আমি আন্তোনিয়াস ব্লখ, খেলছি মৃত্যুর সঙ্গে

এমদাদ রহমান



পাখিটি চক্রাকারে উড়ছিল...


রুবাতো, রুবাতো...
এই লোকটিকে গতরাতেই প্রথম দেখলাম, দেখার পর থেকেই অদ্ভুত এক মমত্ব যেন তার জন্য আমার ভিতর জন্ম নিয়েছে। ভালবেসে ফেললাম! তবে কিছুটা দ্বন্দ্বেও আছি। কাকে ভালোবাসি, তাকে না তার সঙ্গী কুকুরটিকে!
রুবাতো... এভাবে একদিন মেলকিয়াদেসকেও ভালবেসেছিলাম। সেই জিপসি লোকটা, মেলকিয়াদেস। গতরাতে ছবিটি দেখবার পর একবার মাত্র জানলার পর্দা সরিয়ে আকাশ দেখেছিলাম। হ্যাম্পশায়ারের আকাশ। তখন বুকটা ধক্ করে উঠেছিল। কার একটা কথা মনে পড়ে গিয়েছিল- নাটকের আগাগোড়াই মানুষ! কে বলেছিল? কথাটা কি সত্যি?
আকাশ অন্ধকার হয়েই ছিল, মেঘে থমথম...

যেন এক অন্তর্গত তৃষ্ণা নিয়ে মায়ের মুখের দিকে দেখছিলাম! কিন্তু না, আমি তো মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলতে বসেছিলাম। কীভাবে কীভাবে যেন আমরা আমাদের প্রিয় সিনেমার চরিত্র হয়ে যাই... ব্লখ, আন্তোনিয়াস ব্লখ কিংবা সেই লোকটা, নস্টালজিয়ার। সেই অমোঘ আহবান-
We must go back to the origins of life without mudding the water
What kind of a world is this…
if it is a madman who tells you:
be ashamed of yourselves!
And now, music!'...
We must go back to the origins of life without mudding the water...
কিন্তু ঠিক কীভাবে পৌঁছব জীবনের উৎসভূমিতে? বুড়ো আন্দ্রেই কি সত্যিকার উন্মাদ? না। আর ভাবতে পারছি না। আমি আর মায়ের মাঝখানে কয়েক হাজার মাইলের দূরত্ব। মা। জননী গো... তুমিই কি উৎসভূমি আমার? হয়তো এক সন্ধ্যায় কি গভীর নিকষ কালো রাত্রি তোমার চিৎকারে চিৎকারে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছিল আর আমি নোঙর ফেলছিলাম রূপনারানের কূলে। জননী জন্মভূমি...

বুকের ভিতর একটা পাখি। একটা পাখির ঘুম। একটা পাখি চক্রাকারে ওড়ে। পাখি যেন পাখি নয়... একটা স্বপ্ন। স্বপ্নে দেখা সেই ঘোরলাগা দৃশ্য। মৃত্যু যেন গভীর মমতায় টেবিলল্যাম্পটাকে জ্বালাচ্ছে নেভাচ্ছে। এই আলো তো এই আঁধার। এই জীবন তো এই নিঃশ্বাস। আর নিজেকে দেখতে পাওয়া সেই কুঠরির চারকোণে চার টুকরো হয়ে ঝুলে থাকা, রক্তাক্ত। চুইয়ে রক্ত পড়ছে একটা ছিন্নভিন্ন ডিকশনারির ওপর। পৃথিবীর শব্দেরা সব কালো রক্তে স্নান করে নিচ্ছে...

মা। মা গো... তুমিই কি উৎসভূমি? উত্থাল তরঙ্গ পেরিয়ে ভূমি থেকে আরেক ভূমি খণ্ডে ছুটছে শরণার্থী, বসেছে গোল টেবিল। কথা বলছে রাজনীতির প্রাজ্ঞতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ল্যাবে ডিসেকশন হচ্ছে একটা শব্দ- উদ্বাস্তু। মা, আজ তোমার জন্মদ্বারে আমিই নতজানু। এই পবিত্র রক্তে আবার আমার পুনর্জন্ম হোক। পাখিটা বুকের ভিতর। তার ডানার অবিরাম আন্দোলন। পাখিটা চক্রাকারে উড়ছে...আমি চিৎকার করছি : প্রজ্ঞা প্রজ্ঞা বলে। কালো আলখাল্লায় মুখ ঢেকে মৃত্যু শুধু আলো নেভায়, আলো জ্বালায়। দাদার ঘুটিগুলি, রাজা, মন্ত্রী, হাতি, ঘোড়া, নৌকো... এক কোণে সব এলোমেলো পড়ে আছে। এসো দূত, করুণাময় ঈশ্বরের কথা বলো। বলো আমাদের হৃদয়ের শূন্যতাই হচ্ছে, আয়না। বলো-- ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন না। তিনি নীরব থাকবেন। তিনি অন্ধকারে থাকবেন।

রুবাতো... তোমার জন্য ম্যাগনোলিয়া, ক্রিসেন্থিমাম। তোমার হারিয়ে যাওয়া সেই টিক টিক ঘড়িটি খুঁজে পেয়েছ? বন্ধু কুকুরটি লেজ নাড়াচ্ছে। তোমার হাতে ভায়োলিন। আর আমি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছি শব্দরাশির ওপর।

পাখিটি চক্রাকারে উড়ছিল।