মায়ের মতন

প্রবুদ্ধ ঘোষ



মায়ের মতন আলো, সকালের গন্ধে গন্ধে ভরে উঠছে সামনের রাস্তা বাড়ি পথবাতি। ফেব্রুয়ারি ভোরের নরম রঙে ভাষা কী পুণ্যস্নান সেরে নেয়? আমি ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি দেখিনি। আমি ১৯৬১-র ১৯শে মে ভাষা আন্দোলন দেখিনি। আমি দেশ ছেড়ে আসা, স্থান ছেড়ে আসা, ভিটে ছেড়ে আসা, ভাষা ছেড়ে আসা দহনদিন দেখিনি। কিন্তু, ভাষার গহীন আমি জানি। জানি, মা আর ভাষার এক ঘন সাযুজ্য, নিষ্ঠবুনন। ভাষার উপলব্ধি। ভাষার এক নিজস্ব সংবেদ। মা, তোমাকে আর আমার ভাষাকে জেনেছি কোন সেই ভোরবেলায়। এই ভাষা আর তুমি একই লয়ে কথা বলো, একইরকম শব্দচয়ন করো। আর, আমার অসুখের রাতবিরেতে মাথার পাশে বসে থাকো, জলপটি দাও। আমার মনখারাপের ভোররাতে আমার সাথেই জেগে বিষাদ আর আঘাতগুলোকে ধুইয়ে দাও, লিখিয়ে রাখো ডায়েরিতে। জাগিয়ে রাখো, ঘুম পাড়াও, শান্ত করো অশান্তিতে আর প্রতিস্পর্ধার স্বপ্নগুলোও...

#
পেরিয়ে আসছি নিকোনো ঘর। পেরিয়ে আসছি মাঙ্গলিক। পেরিয়ে আসছি চৌকাঠে চালধোয়া আলপনা। পেরিয়ে আসছি জানালার শিকে আটকানো হলুদ সুতো। পেরিয়ে আসছি রমু’দার বইয়ের দোকান। পেরিয়ে আসছি জংলা ঝোপ। পেরিয়ে আসছি ন্যাড়া গাছ। পেরিয়ে আসছি পাটকিলে বেড়ালের জলমাখা থাবায় থাবায় আঁকা উঠোন। পেরিয়ে আসছি রোজ ঘুম এনে দেওয়া ঝিঁঝিঁ দের। পেরিয়ে আসছি বাঁদিকের কোণের ঘরের কুলুঙ্গিতে রাখা ছেঁড়া সাদা-কালো ছবি। পেরিয়ে আসছি তোষকের তলায় চাপা দেওয়া কবেকার ট্রেনের টিকিট, প্রথম ‘তাহার’ সাথে কিছুদূর। পেরিয়ে আসছি লৌকিক মন্দির, অলৌকিক মিথ্‌। পেরিয়ে আসছি কিপটে-বাড়ির সামনে রাস্তায় কোনোদিন না-বোজানো গর্ত। পেরিয়ে আসছি বনটিয়াকে মাটিচাপা দেওয়া কচি গন্ধরাজ গাছ। পেরিয়ে আসছি খাওয়া খাওয়া বই আর খোলা ছেঁড়া পাতা। পেরিয়ে আসছি তারের বুকে বেঁধা কাঁটা।
ফেলে যাচ্ছি খিলান। ফেলে যাচ্ছি খড়খড়ি। ফেলে যাচ্ছি উই-মোছা ফিকে হলুদ সরু দাগ, দেওয়ালের। ফেলে যাচ্ছি আলমারিতে লাগানো স্টিকার। ফেলে যাচ্ছি কবেকার সমুদ্র-কুড়ানো ভাঙা ঝিনুক। ফেলে যাচ্ছি আলো’দার চা দোকান। ফেলে যাচ্ছি ভাঙা বেঞ্চের পাশে জমানো বাসি চা-পাতা। ফেলে যাচ্ছি ভুলুর ড্যাবাড্যাবা মায়ামায়া চোখ আর আদরপ্রত্যাশী ল্যাজ নাড়ানো। ফেলে যাচ্ছি আমাদের সেই প্রিয় কাপ-প্লেট। ফেলে যাচ্ছি পাড়ার মোড়। ফেলে যাচ্ছি ফুল-মালা-পাতা ফেলার হাওদা স্তূপটার পাশ ঘেঁষে ক্ষয়াটে বেদী। ফেলে যাচ্ছি আড্ডার তুতো। ফেলে যাচ্ছি লৌকিক মানত আর অলৌকিক শিন্নি। ফেলে যাচ্ছি চিরকাল যাকে গালাগালি দিয়েছি, সেই ঝগড়ুটে বুড়োর জানলা। ফেলে যাচ্ছি ডায়েরি আর রুলটানা পাতার সমান্তরাল। ফেলে যাচ্ছি অঙ্ক পরীক্ষার লুকিয়ে রাখা খাতা। ফেলে যাচ্ছি প্রথম লেখা কবিতা, বিতর্কে জেতা শংসাপত্র। ফেলে যাচ্ছি ঘুম, ফেলে যাচ্ছি ধড়ফড়িয়ে জাগা। ফেলে যাচ্ছি, ‘শিল কাটাও...’। ফেলে যাচ্ছি কাঁটায় ছড়ে যাওয়া তারের সংলাপ।
আমার ভাষাকে ফেলে যাচ্ছি... ভাষা তো আমার বোধকে প্রকাশ করে; সেই বোধই যে ছিঁড়েখুড়ে পড়ে থাকল। তাকে ফেলেই যাচ্ছি। আমাকে সমস্ত পেরিয়ে যাওয়ার সাথে ভাষাকেও পেরিয়ে যেতে হচ্ছে। ছেড়ে যেতে হচ্ছে সেই লাট খাওয়া কাটা ঘুড়ির মতো, যে ঘুড়ি আমাকেই ডাকছিল গোঁত্তা খেয়ে খেয়ে। নতুন ভাষা নিতে হবে, স্থানান্তরে? পেরিয়ে যাওয়া, ফেলে আসা ভাষা তবে পুরনো? ভুলে যেতে হবে, মা? এই সব ফেলে যাওয়া, পেরিয়ে আসা তবে কোন ভাষায় বলব, মা? আস্তে আস্তে সবই ভুলে যেতে হবে? ভাষাও দশক পেরোবে... শতক... নতুন ভাষাগন্ধে মায়ের গন্ধ ভুলে যাব? ভাষা-মা’র আলো এখনো কী উত্তাপ দেয়...

#
কোনো কোনো ছুটির বিকেলে ভাতঘুম জড়ানো ঘুম ঘুম আধোলীনে হঠাত দুঃস্বপ্ন, ভাষাকে হারিয়ে ফেলার। মনে হয় আমি সব ভুলে যাচ্ছি। বর্ণমালা মনে আসছে না। অক্ষরগুলো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে যাচ্ছে ব্যথায়। কখনো বা সোজা টানা লাইন হয়ে গেছে কার্ডিওগ্রাফের মতন; আমি আর চিনতে পারছি না অক্ষরগুলো। আমি চীৎকার পারছি না কারণ, ভাষা জানা নেই। সেই ডোনাল্ড ডাকের কমিক্সে ভাষা না-জানা লোকটার যেমন আওয়াজ বেরোত... ফ্যান্টমের গল্পে পিগমিদের, বান্টুদের যেমন ভাষাহীনতা অপ্রকাশ... তেমনি আওয়াজ। অবোধ্য ধ্বনি। নিজেই বুঝছি না সেই ধ্বনির অর্থ। খোয়াবকে বর্ণনা করার ভাষা নেই। আর, এমনই খোয়াবদিনে তালামুত্থু এবং নটরাজনের কথা মনে পড়ে কখনো সখনো। তামিল জাতিসত্তা, দ্রাবিড় ভাষার মর্যাদা চেয়ে আন্দোলনের শহীদ এই দু’জন, ১৯৩৯ সালে। হিন্দি বা ইংরেজির আরোপিত ভাষাশাসন, না। তামিল সরিয়ে বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক হিন্দি, না। বহু তামিলভাষাভাষী মানুষ প্রতিবাদে মুখর ভাষা-মা কে রক্ষার দাবিতে। আন্দোলন সাফল্য পায় ১৯৫০ সালে। কখনো সখনো মনে পড়ে ১৯৮৬ সাল, ভাষাশহীদ সাত জন, আহত আরো বহু; কোঙ্কনি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে। কোঙ্কনি ভাষাকে মর্যাদা অধিকার করতে হয়েছে ঔপনিবেশিক পর্তুগীজ এবং পরবর্তীতে প্রতিবেশি মারাঠি ভাষার আধিপত্যকে প্রতিস্পর্ধা জানিয়ে। টিকে থাকার পথে শুধু যে মৌখিক সংগ্রাম, আখরগত স্বাতন্ত্রস্পর্ধা তা নয়; প্রতিমুহূর্তে কোঙ্কনি ভাষাভাষীদের প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসনের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে। দীর্ঘদিনের নিয়ত সংগ্রাম চরম পরিণতি পেল ১৯৮৬ সালে, গোয়ায়। রাষ্ট্রীয় গুলিতে সাতজন শহীদ, ভাষা-মায়ের জন্যে, আত্মমর্যাদার জন্যে। কিন্তু, সরকারও বাধ্য হল সংবিধান অনুযায়ী কোঙ্কনিকে স্বতন্ত্র সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দিতে। মানভূম থেকে পুরুলিয়া হয়ে ওঠার ইতিহাসেও জড়িয়ে থাকে সেই ভাষার লড়াই। বিহারের অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানভূমে ১৯৪৮ থেকে হিন্দি ভাষাকে আরোপ করা হয় একমাত্র ভাষা হিসেবে। অগ্রাহ্য হয় বাংলা। দীর্ঘ ৮ বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, কারাবাস শেষে বাংলা ভাষা অধিকার অর্জন করে, মানভূম থেকে পুরুলিয়া নামান্তর ১৯৫৬ সালে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা চাকমা। সুদীর্ঘকাল যে ভাষা অনুশীলিত হয়েছে, পরিশীলিত হয়েছে অন্দরে অন্তরে। বাইরে প্রকাশের সুযোগ পায়নি। কারণ, রাষ্ট্রীয় ভাষা বাঙলার আধিপত্য মেনে নিতে হয়েছে চাকমা জনজাতিকে। চাকমাকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি রাষ্ট্র। কিন্তু, সে ভাষায় নিভৃতে কবিতা রচনা হয়েছে, গান গাওয়া হয়েছে; আখ্যান ছড়িয়ে আছে। হাল আমলে চাকমা সরকারি ভাষার স্বীকৃতি পেয়ে বিদ্যালয়ে এলেও, চাকমা বর্ণমালার পর্যাপ্ত বই এখনো প্রস্তুত করতে পারেনি সরকার। সম্প্রতি, চাকমা ভাষার ৪০টি বর্ণমালার মধ্যে ২৬টি বর্ণকে সর্বতো ব্যবহার্য বর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ভাষার সাহিত্যের যথাযথ সংগ্রহভাণ্ডার তৈরির কাজও চলছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন চাকমা জনজাতির মানুষ কিন্তু পাহাড়িয়া ভাষার সাথে নাড়ির যোগ আর সে ভাষা বাইরে প্রকাশ না করতে পারার অব্যক্ত ব্যথা গুমরোয় এখনো। প্রকৃতি-ভাষা-মা অঙ্গাঙ্গী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায়, “পার্বত্য চট্টগ্রামের, আরও আগে সমগ্র চট্টগ্রামের, সমস্ত পাহাড় জুড়েই ছিল তাদের বাড়ি, চাকমারা ছিল মস্ত বড়, বিশাল বাড়ির বাসিন্দা... এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়া চাকমাদের গৃহত্যাগ নয়, বরং মায়ের এক স্তন থেকে আরেক স্তনে মুখ গুঁজে মাকে নিবিড় করে অনুভব করা... তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রাষ্ট্রের কাছে গণ্য হয় স্পর্ধা বলে... চাকমা কবিতা আজ এই স্বপ্নপ্রতিষ্ঠার সংকল্পে উত্তেজিত (চাকমা উপন্যাস চাই, ১৯৯৩)।”
দেশভাগ, সীমানাভাগ, কাঁটাতার, সরকারি নথি এসব দিয়ে ভূগোলকে ইচ্ছেমত খণ্ডবিখণ্ড করা যায়। কিন্তু, ভাষাকে করা যায় কি? ভাষাকে যতই বিয়োগের চেষ্টা হোক, এক যোগচিহ্নের মতই তা থেকে যায়। উপমহাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক ইতিহাসে বারবার তাই ভাষা সমস্যা তৈরি হয়েছে; আবার, ভাষাই সমস্যা মিটিয়েছে। ভাষা স্নেহময়ী মায়ের মতোই জুড়ে নিয়েছে তাঁর সন্তানদের; আবার, প্রখর আত্মমর্যাদায় স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও করে নিয়েছে। ভাষার কোনো ‘উপভাষা’ হয়না। সব ভাষাই ‘ভাষা’। আমার না-হোক, অন্য একজনের ভাষা। আমার পূর্বজদের থেকে শোনা গল্প মিথ্‌ যদি ‘লোককথা’ হয়, ‘কথা’ হয়, তবে অপরের ভাষার কথাও ‘কথা’, তা উপকথা নয়। ভাষা, আমার মা। অপরের ভাষাও তার ‘মা’। আত্ম-অপর পরিপূরক অস্তিত্ব- এও তো আমারই ভাষার পাঠ। ভাষার সাথেই নিবিড় জাতিসত্তার প্রশ্ন, অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং ব্যক্তির প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। আরো বিশেষভাবে, আধুনিক সময়ে ব্যক্তির সংকট ও সামাজিক অসন্তোষ বিষয়ক যাবতীয় অমোঘ প্রশ্নের উত্তরও নিহিত সেই ভাষারই মধ্যে; মাতৃভাষার মধ্যে, ব্যক্তিকে প্রকাশ করার সেই তো পথ।

#
মায়ের জন্মদিন, পায়েস রাঁধতে পারি না আমি। তাই, ভাষা রেঁধে দিলুম। খেয়ে দেখো তো মা, কেমন লাগল। ভাষা মা, ভাল থেকো।