বিজয়িনী

তপতী বাগচী




তুমি ঢেঁকী তে পাড় দিচ্ছ।দিয়েই যাচ্ছ। তুষের ধুলোয় উড়ছে তোমার বর্তমান, তোমার ভবিষ্যৎ।প্রতিটি পাড়ের সঙ্গে সঙ্গে তোমার দেহ নিংড়ানো পরিশ্রম তুমি উৎসর্গ করছ তোমার জীবনদেবতাকে।এভাবেই দিনের পর দিন , মাসের পর মাস… । পার হয় বৎসরও ।ছাব্বিশ থেকে সাতাশ তুমি তখন।
এক বছরের বাচ্চাটা মাঝে মাঝে কোলে উঠতে চায়। একটু আদর করে নিয়ে আবার বসিয়ে রাখো ঢেঁকীঘরের গোবর লেপা মেঝেতে।বাচ্চা তো। যদি মেঝে ভিজিয়ে ফেলে ? অন্য মানুষের ঢেঁকীঘর যে ! কিন্তু ধানটুকু ভেনে চাল তো করতেই হবে।যে মেয়ে চাল ঝেড়ে ঝেড়ে তুষ আর চাল আলাদা করছে তার মজুরী বাদ দিয়ে এই চাল বিক্রী করে যা পাওয়া যাবে সেটাই তো একমাত্র এখন।এতেই চলবে তোমার সংসার।চলবে বিছানায় মিশে যাওয়া অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসাও।কারণ তিনি অসুস্থতার কারণে চা-বাগানের চাকরী থেকে বহিষ্কৃত। ইউনিয়ন মামলা লড়ছে।আর দাঁতে দাঁত চেপে নির্বিকার মুখে লড়ে যাচ্ছ তুমি।তোমার চার সন্তান,অসুস্থ স্বামী ও বেকার দেবর এখন তোমার ওই ছোট্ট দু’খানি পায়ের শক্তির ওপর ভর করে পাড়ি দিচ্ছে বড় কঠিন ভয়ঙ্কর এক পথ।কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়নি,কেউ বলেনি চিন্তা করোনা আমরা আছি।তুমি শুধু জানতে,কিছুতেই হারবেনা তুমি। যে করেই হোক জিততে হবে। জিতেছিলে। একা রুখে দিয়েছিলে একটা গোটা পরিবারের ভরাডুবি…।
তোমাকে দেখেছি সুতো টানটান করে ডিম দু’ভাগ করছ নিখুঁত করে। সে সময়ে তুমি কথা বলনা। কাঠের গনগনে আঁচে লাল হয়ে থাকা মুখে একাগ্রতা। কারণ তখন একাত্তর। জয়বাংলা থেকে আসা আট ভাইবোনকে নিয়ে মুখের সংখ্যা সতের। কারণ আমরা ভাইবোনেরা প্রত্যেকে পরস্পরের থালার দিকে জুলজুল করে তাকাই এই ডিমের দিনে। কাকীমাকে দেখেছি লুকিয়ে ওপার থেকে আনা এক রাশ গহনা পরে মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে,আর তাঁরই স্বামী সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে তোমাকে দেখেছি অবশিষ্ট সোনাটুকু গা থেকে খুলে দিতে…
তোমার সমস্ত অভিব্যক্তি লুকোনো মুখেও শ্যামলকাকু এলে আলো ফুটত। তোমাকে দিদি বলে ডাকত।‘তুই’ বলতে ।ভাই ফোঁটা দিতে।দুজনকে ছোট ছোট পাথরের টুকরো দিয়ে গুটি খেলতে দেখেছি…ফুলনো ফুলনো ফুলনো টি, এক এক্কে দোলনো দোলনো টি…। শ্লেটপেন্সিল দিয়ে মেঝেয় ঘর কেটে ষোলোগুটি বাঘছাগল। তোমার অত বড় অপারেশন হবে শুনে শ্যামলকাকু হাউমাউ করে কাঁদছিল। দেখে আমরা অবাক। বাবু খুব গম্ভীর ,অন্যদিকে তাকিয়েছিল। একা বন্ডে সই দিয়ে ও টি তে ঢুকেছিলে । শ্যামলকাকু বা বাবু কেউ যায়নি। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ আমাদের চা বাগান থেকে অনেক দূর।
একদিন সন্ধে পেরোনোর অনেক পরে বাড়ী ফিরেছিলাম।চুলের ফাঁক থেকে জোনাকী বের করে ফেলতে ফেলতে বলেছিলে …এভাবে যখন তখন যেখানে সেখানে যেতে হয়না,বড় হয়ে গেছিস।…মনে মনে বলেছিলাম ,সন্ধের নীল হয়ে যাওয়া নদীটাকে কেন যে তোমার মত লাগছিল…!
সেটা ১৯৭৬। আমি ষোলো। তুমি ৩৮।পোষাক আসাকের ভেতর সোনার গয়না লুকিয়ে নিয়ে একা একা চলে গিয়েছিলে দেবগ্রাম ।ছোটোবোনের বিয়ে দিতে।দাদু দিদা বাংলাদেশে ফিরে যাবার সময় ভরসা করে এই দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন তোমায়।পাত্রের বাবা শয্যাশায়ী।পাত্রপক্ষে র একমাত্র চাহিদা ছিল দেবগ্রামে পাত্রীকে নিয়ে এসে বিয়ে দিতে হবে।তাঁরা সহযোগীতা করবেন।করেছিলেন।তোমাক ে দেখে তাঁরা ভারী অবাক।আজও তুমি সেখানে গেলে পাড়ায় সাড়া পড়ে যায়।
মাঘ মাসের বিষাক্ত ঠান্ডায় ভোর চারটের সময় ছেলের বাইকের পেছনে বসে দেড় ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়েছিলে অনায়াসে। নার্সিং হোমে ভর্তি বৌমা।কিন্তু কপাল মন্দ।অক্সিজেন এর অভাবে অপারেশন করা যাচ্ছেনা, যেটা তখনই না করলে নয়।ভাইকে আলিপুরদুয়ারে রেখে তুমি একা ছুটে চলে গেলে কুচবিহার গ্যাস আনতে। এনেওছো। কিন্তু সে গ্যাস কাজে লেগে গেল অন্য রোগীর অপারেশনে।তুমি হাসিমুখে নাতির মুখ দেখলে…।ততক্ষণে সেখানে গ্যাসের জোগাড় হয়ে গিয়েছিল…
সেবার বাবুকে বলেছিলে, এ আর নতুন কথা কি! একদিন আমরা সবাইই চলে যাব…তুমি না হয় জেনেছ তোমার ক্যান্সার…আমি বা অন্যকেউ হয়তো জানিনা…কিন্তু মৃত্যুর কথা কে না জানে… ভয় কিসের ! যে কটা দিন আছি ওসব ভাবব কেন!
সেই তুমিই ক’দিন পরে সাতষট্টি কিলোমিটার উজিয়ে এলে শহরের পরিচিত জুয়েলারীর দোকানে। বেছে বেছে নকশা পছন্দ করলে।কুড়িয়ে বাড়িয়ে জড়ো করা সোনার টুকরোটাকরা এগিয়ে দিয়ে বললে,যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি দেবেন শাঁখাবাধানো দুটো…কটা দিন আর পড়তে পারব জানিনা তো…!সঙ্গে ছিলাম। তাকিয়ে হাসলে…বললে, বড্ড শখ ছিল রে,নানান ঝামেলায় বানানো হয়ে ওঠেনি…
আবার সেই উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ।লজ ভাড়া করে থেকে গেলে।আবার সেই একার লড়াই। ক্যান্সারের রোগীর সেবা…ডাক্তারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ…সিদ্ধান্ত নেয়া…রক্ত জোগাড়…।ডাক্তার নার্সদের সঙ্গে তর্ক তাদের অমানুষিক ব্যবহারের জন্য । অনমনীয় জেদে রোগীর স্বাভাবিক অধিকারটুকু আদায় করে ছেড়েছ।ভাই নতুন চাকরীতে। বোনেরা যে যার সংসারে। কারোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই…তুমি ছিলে একনিষ্ঠ অক্লান্ত তোমার কাজে।
বাবুর দেহ দাহ করে ভাইয়েরা ফিরে এলে নিয়ম মতো তোমাকে স্নান করতে হয়। পাশের বাড়ীর কাকীমা তোমার হাত টিপে টিপে সাবধানে শাঁখা খুলে নিলেন।তুলসী তলায় রেখে বললেন, জলে ফেলে দিও।স্নান করে বেরিয়ে এলে অন্য তুমি।অভ্যেসবশত হাত-আয়না মুখের সামনে ধরেছিলে ।অভ্যস্ত হাত চলে গেছে সিঁদুর সন্ধানে। বিভ্রম সামলে নিতে তোমারও কয়েক মুহূর্ত লেগেছিল…তুমি সমস্ত সিঁদুর উপুড় করে জলে ঢেলে দিলে।মুখের একটা রেখাকেও কাঁপতে দেখিনি।
আমার সংসারের বাড়তি জামাকাপড় ,কৌটো, বাসনপত্র,বইখাতা কত কতবার ১৯০ মাইল পাড়ি দিয়ে চলে গেছে সংকোষ চা বাগানের কোনো গরীব পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে…বহন করে নিয়ে গেছ তুমি…অদ্ভুত সুন্দর যুক্তি তোমার…আমি করলে যদি কারো ভাল হয় তবে এটুকু করবনা ? ফেরিওলা সারাদিন শাড়ীকাপড় ফিরি করে এলে তার মা হতে তুমি।তার ক্ষিধের খাবারের, বিশ্রামের জায়গার ব্যবস্থা থাকত তোমার ঘরে।দূর শহর থেকে একা একা চাকরী করতে আসা ছেলেকে ডেকে এনে ভালোমন্দ রেঁধে না খাওয়ালে তোমার মমতা পরিতৃপ্ত হয়না। শাকউলি বুড়ি তোমার মা।বোবা ভিক্ষুকমেয়ে তোমার কন্যা…তোমার বসুধৈবকুটুম্বকম্…
আসলে এভাবে আঁকা যায়না তোমাকে,বলা যায়না তোমার কথা…হয়তো কোনো ট্রিলজি বা কয়েক খন্ড রচনার প্রয়োজন…আমি শুধু অক্ষম স্তবকমাত্রে তোমাকে ছুঁতে চাই… আদলে আনতে চাই তোমার জীবন।চড়াই উৎরাই, অন্ধকার গুহাপথ,সংকীর্ণ গিরিবর্ত্ম- কি নেই তোমার যাত্রাপথে…উষর মরুভূমিগুলো তুমি কদাচিৎ দেখিয়েছো আমাদের…তুমি বড় দাম্ভিক…ভাগ করনি কোনো করুণ ট্রাজেডি…কঠিন আত্মবিশ্বাসে কখনো মাননি কারো বাধা…এগিয়ে গেছো ঝুঁকির হাত ধরে…আসলে কাউকে পাত্তাই দাওনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বা পরে…তুমি আজও এই রকমই আছো।
তোমার নাতির প্রেমিকার সাথে তোমার ভাব খুব।ওদের লুকিয়ে করা যত পরিকল্পনার কথা আমি জানিনা…সব খবর তুমি রাখো…যেমন করে চললে ওদের একটু প্রেম করতে সুবিধে হয় তুমি সেই পথ বাতলাও আমাকে…ওদের মেলামেশার নিত্যি নূতন ফন্দি ফিকির তোমার সাথে। বিরক্ত হয়ে মনেমনে বলি…কই,আমার বেলা এত স্বাধীনতা দাওনি তো! -“ প্রেম যে কি বস্তু তা তো সারাজীবনে জানতে পারলামনা…প্রেম করতে কেমন লাগে আমায় একটু বলনা ভাই!ভালবাসাবাসি খুব আনন্দ তাইনা রে ?” নাতির সাথে খুনসুটি করে বলা তোমার এ কথা আমি শুনে ফেলেছিলাম…। পা টিপে টিপে ফিরে এসেছি ।গলার কাছে কি কি সব যেন ভীষণ আটকে আসছিল…