জপ

তৃপ্তি সান্ত্রা




তমাল,ঐহিকের একুশে ফেব্রুয়ারি সংখ্যার জন্য লেখা চেয়ে যখন তুমি ফোন করলে- অন্য একটা ফোন আসছিল। আমি তোমার ফোনটা কেটে দিই। নুপুর ফোন করছিল,আমার ছোড়দার মেয়ে। ছোড়দার অবস্থা ভালো নয়-ভেন্টিলেশনে দিতে হবে। হার্ট ভালো নয়। সুগার। হাঁপানির টান। এসব নিয়ে রবিবার নার্সিংহোমে ভর্তি হয়। আর সোমবার রাত্রি দশটার সময় একরকম জোর করে,ডাক্তার নার্সদের গালাগালি করে বাড়ি চলে আসে। সারা রাত্রি ছটফট করে সকালে জ্ঞান হারায়। সারাদিন জ্ঞান ফেরেনি।ডাক্তারবাবু ভেন্টিলেশনে দেবেন জানিয়েছেন।
ছিয়াত্তর বছর বয়স। এখনও টান টান এবং অল্প বয়সের মত গোঁয়ার।জেদী। অসুখটা মানতে পারেনা। এর আগেও একবার ভেন্টিলেশনে ছিল,তারপর ফিরে এসে দিব্যি বাজার,বেড়ানো,বইপড়া,টিভ ি দেখা। তবু খুব দোলাচলে আছিএ- এবারও কি ঠিকঠাক ফিরতে পারব,নাকিফিরবেনা ছোড়দির মতো। বড়দির মতো। মার মতো। আর না ফিরেও থেকে যাবি ছোড়দা – তোদের সেই দুর্ধর্ষ ডানপিটে ক্লাব,খেজুর রসের কলসী খালি করে হিসি ভরে রাখা,রাত জেগে রুটি তৈরি হচ্ছে বন্যাত্রাণ্র,খুঁটে খুঁটে ইংরাজি কাগজ আর দেশ পড়ার ঝোঁক,আর বদরাগী তুই,ট্যলটেলে চা চা পছন্দ হয়নি,আছাড় মেরে কাঁচের ফুলদানি ভাঙ্গতে গিয়ে পায়ের শিরা কেটে গেল- গলগলে রক্ত...
কিন্তু ঐহিকে তুই না,লিখতে হবে মা’কে নিয়ে। বড়দা,মেজদার একদম বিপরীত চরিত্র সেজদা আর ছোড়দা তুই।
বড়দি,মেজদি,ছোড়দির একদম বিপরীত আমি। মা সবাইকে সামলালেন। ‘হাতের পাঁচ আঙুল তো সমান হয়না’ – একটা নির্লিপ্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে কথা কটি বলে মা হাল্কা রোদে আসন পেতে বসে হাতে ফুল নিয়ে প্রস্তুত। কথা হবে। ইতু কথা।

আমরাও হাতে ফুল নিয়ে বসি এবং কথাটি দেখতে পাই। কার্তিক যায়,অগ্রাহায়ন মাসে ইতুলক্ষ্মী পাটে বসে। এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ থাকে। তার দুই কন্যা থাকে। উমন। ইশনান। বড়ো গরিব। দিন আনে দিন খায়।
ব্রতকথার বইতে দুই কন্যার নাম উমনো ঝুমনো। যিনি কথক তাঁর কোনও নির্দিষ্ট টেক্সট নেই। নিজের নিজের মত করে পাল্টে নেন। সমসাময়িক কত খাবার,পোশাক,যুগের ফ্যাশন,রীতি নীতি,বোলচালযে ঢুকে যেত মার কথায়। কথন যদি অসাধারণ। প্রকৃতি,মানুষ,পশুপাখি মুর্ত হয়ে উঠতো বর্ণনায়।
পিঠে খাওয়ার অপরাধে দুই মেয়েকে বাবা ফেলে গেছে জঙ্গলে। কি ভয়ংক্র বন। শ্বাপদ ঘুরে বেড়াচ্ছে । বিরাট এক গাছের নীচে দাঁরিয়ে কাঁদছে দুই বালিকা। চড় চড় শব্দে ফেটে গেল গাছের বুক। এসো। এসো। বুকের কোটরে এসো। নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে রইল উমন,ইশনান। আমি যেন এতদিন পরও চড় চড় করে গাছের বুক ফেটে যাওয়ার শব্দটা শুনতে পাই।
জয়মঙ্গলবার,নাগপঞ্চমী, নীলষষ্ঠী – সব ব্রতকথা বলার আশ্চর্য দক্ষতা ছিলো মার। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতো। গানের গলাও ছিল চমৎকার – আশি বছর বয়সেও খালি গলায় স্কেল ঠিক রেখে গাইতে পারত। সবই কীর্তন। প্রতিদিনই গান গাওয়া সুতরাং কথা ভুলে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। রীতিমত ভক্ত শ্রোতৃমন্ডলী ছিল মার। তারা গান শুনতে আসতেন। মহাভারতের কথার সহজ ব্যাখ্যা শুনতে আসতেন। স্মৃতি প্রখর। মাথা পরিষ্কার। স্থান কাল পাত্র ঘটনা পরম্পরা কিছুই ভুল হত না।
রাজশাহীর গোয়ালপাড়ার,সাগরপাড়ার , মালদার সদরঘাট মকদমপুর কালীতলা বক্ষটুলি আর কলোনির কত ছুটি,হেনা কাকীমা,লক্ষ্মী,গীতা,কম লা… কত কত জন তাদের কথা নিয়ে আসতো মার কাছে। মা যেতো তাঁদের কাছে । বোসবাড়ির মায়ার রাত বিরেতে প্রসব যন্ত্রণা,গুহবাড়ির স্বপ্নার বিয়ের এয়ো কাজের বিধি চট্টগ্রামের দত্ত মামীমা পোলাওটা ঠিক পারেন নাকিন্তু কেটু যে ঘাটের মালিকদের নেমন্তন্ন করেছে – সুতরাং রান্নাটা উতরে দেওয়া – এইসব সামাজিক ক্রিয়া। বাড়তি কিছু ন,বাড়াবাড়িও নয় – স্মাজ থাকলে এসব তো করতেই হয়,না? তো এইসব কথা আড্ডা গান সমাজ সামাজিকতা সম্পর্ক সম্পর্কের শীতলতা উষ্ণতা কীভাবে আমার ভেতরেও সেঁধিয়ে যায়। কোলমোছা মেয়েকে নিয়ে মার খুব কিন্তু ছিল – বেশী বয়সের সন্তান আমি,আমার জন্য নাকী কিছুই করতে পারেনি মা। অথচ সবাই জান,আমি তো জানিই আমার ওপর টান ছিল সবচেয়ে বেশি,শরীরের সব রোমকূপে মার করতল উপুড় করা। বাংলা চিঠি লিখতে জানা এক গ্রাম বাংলার মেয়ে মা। তার গলার স্বরে স্রোতের শব্দ। কাজের ফাঁকে ফাঁকে,দিনের ফাঁকে ফাঁকে। দিন থেকে রাত্রি,রাত্রি থেকে দিন কথা উঠে আসে পঞ্চমুখে। চিরকুট উপন্যাস মহানাগের আসনে সাদা থান জড়ানো যে কথক ঠাকুরানির ঠাকুমার কথা জবা বলেছে, তিনি আমার মা।
কী হয় এক সময়,শেষ বয়সে হাতের তালু অকেজো হতে হতে তেল তেলে হয়ে যায়। মায়েরও তাই হল। কড়ে আঙুল ঘুরিয়ে জপ। ষাট বছরের ধাঁধাঁ উনুন হেঁসেলে কলোনির তাসের আড্ডাযোগিন্নী বেশ না ভাল’র সুর সব স্থির তালুতে। বিশ্ব ঘুরছে বেড়ে যাওয়া নখের ডগায়। জপমন্ত্র নিয়ে খুব কৌতূহল কী বল বলনা, বল না কী বল – জেদ করেও জানতে পারিনি। কারণ মন্ত্র বলতে নেই। শুধু নিজের মন্ত্র হলেই জানা যায়।
কিন্তু অস্থির সময়ে আমাদের তো কোনও মন্ত্র নেই জপের,যাপনের মন্ত্র মানে যাদু,মন্ত্র মানে যা অবে না তার ইচ্ছে-মেলা। মার ছিল। ম্যেদের থাকে। ভুল হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি,খাওয়া কমে আসছে। মসৃণ তালুতে আঙুল ঘুরছে টলতে টলতে। বিড়বিড় করছে মা ‘রাজশাহী রাজশাহী’
তমাল তুমি বলছিলে মা নেই মাতৃভাষা আছে। মালদার কত কাছে রাজশাহী। সেই যে দেশভাগের সময় চলে এসেছিল আমাদের পরিবার – তাঁদের পঞ্চাশটি মধ্যে বাহান্নটি কথাই রাজশাহী নিয়ে,কিন্তু তারা কোনোদিন ওপারে যায়নি।
এ বছর আমি একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা যাওয়ার আগে রাজশাহী যেতে চাইছি। যাদের সঙ্গে গেলে ভালো লাগতো,বড়দা নেই। ছোড়দি নেই। বড়দি মেজদা সেজদা ছোড়দা কেউই যাওয়ার অবস্থায় নেই। আন্টি,আঙ্কল,আউচ আর অমম – এর চাপে হাঁসফাঁস বাংলা আর আমাদের একুশে প্রয়াস।
বিশ্বায়ন পাঠক্রমে অবাধ বাণিজ্য ইশারা,বুবন গ্রামের কর্পোরেট পরিক্রমা, কিন্তু প্রাচীর তো উঠছে,আর পোহালে নদীর তল কাটার মতো ধর্ম আর মৌলবাদী স্ট্রোকে ফেটে যাচ্ছে আমাদের ভিত্তিভূমি।
একা তো পারবোনা কেউ। হাঁস পুকুর মাছ কাঁটা ধান শিস গোলাসূর্য পাখি গাছ কত ফোঁড়ে কাঁথা বোনা। বসার আসন বোনা। বুকের চাদর বোনা। মায়েরা হারিয়ে যান না। কথা বুনে বুনে গড়ে দেন প্রতিরোধ। আমাদের একটা খাতা আছে অপেক্ষায়। সেই ‘চিরকূটে’র জবার খাতার মতো। সেখানে অনেকের চিঠি আছে । কথা আছে। লেখা আছে। মায়ের ছুটি,হেনা কাকীমা,লক্ষ্মী গীতা কমলার মতো আমাদেরও কত কত খন্ড খন্ড অপ্রকাশিত আমি। অপ্রকাশিত আমিত্ত্বের কষ্ট। আমির যন্ত্রণা। অহমের যন্ত্রণা।
কাজ একটা দিয়ে গেছেন মায়েরা। কড়কড়ে মার দেওয়া আত্মাভিমাঙ্কে উপেক্ষা আর আঘাতের তরলে ন্যাতা করে,ছিঁড়ে কুটি কুটি করে উড়িয়ে দিতে হবে বাইরে। অনেক লোক। অনেক দুঃখ । অনেক খন্ড। অনেক ছিদ্র। টুকরো টুকরো আমরা উঠে আসবো।
কোনো ফলক নেই,নাম নেই। জলজ প্ররথিবীর কোনও মিনার নেই। জয়তোরণ নেই। শষ্প আছে। আছে আবিস্কারের উল্লাস। সহনের উল্লাস। প্রতিরোধের উল্লাস। আছে মিথ, যেভাবে লোকগাথা। বুজে যাওয়া খানা খন্দ থেকে যেভাবে কথারা উঠে আসে।
উঠে আসে বর্ণমালা। জপমন্ত্র।
মাতৃভাষা।
মা।