বরফের দিন

মণিকা চক্রবর্তী



অদ্ভুত নির্জনতা। জানলার পর্দাটা তুললে দেখা যাচ্ছে বরফে মোড়া গির্জার চূড়া। ডিভানের উপর শুয়ে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কটা নিয়ে ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয় নিশাত। গত বছর নিউইয়ার পার্টিতেও ফয়সলের দু-হাতের বাঁধনে নিজেকে মুক্তভাবে ছেড়ে দিয়ে নেচেছিল সে। আমেরিকার পিটসবার্গ শহর। ইস্পাতের শহর। নদীর উপরে বিশাল ব্রিজের তোরণ। ওরা দুজনেই আইটিতে পড়তে এসেছিল। ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে গত দুবছর ধরে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের জোগাড় করতে গিয়েই ফয়সলের সাথে পরিচয়ের সূত্র। তারপর ঘনিষ্ঠতা। হেমন্ত পার হয়ে শীত আসার সময়টায় কেমন ভয় ভয় লাগে। যেন হামাগুড়ি দিতে দিতে একটা প্রচন্ড শীতের পাহাড় তাকে জমিয়ে দেবে একেবারে। অদ্ভুত রহস্যময় এই তীব্র শীত আর তুষার পাতের সময় । নতুন বছরের কয়েকটা দিন আগে থেকেই সব কিছূর ছুটি হয়ে যায়। পুরো শহরটাতেই ছুটির আমেজ। তখন ক্যাম্পাসও খালি। অনেকেই চলে যায় ছুটি কাটাতে। নিশাতেরও ইচ্ছে করে এই ইস্পাতের শহর থেকে মুক্তি পেতে। সেই সময়টায় স্টিপ স্ট্রিটে এক রুমের চিলে কোঠার একটা ছোট্টঘরে ভাড়া নিয়ে থাকে নিশাত। বাড়িওয়ালার বয়স আশির ওপরে। নিঃসঙ্গ। তীব্র শীতের এই সময়টায় ভদ্রলোকটিও বড় একা । তার কুকুর টমি চেষ্টা করে বৃদ্ধের নিঃসঙ্গতাকে হঠিয়ে দিতে। এইসময় নিশাত ও ফয়সলকে পেয়ে ভদ্রলোক খুব খুশি হয়। ছুটির এই সময়টা ওরা গত দুবছর এখানেই কাটিয়েছে। এখানকার কান্ট্রিসাইডটা দারুন সুন্দর । ওরা দুজনে ঘুরে বেড়িয়েছে তুষারে ঢাকা জঙ্গলের বিভিন্ন এলোমেলো বাঁকে। রাতে ফিরে বারবিকিউ করেছে নিশাত ,ফয়সল ,আর বৃদ্ধ শেতাঙ্গ বাড়িওয়ালা মিলে। টমিও আনন্দে বার বার গায়ের কাছে শরীর ঘষে দিয়ে জানিয়ে গেছে সবাইকে ঘিরে আঁকড়ে বেঁচে থাকার আনন্দ আর উত্তাপের কথা।

আজকের সময়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন । কয়দিন আগেই পিটসবার্গে দুজন শেতাঙ্গ পুলিশকে গুলি করে মেরেছে সন্ত্রাসীরা। সন্দেহের তালিকায় কালো বা এশিয়রা। নিশাতের কালো গায়ের রঙ এই সাদার শহরে যেন আরও বেশি কালো হয়ে ওঠে। তার ভয় করে। কেবলি ভয় করে। শীতের তীব্র কনকনে বাতাস আরও ভয় ধরিয়ে দিতে থাকে। দরজা কিছুটা খোলা পেলেই ধেয়ে আসে।এ শহরের মানুষ বড়দিন কাটাতে ছুটিতে চলে গেছে। শীতের সাথে সাথে এক অদ্ভুত নির্জনতায় ডুবে রয়েছে আশপাশ। রাস্তার পাশে রাখা গাড়িগুলির উপর বরফের সাদা পুরো স্তর জমে আছে।নিশাত জানালার পর্দা তুলে দিয়ে দেখে এইসব। সকালে টমিকে দেখল বরফের ভিতর পা ডুবিয়ে খেলছে। ওর বৃদ্ধ মালিক হাঁপিয়ে উঠেছে টমির গলায় পড়ানো শিকলটিকে নিয়ে টমিকে সামলাতে। নিশাত এই সবই দেখছে, কিন্তু তার একবারও ইচ্ছে হচ্ছে না, এই সময় বৃদ্ধ মালিক বা অন্য কারো মুখোমুখি হতে। অবশ্য রাস্তায় তেমন লোকজনও নেই। এই পাহাড়ি রাস্তায় বরফের স্থাপত্য চেনা পরিবেশকে সম্পূর্ণই পাল্টে দিয়েছে।
নিশাতের খুব ইচ্ছে করছে এই সময় বাংলাদেশে এসে মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে। মায়ের হাতের শীতের পিঠা, ঝলমলে রোদ, ভাইবোনদের সাথে আড্ডা ! সবকিছুর জন্যই কেবলি মন টানে। ক্লান্ত, বিষন্ন লাগে! নিশাত ছুটির এই সময়টায় একটা ক্যাফেতে সপ্তাহে তিনদিন কাজ করে। ফয়সলও ওখানেই কাজ করত। এখন অবশ্য ফয়সলের বিষয়টা সম্পূর্ণই স্মৃতি বা সময়ের কিছু অপচয়। নিশাত অতীতের বিষয়টাকে আজ বিভ্রান্তিই ভাবে। ক্যাফেতে কাজের সময় জ্যাজ মিউজিক বাজতে থাকে। সেই বাজনার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে নিশাতের নিজস্ব বিলাপ। কফি সার্ভ করতে করতে সে তীব্র ভাবে অনুভব করে বেঁচে থাকার অর্থহীনতার মধ্যে এক অভিবাসী জীবনের রূপান্তরের কথা। কিন্তু কী করে আসবে সে! ছুটি কাটাবার টাকা নেই।একদিকে পড়ার চাপ, অন্যদিকে টিউশন ফির জোগাড়। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভিসা না পাওয়ার সমস্যা। আদৌ কী সে দেশে যেতে পারবে! পারলেও কত বছর পর! কেমন বিচ্ছিন্ন লাগে সবকিছূই।

তবু ফয়সলের ভাবনাটা মাথা থেকে বেরোতে চায় না। একই ভাষায় ,একই সংকেতে, দুটি একাকী জীবন, কী করে যেন ক্যাফে শপের বাজনার তালে মিলে গিয়েছিল একদিন। নিশাত বুঝতে পারেনি ,এ হল আগুনে জ্বলে যাবার আগে কিছুক্ষণের বিহ্বলতা। কী এক আবেশে সে হয়ে গিয়েছিল শ্যামাপোকারই মতো। তার গায়ের কালো রঙ ভালবাসায় সবুজ হয়ে উঠেছিল । আর শ্যামাপোকা হয়ে সে শুয়ে পড়েছিল ফয়সলের সবুজ চাদরে। সব সবুজ রঙগুলো একত্রিত গাঢ় সবুজ হয়ে এক মুহূর্তেই পরিবর্তিত হয়েছিল আগুনের রঙে। আগুনে পুড়ে গিয়েছিল তার ডানা। সব কিছু উজার করে দেবার পর আর কিছুই বাকি ছিল না।
এখন ফয়সল নেই । সত্যিই সে নেই ! কাজ ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছে। অন্য একজনকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছে আমেরিকাতে। নিশাতের কেবলি ভয় লাগে। তার কোথাও যাবার রাস্তা খোলা নেই। কেউ নেই । কোথাও কেউ নেই। কান্নাগুলোকে গিলে ফেলতে ফেলতে পার করতে চায় সে এই আতঙ্কিত সময়। ভুলে যাবার চেষ্টায় সে কেবলি ঘুরতে থাকে ক্রমাগত কাজের পৃথিবীতে। হেরে যাওয়া। সব জায়গাতেই শুধু হেরে যাওয়া! এখন পাল্টে যাচ্ছে আমেরিকার নিয়ম। গত পঞ্চাশ বছরে কালোদের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই শিল্পের নগর। এখন ওরা এই শহরের নোংরা আবর্জনা। পৃথিবীর সব নিয়মই কী পাল্টাচ্ছে! সবকিছুই হারাচ্ছে নিরাপত্তা। একগুয়ে প্রাণীরা এড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর ভারসাম্যের সকল চুক্তি! নিশাতের তীব্র ইচ্ছে করে ক্রীতদাসের জীবন ছেড়ে নিজের মাটিতে ফিরে আসতে। একেবারে মায়ের কোলে।
এক প্রবল নির্জনতায় একরুমের চিলেকোঠায় একা শুয়ে আছে নিশাত। ফ্রিজে কিছু খাবার আছে। আছে এক বোতল হোয়াইট ওয়াইন। এই দুদিন সে আর একবারও বাইরে যাবেনা বলে স্থির করেছে। গত কয়েক বছরের প্রচন্ড পরিশ্রম আর ক্লান্তি অবশ করে রেখেছে তার দেহমন। ভিতরে ছটফটানি আর অস্থিরতা। শেষ পর্যন্ত কোথায় স্থায়ী হতে পারবে সে? আসলেই কী শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া যায় ? কোথাও? চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে নিশাত। ঠান্ডা হয়ে আসছে শরীর। বাইরে ঠান্ডা কনকনে বাতাসের স্বর। বরফ ঝরছে ,সাদা সাদা বরফ। সাদা মানুষদের মতো। কঠিন বরফ। প্রথম প্রথম তার ভাল লাগত পেঁজা তুলার মতো গুড়া গুড়া তুষার কণা। এই নৈঃশব্দের ভিতর এখন সে অনুভব করছে তুষার গুলো ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে কঠিন বরফে। বরফের পাহাড় ঢেকে দিচ্ছে আলো আসার ক্ষুদ্রতম পথটুকুকেও। অন্ধকারে তার চেতনাগুলো হঠাৎ জেগে ওঠে । অস্পষ্টভাবে কোনো এক চেতনার ঢেউ চাঁদের আলোর মত উঁকি দেয়। কুয়াশা , সাদা বরফের অন্ধকার আর ঠান্ডায় জমে যাওয়া তীব্র কনকনে শীতের ভিতর মায়ের মুখ। যেন সেই অস্পষ্ট অবয়ব দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে। নিশাত অধীর হয়ে দেখছে সেই নিমগ্ন মুহূর্তটি। সবচেয়ে পবিত্রতম মুহূর্তটিকে হাত বাড়িয়ে অনুভব করতে চাইছে প্রবল ভাবে। ছোটবেলার মতো কানের কাছে শুনতে পাচ্ছে মায়ের বলা পান্তা বুড়ির গল্প। তার টানা চোখ, পবিত্র মুখ আর দুটো প্রসারিত হাত নিশাতকে ডাকছে । কেবলই ডাকছে । জীবনের আমন্ত্রণে।