নিরাপদ নির্জনতা

ফজলুল কবিরী



একটা অদ্ভুত চেহারার মানুষ আমাকে একদিন তাড়া করে। তখন আমি খুব ছোট আর আমার দুঁঠোট বেয়ে প্রায়শ লালা গড়িয়ে পড়তো। তারপর থেকে প্রায়শ এ ঘটনা ঘটতে থাকে। আমার বয়স বাড়ে কিন্তু তার বয়স বাড়ে না। ঠিক আগের মতোই খালিকটা সতর্ক দূরত্ব রেখে আমাকে অনুসরণ করতে থাকে। অনেক দূর থেকে আমি লোকটাকে চিনতে পারতাম। আমি তাকে দেখতাম আর তিনি আমাকে দেখে খানিকটা সতর্ক হয়ে পিছু হটতেন। আমি সভয়ে তাকে পরখ করতে চাইতাম।
আমি চাইতাম তাকে চিৎকার করে কাছে ডাকতে। কিন্তু আমার মুখে বুলি ফোটে না। আমি গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে মা’র কাছে ছুটে যেতাম। মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে বুকের আড়াল করে ফেলতেন। মায়ের হাতে কখনো পোড়া হাঁড়ি-পাতিলের কালির দাগ, কখনো কুঁড়া-বুশির ছোপ, কখনো খড়ের ময়লা লেপ্টে থাকত। মা আমাকে থামানোর জন্য একটা লম্বা লাটি নিয়ে লোকটাকে তাড়া করতো।
ধীরে ধীরে আমার ভয় কেটে যেত। লোকটা ছিল খুবই নিরীহ চেহারার। তাকে দেখে ভয় পাওয়ার তেমন সমূহ কোনো কারণ ছিল না। তবু তাকে আমি ভয় পেতাম। আমার মনের ভেতর কোনো না কোনো ভাবে ভয়ের এই লক্ষণ ফুটে উঠত। তখন আমি মা’র কাছে ছুটে যেতাম। মা ঠিক প্রতিবারের মতোই লাটি নিয়ে লোকটাকে তাড়া করত। আমার হৃদয়টা শান্ত হয়ে যেত। মা আমার নির্ভরতার আশ্রয় হয়ে বুকের ওমে জড়িয়ে রাখত।
তারপর আমি ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠতে থাকি। আমার চেহারায় আগের মতো লাবন্য থাকে না। কিন্তু ঠোঁটের ফাঁক গলে লালা পড়া থামে না। মা ঠিক আগের মতোই যত্ন করে শাড়ির আঁচল দিয়ে লালা মুছে দেয়। আমার ময়লা গায়ের রং সাবান দিয়ে ধুয়ে ফর্সা বানিয়ে দেয়।আমি হাসফাঁস করলে সান্ত্বনা দেয়। তবু আমার ময়লা ঘাঁটা থামে না। লোকটা আমার পিছু ছাড়ে না। আমি কখনো ভীতি নিয়ে, কখনো অভয় পেয়ে তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।
ছোটবেলায় যেমন সবার সাথে খেলতে মরিয়া হয়ে উঠতাম, ঠিক সেই সময়ের মতোই আমি ছোটদের সাথে খেলতে এখনো একইভাবে উতলা হয়ে থাকি। আমার লাটিম ঘোরানোর ইচ্ছা মরে না। রঙিন খেলনার বল হাতে নিয়ে বাকিদের সাথে দূরন্তপনায় মেতে উঠার তীব্র আকুতি থামে না। আর ঠিক তখনই লোকটা আমাকে সামনে হাজির হয়। খানিকটা দূরত্ব রেখে আমাকে অনুসরণ করে, আগের মতোই।
লোকটাকে দেখে আমি মাথা খারাপ হয়ে যায়। আমি করে হইচই করি। আমাকে দেখে ছেলেরা হাসাহাসি করে। অকারণে ঠাট্টা করতে শুরু করে। আমি তাদের দিকে তেড়ে যেতে চাই। তাদের কাছ থেকে বলটা কেড়ে নিয়ে অনেক দূরে ছুঁড়ে ফেলতে চাই। তারা আরও বেশি হাসতে থাকে। মজা নিতে থাকে।
মা ঠিক আগের মতোই কখনো হাতে পোড়া হাঁড়ি-পাতিলের কালি নিয়ে, কুঁড়া-বুশির ছোপ লেগে থাকা হাত না মুছে কিংবা খড়ের ময়লা লাগা হাত নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার হইচই থামানোর চেষ্টা করে। দুষ্ট ছেলের দল তবু থামে না। যখন আমি শান্ত হই, মা ঠিক আগের মতোই ছেলেপেলের ভর্ৎসনা করে আর বলে বাপহারা একটা ছেলেকে নিয়ে তারা যেন হাসিঠাট্টা না করে।
মা তাদেরকে বলে, বোবা মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা করতে নেই। তার ছেলেকে নিয়ে কেউ এরপর থেকে ঠাট্টা-মশকরা করলে তিনি তাদের নামে বাপ-মা’র কাছে নালিশ দেবে।
তারপর ফুঁসতে ফুঁসতে মা আমাকে দ্রুত সরিয়ে আনে। আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ও বয়সের ভারে নত মুখটা দেখে আমার অসহায় লাগে। আমার লোকটার কথা মনে পড়ে। কিন্তু হঠাৎ মুখটা আমি মনে করতে পারি না। মনে হতে থাকে চেহারাহীন একটা লোক আমাকে দূর থেকে বলছে, ভয় পাস নে।
আমি আবার ছটফট করতে থাকি। ইচ্ছে করে দূরে পালিয়ে যাই। মা’র কাছে গিয়ে ভয়ে মুখ লুকাই। লোকটা যেন আমাকে দেখতে না পায়।
কিন্তু মা’র বিধ্বস্ত ও অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে আমি গোঙ্গানি থামিয়ে দিই। মা’কে দেখে আমার খারাপ লাগে। বুকের ভেতর কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে। মাকে খুব নিঃসঙ্গ লাগে। মা’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আমার বাবার কথা মনে পড়ে। ইচ্ছে করে বাবাকে বলি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য। মা’র মাথার কাছে বসে গুনগুন করে গান শোনানোর জন্য। মা’র বিষণ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতর কান্না দলা পাকিয়ে ওঠে।
আমি বাইরে চোখ রাখি। আমাকে অনুসরণ করতে থাকা চেহারাহীন লোকটার মুখের দিকে একপলক তাকানোর চেষ্টা করি। দেখি তিনি আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছেন।
আমি আবিষ্কার করি অদূরে যে-লোকটি আমার দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে আছে, তার চেহারা আচমকা পাল্টে গেছে। আমি সভয়ে বাবা বলে চিৎকার করে ওঠি।
আমার গোঙ্গানি মা’র কানে যেতেই মা ছুটে আসে। ক্লান্ত শরীরটা দিয়ে অভ্যাসমতো আমাকে জড়িয়ে ধরে। শাড়ির আঁচল দিয়ে ভেজা চোখ মুছে দিতে তৎপর হয়। আমি অসহায়ভাবে মা’র বন্ধন থেকে নিজেকে সরিয়ে অসার হাতদুটো দিয়ে মা’র শাড়ির আঁচল টেনে তার চোখদুটো মুছে দিতে তৎপর হই।
মা’র অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বাবার কথা পুনরায় ভুলে যেতে শুরু করি।