মা সিরিজ অশ্রুকাণ্ড থেকে

গিরীশ গৈরিক




(প্রসবের বেদনায় ককিয়ে ওঠা মায়ের অশ্রু সিন্ধু
যেনবা হেমন্তের ঘাসে ঘাসে জমে থাকা শিশির বিন্দু।)

***
হেমন্তের সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখিজ্জ
মাকড়সার জালে ধরা পড়েছে ভোরের শিশিরবিন্দু,
এ যেন আমার মায়ের অশ্রুবিন্দুজ্জমাকড়সা জালে।

প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর মাঝে লুকিয়ে আছেজ্জএক একটি সূর্য
আমি এতগুলো সূর্যজ্জএকসঙ্গে কখনো দেখিনি।
অথচ হেমন্তের অশ্রুবিন্দু কেন যে বোঝে না?
যাকে সে বুকে ধারণ করেজ্জসেই তাকে শুষে নেবে।

হায় সূর্যজ্জযে তোমাকে বুকে ধারণ করে।
তুমি তাকেই শুষে নাও।

***
সূর্য নিবে গেলেজ্জ
পৃথিবীর সকলেই অন্ধ হয়ে যাবে
তাই সূর্যকে বলা হয় বোধের তৃতীয়চোখ।
এরূপ বোধের তৃতীয়চোখ আমার মায়ের আছে
তাই আমি অন্ধের সন্তানজ্জনাম আমার অন্ধকার।
কেউ কেউ আমাকে কবর বলে
যদিও আমার মা সোহাগ করে নাম দিয়েছে মৃত্যু।

আমি মারা গেলে অর্থাৎ মৃত্যু মারা গেলে
পৃথিবীর সকলেই পাবে বোধের তৃতীয়চোখ।
আর সূর্যের রঙ হবে অন্ধকার।

***
আমার মায়ের চোখে একটি রেলস্টেশন ঘুমিয়ে থাকে
মা। চোখ খুলে যে দিকে তাকায়জ্জরেলগাড়িগুলো সে দিকে ধাবিত হয়
আবার সন্ধ্যা হলে পাখির মতোজ্জমায়ের চক্ষুনীড়ে রেলগাড়িগুলো ফিরে আসে।

মা যখন কাঁদেজ্জতখন রেলগাড়িগুলো বন্যায় ডুবে যায়।
গতবছর তো মা আমার বর্ষার আকাশ হলো
আর রেলগাড়িগুলো অবিরত ডুবে যেতে লাগল
অথচজ্জআমি মায়ের একমাত্র হাবাগোবা রেলগাড়ি।

***
আমার ঠাকুরমা অশ্রুবন্ধ্যা ছিলেন
লোকমুখে জানা যায় তিনি তার স্বামীর মৃত্যুতেও কাঁদেননি।
যেদিন তার শতবছর পূর্ণ হবে
সেইদিনই তিনি ঘোষণা দিলেনজ্জস্বেচ্ছামৃত্ যু বরণ করবেন
এবং তিনি আমাকে দায়িত্ব দিলেনজ্জতার ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করতে।
এটা নাকি তার আজন্মের শখ
মৃত্যুর আগে তার নিজের কবর ও ডেথ সার্টিফিকেট দেখে যাওয়া।

তার স্বেচ্ছামৃত্যুর শয্যায়জ্জআমার মা যখন হাউমাউ করে কাঁদছিলেন
ঠাকুরমা তখন মাকে ডেকে জানালেন
তার অশ্রুবন্ধ্যার গোপন রহস্য।

অতঃপর আমি জেনেছিজ্জমায়ের অশ্রুলিপি থেকে
আসলে ঠাকুরমার কোনো অশ্রুগ্রন্থি ছিল না।

***
মায়ের চোখের জলের দাগ বড় হতে হতে
খাল হয়েজ্জনদী হয়েজ্জসমুদ্রে মিশে গেছে।
সেই থেকে চোখের জলে লবণাক্ত হলো সমুদ্রের জল।

এখন মা তার হৃদয়ের ক্ষততে বোরোলিন লাগায়
ক্ষত যতো পুরোনো হয় ব্যথা ততো দূরে সরে যায়।
এভাবে আমি অনন্তকাল অন্তরীণ হয়ে আছি
সমুদ্রের জল হয়ে, বোরোলিন হয়েজ্জমায়ের হৃদয়ে।

***
আমার কান্না বাঁধা পায় এমন দেয়াল কোথাও নেই
তাই আমি কান্নার প্রতিধ্বনির মতো মুক্ত
পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে আমি প্রথম কেঁদেছিলাম
আমার কান্নার শব্দ শুনেজ্জমা আনন্দে হেসে উঠেছিলো।
সেই থেকে আমি যতবার কাঁদিজ্জ
মানুষ ততোবার হাসে।
অথচজ্জমানুষ কেন জানে না?
আমার মা দুঃখের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত হয়ে হাসে।


***
মানুষের অন্তরের জ্বালা চোখের জল হয়ে বের হয়
এরূপ অসংখ্য অন্তরজ্বালা বুকের ভেতরে রেখেজ্জ
আমার মা হাসে।
মায়ের এই হাসি যেনজ্জশিশুদের মতো অশ্রুহীন একশদিন।
এভাবেই মায়ের বুকের ভেতর জন্ম হয় অগ্নিগর্ভ
তাইজ্জনারীরা ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়
তবুও বলে যায়জ্জভালোবাসার বাণী।


***
ভূমিকম্পে যেমন পৃথিবীর ঘুম ভাঙে
আমারও তেমনি করে ঘুম ভাঙে মায়ের কান্না শুনে।
নদীর ওপার থেকে ভেসে আসে মায়ের মরাকান্না
আমি এপারে নৌকা খুঁজি। অথচজ্জকোথাও কোনো নৌকা নেই।

ডুবসাঁতারে নদীর ওপারে গিয়ে শুনতে পাইজ্জ
আমি যেপার থেকে ফিরে এসেছি, মা সেপারে কাঁদছে।
আমি আবার এপারে ফিরে শুনতে পাইজ্জ
মা, ওপারে অবিরত শ্রাবণ মেঘের মতো কাঁদছে।

এভাবে আমি এপার থেকে ওপারেজ্জ
ওপার থেকে এপারে মায়ের মরাকান্না শুনি।

অবশেষে বাড়ি ফিরে দেখিজ্জমা আমার রক্তের ভেতর কাঁদছে
মা আমার কবিতার ভেতর কাঁদতে কাঁদতে বলে যাচ্ছেজ্জ
খোকা : বাতাসকে কান্নার শব্দে ভারী করতে নেই।

***
একফোঁটা চোখের জলেজ্জথাকে যতটুকু নুন
তারও অধিক থাকে ব্যথার আগুন।

শুনেছি ব্যথার আগুনজ্জপ্রসব বেদনা থেকে কম হলে
সন্তানের আঘাতে কাঁদে না মা, চোখের জলে।

তাই মায়ের চোখে কুলাদ্রির প্রেম প্রতিভাত হয়
মায়ের শরীরে মিশরীয় মমির খুশবু কথা কয়।

***
আমার মায়ের জীবন যেন কুমোরের তৈরি কাঁচা কলস
যে কলস বৃষ্টির আঘাতে আবার মাটি হয়ে যায়।
আমার মা ওই কলসে তার চোখের জল ধরে রাখে
আর আমাদের মনে যখন সুখের পিপাসা জাগে
আমরা তখন ওই কলসের জল পান করি
তাই আমাদের পিপাসা মেটাতেজ্জমাকে অনেক কাঁদাতে হয়।