আমি এখন মায়ের অতিথি

স্বরলিপি



মা যখন কথা বলে তখন মাকে দেখতে পারি না। আবার তাকে দেখতে পাই কিন্তু কি বলে শুনতে পাই না। এর আগে মা একদিন বলেছিল, আমরা একজন দৃশ্যমান-আরেকজন অদৃশ্য। খুব কাছাকাছি থাকা পেট আর পিঠের মতো।

একদিন আমাদের খুশি হয়ে যাবার উপলক্ষ তৈরি হলো। দূরের একটি গ্রামে বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি পেয়ে গেলাম। গ্রাম বলছি এই জন্য যে, শহর বলে কিছু আছে মা তা বিশ্বাস করে না। সে বলে গ্রামটাকে কেটেকুটে তেল -সাবান দিয়ে সাজিয়ে নিলেই তা শহর হয়ে যায় না। শহর হলো দূর থেকে আসা অতিথিদের হাট। হাটে পৌঁছে গেলে মানুষের একটাই পরিচয় ‘হাটুরে’। আর তাদের কাজ দুই রকম ‘কেনা-বেচা’।
এতো মায়েব বিশ্বাস। দিব্যি বেঁচে আছে এই বিশ্বাস নিয়ে। তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমি আর কি বলতে যাব?
আজ সরু এই গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ময়লার স্তুপের পাশে দাঁড়িয়েছি। বুঁদবুঁদ উঠছে। অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজাতে বাজাতে ছুটে চলে যাচ্ছে। হয়তোবা যাচ্ছে ওই গ্রামের দিকেই। হরতাল বলে লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সে।
আমার ভেতর থেকেও কে যেন নেমে পড়ল। ঠিক প্রতিদিনকার মতো। নেমেই দেয় ছুট। শপিং কমপ্লেক্সের সামনে বড় বিজ্ঞাপনচিত্র। দৃষ্টি দিতে মনে হলো- ওতে লেখা আছে
-'ধুই তুলিলো/মুইতুলি/টাকার কোলা/কই থুলি
একথাতো লেখা থাকার কথা না! আমি হয়তো অতীত দেখছি। ছবি নয় গল্প দেখছি। না না গল্প নয় মায়ের মুখে শোনা ছড়া।
অবশ্য আমি এখন মায়ের অতিথি। গ্রাম বদলে শহর হয়ে যাওয়ার গল্পটা এখন আমি তাকে শোনাই। কালে-ভদ্রে তার কাছে যাই। যাওয়ার খবর পেলেই সে ঘরদোরটা পরিস্কার করে রাখে। নিজে মাথায় শ্যাম্পু দেয়-ঘরের ভালো শাড়িটা পরে। আমিও যাওয়ার সময় বেছে বেছে ভালো পোশাকগুলো নিই। একেকদিন একেকটা পরি। এই মা তো-সেই মা না। এই আমিও সেই আমি না। বয়সের জাহাজটা কেঁপে উঠে যেন তাই বলে যায়। আবার কাঁপে-জোরে জোরে কাঁপে। আমরা যে যার জায়গা থেকে বিশ্বাসের মূলে মাথা গুঁজে দিই।
মাথার ওপর আকাশটা ছেয়ে যায় সাদা-কালো মেঘে। খয়েরি কাচের চশমা চোখে দিয়ে তাকাই। দেখি, মেঘমালা রঙের জামা পাল্টে ফেলেছে। ঝুম ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির ছন্দ-গান শুনি। এই ছন্দ আমার চিন্তার খাদ-কিনারার ওপর ছড়িযে পড়তে থাকে।
আর বয়সের যে জাহাজের কথা বলছিলাম তারও কাঁপন কমে আসে। বুঝতে পারছি, পিঠের ওপর ঘাম জমে গেছে। মাকে ডাকি। সে জোর গলায় বলে, ভয় নেই। আমি জানি, মা নিজেও ভয়ের একটা কারণ। তার পেটের ভেতর আমার হারানো ভিটেমাটি। সাঁতার কাটা রক্তের দিঘি। যার কোনো কিছু মা দেখেনি। দেখবে না কোনোদিন। আমি দেখেছি, সেখানে আমি ছিলাম। আমি সেখানে বড় হয়েছি।
আর এখন মা বলে, আমি নাকি মাটির মানুষ! আমি বলি তোমার রক্তকে আমি অস্বীকার করতে পারব না। এই হার মাংস তুমি থেকে গঠিত হয়েছে। তুমি জল-তুমি স্থল; তুমি ৫২। ৫২ বললেই মা যেন চুপ হয়ে যায়।
মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলি, তুমি যদি একটা বই হও আমি সেই বইয়ের অক্ষর। অক্ষর এক। অক্ষর অনেক। এবার তুমি বিশ্বাস করো, আমার পেছনে অনেক পথ আছে। যেমনটা আছে তোমার।
তবুও মা চুপ থাকে। মায়ের চোখের কোণায় কিসের যেন আলো চিকচিক করে। যেন সদ্য কুশায়া কেটে স্পষ্ট হতে থাকা নদী। শান্ত। কিন্তু মৃত প্রায়। মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাওয়া কোনো নদীকে একটা গোলাপ মনে করলে তার প্রতি পাঁপড়িতে ভর করে- জলমগ্ন সাঁকো। কিশোরীর নাকছবি। বটছায়া। নাইওর। কান্না। ভেলা-নৌকা। গুনগুন করে গেঁথে রাখা গল্প। সকালের রোদ-ওম। এই সব কিছু একটা একটা করে পিঠ ভাসিয়ে দিতে দিতে চর হয়ে যায়।
চৈত্রমাস এলে মাকেও মনে হয় চর। চোখে নাকি জ্বালা বাড়ে মায়ের। কুপিবাতি জ্বালিয়ে তার ওপর আমপাতা রেখে কালি জমা করে মা। চোখে নেয়। বছরের বাকি মাসগুলোতে সে চোখে সুরমা দেয়। কিছু বললে উত্তরে জানায়, দুঃখকে একমাসের বেশি আদর যত্ন করতে নাই। আবার অনাদরেও ফিরিয়ে দিতে নাই। দুঃখ হলো অতিথি।
তবে বাকি মাসগুলো কি মা সুখে থাকে! সে উত্তর মা দেয় না। মাঝে মধ্যে বলে সুখ-আর দুঃখ নাকি কয়েক সিঁকের জানালা। ফাঁক পেলে সুখ নয়- তবু সুখের মতো অনেক পায়রা উড়ে আসে। আবার দুখ নয়- তবু দুখের মতো মরিচাগুলো চোখ তুলে তাকাতে তাকাতে ঝরে যায়।
আমার একটা রোগ আছে, যা কেবল মা জানে। মা কাঁদলে আমার আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে ঘাঁ হয়ে যায়। অনেক দিন হলো রোগটার দেখা নেই।
পিঠের ওপর ঘাম জমে যাচ্ছে। কিন্তু সেই চেনা শব্দটা আর শুনতে পাচ্ছি না।
বলছিলাম, আমাদের খুশি হয়ে যাবার গল্প। সেদিন আমার আর মায়ের গ্রাম পৃথক হয়ে যাবার দিন। আমি মায়ের গ্রাম ছেড়ে চলে আসব। দিন তারিখ ঠিক হলো। মা এ বাড়ি-ও বাড়ি খবর জানাল। নতুন চুলায় পিঠা বানিয়ে খাওয়াল সবাইকে। চোখের সামনে চেনা সব কিছু হয়ে উঠল আনুষ্ঠানিকতা। তবে আমাদের দীর্ঘশ্বাসটা বেঁচে আছে আগের মতো। একটা লাল সূতা দক্ষিণের জানালায় টাঙিয়ে রেখেছি। অল্প বাতাস পেলেও সূতাটা ওড়ে।