রাত্রি মা ঘুম যায়

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য



রাত্রি মা ঘুম যায়। ঘুম যায় পৃথিবীর সব দূর দূর পাড়, পাড় ঘিরে বনষ্পতির বন ঘনীভূত হয়, গাঢ় হুহু হয়ে ঘিরে আসে তার ঘুমসমগ্র। তার গায়ে চন্দনের ঘ্রাণ। তার শীর্ণ নিঃশ্বাস নিযুত বাষ্পের ফোঁটা হয়ে ঝুলে থাকে ইথারে। আর ইথার বলে কিছু নেই।

রাত্রি মা’র পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ লম্বালম্বি কাটা। তার নাকে নাকফুল হয়ে চিরিদিন ফুটে আছে বরই ফুল। সে ব্যাংকের চেকজুড়ে কাঁপা কাঁপা হাতে প্রতিমাসে তিনবার লিখে রাখে লায়লা বেগম আরজু। তারপর দূরে বহুদূরে, দিগন্ত ভেঙে থাকিয়ে থাকে, তার চোখ দুটি কুয়াশা হয়ে যায়। কুয়াশার ভিতর এগারো বছরের বালিকা নদীচরে ভোরের হাওয়ার সঙ্গে কথা বলে। তার কাঁখে একপাশে মাটির ঘড়ায় ঠান্ডা নদীজল তৃষ্ণাকে ডাকে, আয় আয়, আয় আয়...। আর পাশে শালুকের নাল জড়িয়ে রাখে ছোট্ট কোমর।

আমার রাত্রি মা আকাশে পা টেনে ঘুম যায়। তার আর নাম লায়লা। তার আর নাম ত্রিস্তান। তার আর নাম গীতবিতান। তার আর নাম পিয়েতা। তার আর নাম তানাবাতা। তার আর নাম অভিমান। তার আর নাম কুসুম। তার আর নাম আরজু। তার আর নাম আকাশের নীল। কেনো আকাশ এতো নীল? সে আকাশের নীল হয়ে জড়িয়ে কখনো রাখে আটটি মেঘমালা, থামিয়ে রাখে করাল নদীভাঙন, ঝড়ের লেজ ধরে ঝড়কে ছুঁড়ে দেয় দূর পাহাড়ের ওপাড়ে।

রাত্রি মা প্রগাঢ় নিষাদ, সে গন্ধরাজের গাছ লাগায়, বকুলের ফুলের কাছে বলে দেয় ক্ষয়ে যাওয়া পায়ের নখের গুপ্তকথা। রাত্রি মা হাতপাখায় ফুল আঁকে, শীতলপাটিতে টেনে দেয় ধানক্ষেতের গতিরেখ। কাঁথার বুকে সুতা দিয়ে আঁকে মুঁবিয়াঁই গ্রাম, গাজিকালুর পুঁথির সুর। বালিশের কভারে আঁকে রাখালের চোখের ক্ষত। সেই ক্ষত বানায় হাওয়ার রং। তার পানের বাটায় পৃথিবীর যত আছে পানের বরজ সবুজ হয়ে আছে।

রাত্রি মা’র ঘুম ভাঙে না আর। তার চুল হয়ে গেছে শরতের মেঘ। একদিন চাপালিশ কাঠের সিন্দুকে তার বিয়ের শাড়ি ইঁদুর আর মুষিক মিলে ভাগ করে খায়, পিঁপড়া আর পিপীলিকা মিলে ভাগ করে খায়। বেনারসি শাড়ি, জরিপাড়, রং তার বেগুনি। সে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সে জিরাফ হয়ে থাকে। জিরাফের ভাষা জানে কেবল গাছের পাতাবলি।

অনেক অনেক দিন রাত্রি মা আকাশপ্রদীপ হয়ে জ্বলে। কোনোদিন তার ঘুমগাছের বাগান কেটে শেষ করে দেয় একচোখা রাক্ষসপাল, ঘুমগাছের সূর্যফুলে তখনো ফুটে ছিলো রাত্রির শিশির।

রাত্রি মা’র ঘুম ছিলো না হাজার বছর। এখন সে ঘুমের সুনিপুন কারিগর। সে এখন জলের ওপর ঘম যায় আকাশের দিকে পা টেনে। সেই ঘুমের অরণ্য ঘিরে নিভে যায় এপারে ওপারে যা আছে অর্কেস্ট্রা—জেগে থাকে কেবল কবেকার অ্যামাদিউসের ডেথ-সিম্ফনি, একা একা। তার একাকীত ঘুমে তলিয়ে গেছে কবে পাতালের স্যাঁতসেতে পা!