কতদিন। তখন যে মানুষ যে বস্তু যে খাদ্য প্রাণী তোমায় খণ্ডিত আশ্রয় দেবে সেই তোমার মা। সেই সব ভাল দিন জুড়ে তুমি হবে তোমার সমগ্র মা।

সে শুধু সেই সময়ের জন্য। দীর্ঘ মুহূর্তের মা একজনই। তোমার জন্মদাত্রী। তুমিও কারোর খণ্ডিত মুহূর্তের মা।দেখ বাতাবি লেবুর ডালে এক খানা ঘুঘু। ওর মা মারা গেছে। এর মা তুমি। যত্ন নাও। পোকা খাওয়াও।ডানা এসে গেলে পাখি নিজেই নিজের মা। এখন তোমার মা আমরা সকলে। এই বেল। জামরুল। কাঁঠালের ছায়ায় এসে বসো। দেখো ছোটো ছোটো জামরুলের গায়ে পতঙ্গ। পতঙ্গের মা জামরুল।তোমার আমার সবার মা জামরুলের রস ছায়া তরু।পরে ওই পতঙ্গের মতো বড় হবে। জামরুলের রস খেয়ে উড়ে যাবে তরুণী পতঙ্গের কাছে। নিজের ক্ষত নিজেই ব্যান্ডেজ করবে। তখন তোমার পূর্ণ মা তুমি। এভাবেই যার কেউ নাই। মাছের ডিমের মত একা ভাসতে ভাসতে হবে পূর্ণাঙ্গ মাছ।স্রোতের বিপরীতে ঘুরবে। ডুব দেবে।

আর গামছা খুলে পাকা আম। বিলিতি আমড়া দিল। ঠাণ্ডা পা বুকে জড়িয়ে আমগাছের গর্তে চুরি যাওয়া উষ্ণতা এনে দিল।গ্রামে শীত এলে দাদু শরীরের উষ্ণতা উলের ব্যাগে জমিয়ে রাখে।রাত গভীর হলে দেখি। সমুদ্রের উপর কোনও আকাশ। সারা দেহে বৃদ্ধের মায়া, উষ্ণতা ,আদর নক্ষত্র ছড়ানো।


ফলে যে দেহের নাড়ি কেটে আমার জন্ম। বুকের দুধ খেয়েছি। তার সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় আর তাকানো হল না। তাকালেই বুকে হিংসা আসে। হিংসা হাতে লোহা ধরিয়ে দেয় কীট পতঙ্গ থেঁতলানোর জন্য। দেখি তাল তাল লোহা পিটিয়ে কাস্তে করছে মানুষ। সেই কাস্তে কুড়ুল লাঙলের ফলা মাটিকে করছে সুফলা।

মৃত্যুর আগেও সে এক বসন্ত ছিল। কামারের দোকানে দেখছি আঘাত। শ্রমের ঘাম। দাদু বলল ওইভাবে। ওইভাবে। হিংসা দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে তীক্ষ্ণ করো চৈতন্য।শাবল করো। মাটি খুঁড়ে রাঙালু বসাও। জুঁইফুল বসাও। হিংসা হোক সুজলা। দেখি নবীন কাঠবেরালির ন্যায় বোধ হামাগুড়ি দিচ্ছে ।যে শাবল হাতে তুলে নিলাম আঘাতের জন্য। তা দিয়ে খুঁড়লাম গর্ত। গর্তে জমা হল জল। জলে স্ত্রী ব্যাঙ এসে ডিম দিল।আর হাসতে হাসতে। হাসতে হাসতে হার্টফেল হল দাদুর। মারা গেল।যে ঘর জড়িয়ে ঘুমিয়েছি। সে ঘর ভাগ হল। কাকা নিল পালঙ্ক। আমি নিলাম পতঙ্গ।বৃদ্ধের শব্দ। শিষ।


ঘর ছেড়ে খাবারের খোঁজে যখন পথে ঘুরছি। রাস্তায় বিক্রি হচ্ছে বিস্কুট। প্ল্যাটফর্মে জল। সেই মুহূর্তে বিস্কুট জল আমার মা।চলন্ত ট্রেন থেকে অচেনা পথিক টেনে নিয়েছে বুকে। পয়সা না থাকলেও যে কন্ডাক্টর আমায় বাস থেকে নামায়নি সেও আমার মা। আমি খণ্ড খণ্ড অজস্র মায়ের কাছে ঋণী। অজস্র নদ নদী স্টেশন। পাপ্পু দা, দুখী পিসি যারা আমায় রুটি ভাত দিয়েছে।তারা খণ্ডিত মা। আমার ছোটকাকা সেজকাকা পিসি আমার মা।

পিসির কথা মনে আসে যখন। দেখি হাসপাতালে সে। রুটি কারখানায় সে। হাঁটুর যন্ত্রণায় সে। রেনকোট ছাতা ভাতের হাঁড়ি নিয়ে আমার রাস্তায় বলছে আমার গর্ভের যন্ত্রণা দাঁতে ছিঁড়ে পালাচ্ছিস কোথায়! কোথায় পালাচ্ছি জানিনা। তবে আজীবন কষ্ট পাও তুমি।

এই খণ্ডিত বোধে আমি বড় হয়েছি। দাঁড়িয়েছি মদের দোকানে। সঙ্গীতের দোকানে। মিষ্টির দোকানে। প্যারাসিটামল কিনে খেয়েছি। জ্বর হলে মাথায় জল পট্টি দিয়েছি। গভীর রাতে নিজের কাঁধে নিজে হাত রেখে বলেছি আমি তোর মা। আমি আমার পুঁজ রক্ত সাফ করেছি।নেচেছি আনন্দে। ঘুরিয়েছি কচ্ছের রণ। ওই ওই পতঙ্গের মত নিজের ডানায় যতদিন বাঁচব আমি আমার মা। এই সব জড়বস্তু। মেসের টিকটিকি। রবিদা। বই। সিনেমা। মেকানিক। ক্রেন।এরা আমার খণ্ডিত মা।আট বছর। নাইট ডিউটি। ওই চেয়ার টেবিল নীরবে আমায় বাঁচিয়ে দিয়েছে। পালঙ্ক নেই। বদলে ক্রেনের ডেক। ঝড় জল তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচিয়েছে। ঐ জড়পিণ্ড। ডিজাইন । আমার মা। আলোর প্রতিফলন সূত্র। চৌম্বক তরঙ্গ। মহাকর্ষ। অভিকর্ষ। ফোটন কণা মুলো।বিট গাজর। দৃশ্য আমার মা। কিমকি দ্যুক। স্টিফেন হকিংস। বিনয় মজুমদার পড়ে বেঁচে উঠেছি পরের দিন। একাকীত্বে হার্টফেল করিনি। খরচ করিনি জীবন। লিখেছি অনেক। শব্দ। অক্ষর। বর্ণমালা। বাংলা ভাষা। আমার রুদ্রপুর। বিপ্রটিকুরী। বাপি অনির্বাণ হিরক শূন্য মুহূর্তে খিল্লি দিয়েছে। হেসেছি। রেগেছি। খিস্তি দিয়েছি।ফোন করে শুনিয়েছি গদ্য। আর ওদের খিল্লি মটর শুঁটির মত জাপটে ধরেছে কঞ্চি। কাল ফের লিখব এই আনন্দ তৃণ সদৃশ আঁকড়ে দেখি আরো কিছুকাল বেঁচে গেলাম। ওরা আমার খণ্ডিত মা।

শরীরের রেচন ক্রিয়া। পৌষ্টিক তন্ত্র ফ্যানাটমি সকল শূন্য মানুষের মা। মা তার ফুস ফুস। হৃৎপিণ্ড। অণ্ডকোষ। যৌন-বোধ। তার হিউমার। ফাজলামি। আয়না। ভায়োলিন। এস্রাজ। সন্দীপন।

যার আশ্রয়ে আমি বেঁচে উঠছি। আমার পেচ্ছাব পুঁজ প্যাঁচরা, মাড়ির ঘা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। এই বাম হাতের আঙুল। শৌচ কাজ করিয়ে দিল। কব্জি মাংস তুলে দিল মুখে। মন। এরা সকলেই আমার মা। আমিই আমার পূর্ণ মা। মা আমার অর্ধেক বোধ। খণ্ডিত মানুষ।

এভাবেও জীবন হয় একঘেঁয়ে। মায়া হাতানোর পক্ষে জীবন নেই আর। তখন চারিপাশে দেখি ক্ষুধাতুর কুকুর। ঘুড়ির সুতো জড়ানো বাদুর। চা ওলার মেয়ে। নীরব নিশাচর মেয়ে। কি বা পারি।যতদিন তারা ভালবাসার বিপরীতে নির্ভরযোগ্য মানুষ না পায় তাদের খণ্ডিত মা আমিও। নিজেই নিজের স্তনে দেখি দুধ এসেছে। ফলে বুকের ভিতর বাদুরের ছানা নিয়ে ছুটি হাসপাতাল। কুকুর নিয়ে ছুটি। নার্সারি থেকে সবেদা গাছ ছুটে আসে। মুক্তি দি টবের চারা। খাঁচার পাখি। এই মুক্তি আমার মা।অজস্র মায়ের মুখে চেয়ে দেখি তারাও আসে আর যায়। আর নাড়িতে পাক দেয় জন্মদাত্রী।বলে শরীর না পারলে। কোনও ডাক্তার চিকিৎসা নারী গাছ না পারলে। নিঃস্ব হলে। মানুষ জন্তু পাখি ছুটে যায় মায়ের কাছে। আমি বলি তুমি মরে গেছ বহুদিন। এই বোধ জন্মেছে বোধেরও পর। অতএব জীবনের পক্ষে একটা প্রাণী যা যা করে সেই আত্মহত্যা ফাঁকি পুনর্জন্মের ইচ্ছা শঠতা সবই তাকে প্রশ্রয় দেয়।আর দেখি বসন্ত হাজির।এক ধরণের বীজ। সাদা তুলার মত ফাঁপা। বাতাসে বাতাসে উড়ে বেড়ায়। একা একা। কে তাকে বড় করবে। কে মুখে তুলে দেবে পাউরুটি? কেউ নয়। বাতাস। শূন্যতা। অনিশ্চয়তা।

তবু সে জন্মাবে। ক্লোরোফিল ফুটবে পাতায়। কাণ্ডে সঞ্চয় হবে পাখি। ছায়া। ডালে বসবে ময়ূর।এই পৃথিবীর বুকে যা পাও গ্রহণ করো।কাউকে দীর্ঘজীবন ভেবো না। আমরা গাছের তলদেশে দাঁড়িয়ে কি ভাবব?

কার জন্য কাঁদব? যে বন্ধু আত্মীয় পশু পাখি গ্রাম রাস্তা রোজ বদলায়।বদলায় শরীরের গ্রন্থি। কোষ। প্রোটিন।মেরুদণ্ড। যারা একদা জড়িয়ে ধরেছিল। এখন সকলেই নেই। অভিমান করব তাদের ওপর? শরীর! সেও তো বাঁকবে।ঘন ঘন জ্বর আসবে জীবনে।জলের পাত্র ধরে কাঁপবে হাত।তখন জানি অপেক্ষা।রোগগ্রস্ত শরীর অপেক্ষা করবে মৃত্যুর। যন্ত্রণা হবে শেষ। তবে তবে অপেক্ষা শরীরের মা।