মা মাতৃভূমি মাতৃভাষা

নভেরা হোসেন




মা, মাতৃভূমি, মাতৃভাষা- এই তিন যেন একই সুতায় গাঁথা। পৃথিবীতে একসময় বর্তমান রাষ্ট্রকেন্দ্রিক শাসন-ব্যবস্থা ছিল না। ছোট ছোট গোত্রে বিভক্ত ছিল মানবজাতি। সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল মানব-সম্প্রদায়। যে স্থানে সুপেয় পানি, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং বসবাসের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলা সম্ভব হতো সে স্থানেই ছোট ছোট দল বেঁধে মানুষ বসবাস করতো। নিজেদেরকে একটা টোটেমের অধীনে গোত্রভুক্ত করত, পূজা করতো পাহাড়, গাছপালা, সূর্য এমনকী মা অর্থাৎ মায়ের আরাধনা করতো মানুষ। কারণ নারীকে শক্তি হিসাবে দেখা হতো, যে জন্ম দিতে পারে, যার গর্ভস্থ সন্তান হয়ে মানুষ পৃথিবীতে পদার্পণ করে। গোত্রের সদস্যরা একসময় গুহা মানব ছিল, তখন তারা আকার-ইঙ্গিতের মাধ্যমে মনের ভাবকে প্রকাশ করতো। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে আকার-ইঙ্গিতের মাধ্যমে ভাব বিনিময়ের বিষয়টি বদলে যেতে থাকে, শুরু হয় মৌখিক ভাবে ভাব বিনিময়। প্রথমত মানুষ মৌখিকভাবেই আদান-প্রদান করতো পরে শুরু হয় প্রতীকের সাহায্যে লেখার প্রচলন যা লিখিত ভাষার প্রাথমিক ভিত্তি। এই প্রতীকী মাধ্যমই একসময় মুখের ভাষাকে রূপান্তর করতে থাকে। গোত্রভিত্তিক মানুষের আদান-প্রদানের ভাষার মধ্যেকার পার্থক্য স্পষ্ট হতে থাকে। একটি গোত্র হতে অন্য গোত্রের ভাষার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় মূলত স্থানিক দূরত্বের কারণে, প্রতিবেশগত কারণে। প্রতি চার কিলোমিটার অন্তর ভাষা বদলে যেতে থাকে। গোত্রভিত্তিক সমাজ বদলে রাজ্য গঠিত হয, তৈরি হয় রাজতন্ত্র, বড় পরিসরে চর্চিত হতে থাকে ভাষা। একটি রাজ্যে বা দেশে একটি ভাষাই মূলত প্রধান ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। সেই ভাষাতেই রাষ্ট্র পরিচালনা হতে থাকে। অনেকসময় দেখা যায় দখলকারী শাসকরা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ভাষাকে স্বীকৃতি দেয় না। রাষ্ট্রের সব কাজ পরিচালিত হতে থাকে বিদেশী ভাষায়, সাহিত্যও রচিত হয় ভিনদেশী ভাষায়। মোগল শাসনামলে ভারতবর্ষে এ ঘটনার বহু নজির দেখা যায়, তখন মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা হয় অবহেলিত কিন্তু গোপনে হলেও মানুষ তার মনের ভাবকে মায়ের ভাষা, মাতৃভাষাতে প্রকাশ করতে থাকে। লিখিত হয় বহু দুর্লভ সাহিত্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা চলতে থাকে মায়ের ভাষায়। ভাষা এখানে মায়ের প্রতিরূপ হিসাবে আবির্ভূত হয়। একাকার হয়ে যায় ভাষা, মা, মাতৃভূমি। পৃথিবীতে বহু জাতি, গোষ্ঠী মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছে, করছে। বাংলাদেশে এর দৃষ্টান্ত অত্যন্ত গুরুত্ববহ একটি ঘটনা। মাতৃভাষায় মানুষ দৈনন্দিন কাজকর্ম চালায়, ব্যবসা-বানিজ্য করে, শিক্ষা অর্জন করে। মাতৃভাষার প্রতি জন্মগতভাবেই মানুষের তীব্র আবেগ তৈরি হয় এবং অপরিহার্য হয়ে ওঠে এ ভাষা। মানুষ এ ভাষায় চিন্তা করতে শেখে , জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশও ঘটে থাকে মূলত মাতৃভাষার মাধ্যমে। মাতৃভাষায় ভাব প্রদান করতে যখন কেউ বাধাগ্রস্থ হয় তখন তা সে ব্যক্তির জন্য মৃত্যুর মতো কঠিন হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ-ভারত ভাগ হয়ে তৈরি হলো ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো দেশ। এই দুটো দেশেই নানা জাতির, ভাষার, ধর্মের মানুষের বাস। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে তৈরি হল পাকিস্তান, যার শাসন ক্ষমতা ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে। পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু ভাষাভাষী সংখ্যায় বেশি হলেও পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বাংলাতে কথা বলত এবং নানা কাজ-কর্ম করতো। যদিও অফিস আদালতে বৃটিশ আমল থেকেই ইংরেজী ভাষায় কাজকর্ম চলতো, তার মানে এক জগাখিচুরি অবস্থা। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের নেতা কায়েদে আজম জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ঘোষণা করেন উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এই ঘটনা পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা ভাষা-ভাষী জনগনের মনে গভীর আঘাত সৃষ্টি করে। ছাত্ররা সরাসরি এ ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, ীশল্পী, সাংবাদিক সকল পেশাজীবীরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। কৃষিপ্রধান এ দেশের কৃষক-শ্রমিকরাও এ আন্দোলনে সামিল হয়, দেশের ভেতর মানুষ রাগে, ক্রোধে ফুঁসতে থাকে। পশ্চিম-পাকিস্তানী শাসকরা নানাভাবে বাংালদেশীদের সাথে বৈষম্য করতে থাকে। অর্থনৈতিকভাবে, চাকরি-বাকরি, সেনাবাহিনীসহ সকল ক্ষেত্রে পশ্চিম-পাকিস্তানীরা সুবিধা ভোগ করতে থাকে। সেসময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিজের মাতৃভূমি, ভাষা, সংস্কৃতিসহ অর্থনৈতিক সাবলম্বীতার জন্য মুখিয়ে ওঠে। জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে স্বতন্ত্র দেশ, রাষ্ট্রভাষা তৈরির স্বপ্ন তৈরি হতে থাকে। তারই ফলে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্ররা পুলিশের ব্যারিকেড অগ্রাহ্য করে সামনের দিকে এগোতে থাকে , নিজের ভাষা ও মাতৃভূমির মর্যাদার জন্য আত্মোৎসর্গ করে। পুলিশের গুলিতে নিহত হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ বহু ভাষা আন্দোলনকারী। একটি জাতি তার মায়ের ভাষা, মুখের ভাষাকে রক্ষার জন্য এই প্রথম পৃথিবীতে নিজের রক্ত ঝরাল। সৃষ্টি হলো অনন্য দৃষ্টান্ত, এখন যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সৃষ্টি করল। মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি এই দুয়ের এক অপূর্ব সৃষ্টি বাংলাদেশ রাষ্ট্র। মা আর মাতৃভূমি, আর মাতৃভাষাকে ভালবাসার এক বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে এই জনপদে যা যুগে যুগে ভাষার প্রতি, দেশের প্রতি, মায়ের প্রতি মানুষকে ভারবাসতে প্রেরণা জোগাবে ।