'ফেব্রুয়ারির দেয়াল ঘেঁষে'

ফারাহ্ সাঈদ




নামকীর্তন হবে আজ। পৃথাদের বাড়িতে কত যে আয়োজন। সকাল থেকেই গুড়ের পায়েস সুগন্ধ ছড়ায়। আমাদের রান্না ঘরে তিন হাড়ি জমা হয়েছে । পৃথাদের বাড়িতে আম্মা পায়েস পাঠালেন। আমাকে আর সুফিয়াবুকে দিয়ে । ছোট আর মেঝো গেলো আমাদের সাথে। রবিন কাকা দুই হাতে নাড়ু দিয়ে বললেন , তোরা রাতে আসবি তো কীর্তন শুনতে ? আমি বলি, 'আম্মার শরীর ভাল না, রাতে আর আসবো না কাকা।' 'রুমু, তোদের ভাই হবে না বোন ! ' কাকা একথা বলতেই আমি উত্তর দেই 'জানি না তো।' একথা শুনি প্রায় আমি , মেঝো আর ছোট ! আমরা তিন বোন। আম্মাও।
তিন মেয়ের পর এবার একটা ছেলে হোক , তাই ভাল ! সব্বাই তাই বলে ! আম্মা শুনে মুচকি হাসেন আর বলেন, 'কী জানি তিনি যা দেন। সবই আল্লাহ র হাতে।' ফুফুজান বলেন, ' তাঁকেই ডাকো পারভিন , তিনি দোয়া কবুল করবেন।' আম্মা হয়ত মনে মনে তাই চান। আমি মেঝোকে বলি , 'ভাল হবে রে আমাদের এবার একটা ভাই হলে ! আর যদি না হয় ! ' এ কথা ভাবতেই আমার মনটা কেমন করে ওঠে। আম্মার কি খুব মন খারাপ হবে ! মনে পড়ে ছোটর জন্ম হবার পরও অনেকেই আমাদের বাড়ি এসে বলেছিল, 'ইস্ এবার যদি একটা ছেলে হতো !' কী এমন ক্ষতি হয় মেয়ে হলে ! আম্মা তো বলেন, 'তোমরা সবাই হলে আমার এক একটা অক্ষর। আমার বর্ণমালার বই। তোমাদের এই কিচির মিচিরই আমার বাংলাভাষা। '

রোজ সন্ধ্যায় বই এর পৃষ্ঠা খুলে বসেন আম্মা। আমাদের পড়ার টেবিল থেকে দুরে থাকে চার্জলাইট। আমি চাই কারেন্ট চলে গেলে সুফিয়াবু সেটা খুঁজে না পাক। মাঝে মাঝে লোড শেডিং এর বাহানায় আম্মাকে জড়িয়ে ধরি আমি। বলি , 'আম্মা শুনছো , কই তুমি ? অন্ধকারে আমার ভয় লাগে আম্মা।' তবে এখন আর ধরি না। ফুফুজানের নিষেধ, আম্মা যদি ব্যাথা পায়। ছোটর স্কুল শুরু হয় নি এখনো। ওকে অক্ষর চেনাতে গিয়ে প্রতিদিন নানা গল্প বলেন আম্মা। খরগোশ কাছিমের গল্প , টোনাটুনি আর পিঠা খাওয়ার গল্প আরো কত কী ! মাঝে মাঝে বাহান্ন আর একাত্তরের গল্পও বলেন তিনি। ছোট অনেক প্রশ্ন করে। আম্মা ধীরে ধীরে উত্তর দেন। আমি আর মেঝো মন দিয়ে শুনি। গল্প শুনতে শুনতে প্রায়ই বর্ণমালার বই এর ওপর ঘুমিয়ে পড়ে ছোট।

ঘুম থেকে জেগে আবার বলে , 'আম্মা নতুন গল্প বলো'। গল্প ফুরোলেই আবার গল্পের শুরু। পড়ার বই বাদ দিয়ে কান পেতে শুনি আমরা। আম্মা মাঝে মাঝে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দেন আমাদের । দুবোনের পড়া নষ্ট হচ্ছে ভেবে । আমি ফিরে আসি গল্পের টানে। মেঝো চলে আসে একটু পর। চুপচাপ পড়ার টেবিলে নিজের বই এর দিক মুখ করে বসে থাকি। আম্মার উলের কাঁটাজোড়া চলে গল্পের তালে তালে। কত যে রঙ উলবাক্সে ! নতুন একটা সোয়েটার বুনছেন আম্মা। প্রতি শীতে একটা কী দুটা। এবারের রং সাদা। কার জন্যে সোয়েটার সেটা এখনো বুঝতে পারি নি। ছোট , মেঝো না আমার, নাকি অন্য কারো জন্যে !ছোট্ট পাখিটার জন্যে ! যার অপেক্ষায় আছি আমরা সবাই। সেদিন আমি বলি ,'আম্মা এ সোয়েটার কার জন্যে ? আমাদের ?' 'না রুমু এটা বড়দের সোয়েটার।' আম্মা হাসে। আমি আর কিছু বলি না।

মাসটা ফুরিয়ে যাচ্ছে। আম্মার সোয়েটার বোনাও। উলবাক্স থেকে এক এক করে সব সাদা উবে গিয়ে সোয়েটারে জমাট বাঁধতে থাকে। জানুয়ারির কোন এক শেষ সন্ধ্যায় আমাদের ছোটবোন আম্মাকে পড়ে শোনায় অ আ ই ঈ। বোন আমার ছোট ছোট পায় উঠোন-হাঁটে । আম্মার আঙুল ধরে। এইতো আর কটা দিন ! আম্মার এখন হাঁটতেও কষ্ট হয়। তখনো আমরা জানতে পারি নি আমাদের ভাই হবে কী বোন ! অজানা এক উত্তরের অপেক্ষা প্রায় শেষ হয়ে আসে জানুয়ারি মাস।


এবার স্কুল থেকেই শহীদ মিনারে যাবো। আম্মা বলেছেন খুশি আপার সঙ্গে যেতে। প্রতিদিন যার জন্যে বাগান থেকে ফুল নিয়ে যাই আমি। আমাদের ক্লাসের প্রায় সবাই নিয়ে আসে। ফুলের ভীড়ে তিনি সারাবেলা আরও হাসিখুশি থাকেন । ক্লাসরুম নয় যেনো বাগানে শুরু হয় আমাদের সকাল। জাতীয় সঙ্গীত শেষে আমরা ফিরি স্কুলবাগানে। একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরেও আমি যাবো আরো কিছু ফুল নিয়ে। ভেবেছি মৌন মিছিল শেষে বাড়ি ফিরে আম্মাকেও দেবো একটা ফুল। যাঁর সঙ্গে আমরা প্রতিবার শহীদ মিনারে যাই। যে কোন একটা সাদা ফুল দেবো তাঁকে। আমি অপেক্ষায় থাকি। অবশেষে ফেব্রুয়ারি আসে।


ঘোলা একোরিয়ামের পাশে আমরা জেগে থাকি । মধ্যরাতে নীলশিশুদের দেখি ।ওদের সাঁতার। নীল তো নয় ওরা নীলাভ সবুজ। পলকা ডট আছে ওদের গায়ে। প্রশ্ন করি, 'এই মাছেদের কী নাম আম্মা ?' 'আমি জানি না মা; ঘুমাও তোমরা , কাল সকালে উঠতে হবে।' মেঝো বোন বলে ওঠে, 'আম্মা তুমি জানো না বুঝি মাছের নাম ? তাহলে কাল সকালেই আমরা সেই দোকানে যাবো ওদের নাম জানতে !' আজ দুপুরে নিউমার্কেট থেকে কিনে এনেছেন আম্মা। সঙ্গে ছিলাম আমরা তিনবোন। এটা ছিল ছোটর তুমুল আবদার !একোরিয়াম তার চাই। তিনটা মাছ কেনা হয়েছে আমরা তিন বোন বলে। কদিন পর ফেব্রুয়ারিতে একটা নতুন মাছ এসে শিখে নেবে সাঁতার। সে হবে আমাদের নতুন ভাই কী বোন !

বৃহস্পতির রাত। খাটে শুয়ে অল্প একটু আকাশ দেখি। সবুজ পর্দার ফাঁকে আমাদের একান্ত আকাশ। তারাদের দুরত্ব নিয়ে ভাবি আমি আর মেঝো। আমরা ফিসফিস করে কথা বলি। ছোট কি আর বুঝে এই সব ! আম্মা চোখ মুদে আছেন। ঘুমিয়ে পড়েছেন কিনা জানি না। তিন বালিশের পাশে একটা কোল বালিশ তারপর আম্মার বালিশ। আমাদের থেকে কোল বালিশটা তাঁকে আলাদা করে রাখে । ফুফুজানই বলেছিলেন এভাবে রাখতে। এখন আর আম্মাকে জড়িয়ে ঘুমোতে পারে না ছোট। ওর অভ্যাসটা ছিল অনেকদিনের ।


নামকীর্তন শুনতে পাই। পৃথাদের বাড়ি থেকে। পুরোনো স্বরের মাঝে কোন এক নতুন স্বরে গাইছে কেউ।
আমরা কেবল কান পেতে শুনি। আম্মার চুল বেঁধে দেয় নি কেউ আজকে । সুফিয়াবুও না। বালিশ ঢেকে গেছে চুলে , মেঘের সমান। আমরা মুগ্ধতার সাথে দেখি। কান পেতে শুনি তাঁর পেটের দেয়াল ঘেঁষে এক শিশু নামকীর্তন শুনছে । কন্যা কী পুত্র শিশু , আম্মা আমার সেই খেয়াল ভুলে ঘুমের ঘোরে এখন অন্য কোথাও।