জ্বলিছে ধ্রুবতারা

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়



মা---তুমি মানেই একটা বড় লাল সূর্য আর তার পাশ ঘেঁষে টলটলে দুই দীঘিজল। গভীর একটা শান্ত নম্র ছায়াপড়া বিকেলের মত। সূর্যটা ডোবার ঠিক আগে একটা অন্ধকারের ভয় ছেয়ে ফেলার আগেই ঝুপ করে মুখ ডুবিয়ে দেওয়া যায় তোমার নরমে। বসন্তমালতি আর জবাকুসুমের গন্ধমাখা একটা ঠান্ডা আরাম আঁকড়ে চুপ করে পার হয়ে যাওয়া যায় ব্যস্ততম ট্রাফিকের মাঝখান দিয়ে জন্মান্ধ সেজে নির্বিকার। আমার হাতের মুঠো তখন ছোট্টটি হয়ে তোমার ডানার আশ্রয়ে। তুমি বলছ---আয়--- অমনি সামনে আদিগন্ত আকাশ দেখেও, উড়তে না শেখা আমি, অশক্ত পাখনার আমি, ভীতু বোকা পথভুল আমি পরম নিশিন্ত ঝাঁপ দিচ্ছি তোমার সুঘ্রাণ চিনে চিনে। ওই লাল আলোর দিকে। ওই সূর্য ওঠা মহাকাশের দিকে। ওখানে তোমার তৃতীয় নয়ন সর্বদা ঝকঝক করে বরাভয় এঁকেছে। আর আমি চিনেছি অক্ষরমালা, বর্ণলিপির পৃথিবী। বর্ণমালা কবে বর্ণালী হয়ে সাত রঙের পৃথিবীর দিকে সাদা ঘোড়ার রথে ছুটিয়ে নিয়ে গেছে আমায়। তুমি আমার কৃষ্ণসারথি আর আমি বারবার তোমাকে উত্যক্ত করে করে জেনে নিয়েছি কোন পথ জীবনের দিকে, কোন পথ ক্ষত ও ক্ষতির, কোন পথ মৃত্যুকে অতিক্রমে ধ্রুবকের। আমার সব কান্না অভিমান অভিযোগ তুমি দুহাতে ধরেছ যেমন লিখিত অক্ষরমালারা ধরে রাখে। কোন শৈশবে সাদা পাতা কালি ও কলমের উত্তরাধিকার তুলে দিয়ে একটা ঘোরানো রাস্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলেছিলে---এই পথটুকু যেতে হবে। এই পথে গেলে নির্লোভ মোহহীন একা হয়ে যেতে হয়। তুমি বলেছিলে। আমি তো জানতাম আসলে একা নয়, বহু বহু দূর থেকে কপালের ওই লাল আলোটুকু লাইটহাউসের মত , সন্ধ্যাতারার মত লক্ষ্য করে আমি ভেসে যেতে পারি মাঝসমুদ্রে। তোমার থেকে যত দূরে থাকি, আসলে তো গর্ভজলে ডুবে আছি আজীবন। কতবার অস্বীকার করেছি তোমার মতামত, উপেক্ষা করেছি অভিমান। আর ঘুমের ভেতর একা কান্নার সাথে গুটিসুটি ঢুকে গেছি তোমার ভেতর। সমস্ত আক্রমণের আড়ালে। আর কি শান্তির ঘুম, আহ! তুমি তো হাজার কন্যের মা। নিজের স্কুল আর কতরকম আশ্রমের কত মেয়ের তুমি আশ্রয়। গর্বে টইটম্বুর আমি হিংসা করতাম তোমার ছাত্রীদের। ওরা তোমায় সারাদিন পায়, সে যতই গম্ভীর বড়দিদিমনি হও না তুমি। আর সারাদিনের শেষে তোমার বুকের ভেতর মুখ গুঁজে হাজার শাসন বকাঝকার সাথে মাথার চুলে বিলি কাটা আঙুলগুলো কিরকম ছন্দে ছন্দে সরগম বাজাতো। ক্লান্ত তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম এই অসামান্য সুন্দর দূর্গাপ্রতিমার মত মুখখানা আমার মায়ের---আমার মায়ের! সব মায়েদের দিক থেকেই কি এমন চিরকেলে দখিনাবাতাস বয়? এমন নিরবচ্ছিন্ন আতপগন্ধ মাখা জন্মপায়েস আর সন্ধ্যাপ্রদীপ সেজে থাকে? অনেক অনেকদিন অবধি বিশ্বাস করেছি তোমার সত্যিই একটা তৃতীয় চোখ আছে যার কাছে কখনো কিছুই লুকনো যায়না। সেই তৃতীয় নয়নের কোন ঘুম নেই, কোন ক্লান্তি নেই, কোনো পলক নেই, কোন বিশ্রাম নেই। সে কেবল সন্তানের বিপদের দিকে, অমঙ্গলের দিকে, আশংকার দিকে প্রহরীর মত একা ঠায় জেগে থাকে। তোমার দুই ভুরুর মাঝখানে সেই লাল নক্ষত্রের মত টিপটা সমস্ত মুখখানা এক জ্যোতিতে ভরিয়ে রেখেছে সবসময়। এখন সে নক্ষত্রের রঙ ঘোর কালো। সঙ্গী মানুষটার চলে যাওয়ায় তোমার শূন্য কপাল সহ্য হয়নি আমার। তুমি কথা শুনেছ। শুধু পালটে গেছে রঙ। তাতে কি? ওই কালো রঙের নক্ষত্রের ভেতরও যে আমি তারাভরা রাতের আকাশটা দেখতে পাই। ধ্রুবতারাটাকে দেখতে পাই সারাজীবনের। টেলিফোনের অন্যপ্রান্তে তোমার কন্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে স্পর্শ এসে পৌঁছয় আমার দিনযাপনে। সারা দিনের শেষে শুধু “মা’ বলে ডেকে ওঠার জন্যই যেন সন্ধ্যে নামে। আজকাল নিজের ভেতর বড় বেশি তোমাকেই খুঁজে পাই ---মা।