শব্দের দিকে

নাহার মনিকা



এখানে নিশ্চল, নির্বান্ধব ভোরবেলায় কোন পাখপাখালির ডাক থাকে না।
গাঢ় অন্ধকার ফুড়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়া হাল্কা, একহারা আবছা আলোর ঘোর পেছনে ফেলে ছুটে যাওয়াই যেন এক ও অদ্বিতীয় অনিবার্যতা। তবু হঠাৎ হঠাৎ কিছু শব্দ উড়ে এসে নিজেদের পরস্পর জুড়ে দিয়ে একেকটা দৃশ্য তৈরী করে। তা দেখতে গিয়ে হালকা একটা চামড় দোলানো হাওয়ার মত ব্যথাবোধ ছোঁয় কি ছোঁয় না করে মিলিয়ে যায়! যেমন করে রোজ খবরের কাগজ পড়ি। প্রথম পাতা দ্রুত চোখ বুলিয়ে সম্পাদকীয় যদি আকর্ষণীয় কোন বিষয়ে থাকে তাহলে বিস্তারিত মনযোগ দিয়ে দেখি। তারপর পাতা উলটে গেলে সহসা কোন নিরারম্বর সংবাদে চোখ পড়ে যায়, চুম্বকের মত আটকে রাখে, তেমন কোন কোন ভোর পায়ের কাছে পোষ্য প্রাণীর সকালবেলা ঠেলে সরিয়ে আরো আগের, অনেক আগের কত শত সকালবেলা এনে ভীড় করায় চোখের সামনে।
হ্যা, দূর থেকে দেখি, বেশির ভাগ সময় ভীড়ের মধ্যেকার একজন হয়ে, কেন যেন মনে হয় কত কত অনাবিস্কৃত দৃশ্য আমার কাছে ধরা দেয়নি, একার চোখ দিয়ে যা খুঁজে পাবো বলে নিশ্চিন্তে জেনেছি তা হয়তো অন্য কোন দৃষ্টির জালে আটকে আছে।
অতিক্রান্ত ভোরের চড়া আলোয় যখন ঘাসের ডগায় শিশির শুকিয়ে যেতো, তখন একদল স্কুল ফেরত ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমিও থাকতাম, স্কুলের জামায়, চোখের তারায় তৃপ্তির স্বেদবিন্দু লেগে থাকতো। রাস্তার ধারে বেঁকে আসা হরিতকি গাছের ডালে কাঠঠোকরা পাখি ঝুপ করে বসে ঠোঁট ঠুকে গেলে সৃজন ছন্দে ডাল দুলিয়ে গেলে আমরা হৈ হৈ করা থামিয়ে বাতাসের সিড়িৎ সিড়িৎ ডাক শুনতাম। মনে দুঃখ পুষে রাখার বয়স না, তবু কখনো কখনো আমরা নিঃশব্দে সারিবদ্ধ পিপিলিকার মত হেঁটে গেছি। রেললাইনের পাথরে পা ঠুকে ছুড়ে দিলে লোহার বীমে ধাক্কা লেগে শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগে অনেকদূর যেতো। প্রভাত ফেরীতে কোরাসে গাওয়া গানটি আবারো মনে মাথায় গুনগুনিয়ে ঠোঁটের ভারে এসে নামতো। সেই কোন কাক ডাকা ভোরে কনকনে ঠান্ডায় পায়ের জুতো খুলে স্কুলের কাছের খালের ঢালে খুলে রেখে গিয়েছি, পায়ে জড়িয়ে গেছে ভেজা দূর্বাঘাস। তারপর ধীরে ধীরে শিশুর হাসির মত রোদ ছড়িয়ে সকাল ফুটেছে চারদিকে। পাড়ার মুখে বাড়িগুলোর দরজায় মানুষের মুখ প্রভাতফেরী ফেরত ছেলেমেয়েদের দেখেছে, গানের সুরে উদ্ভাসিত তাদের চোখ।
আমাদের গন্তব্য পাড়ার শেষ বাড়ি। পেছনের আকীর্ণ সরষে ক্ষেতের হলুদ ফুলের ঢেউ এসে বাড়িটার দরজায় হত্যে দিয়ে পড়ে। কাঠের গেটের ওপরে স্বর্ণলতা ঝুঁকে থাকে, খোলা গেটের ভেতর থেকে এক পশলা খুশী ঝিলিক দিয়ে বেরিয়ে আসে। বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে থাকে শিরি খালার বড় বোন, ততদিনে আমরা তাকে বড়’মা বলে ডাকি। বড়’মা আঁচল ভরে সবাইকে নিয়ে নেয়, আয় আয় তই তই তার ডাক। আমরা গুটিগুটি পায়ে তার চারপাশে মোড়ায় বসে পিঠেপুলির নাস্তা খাই, আর প্রভাতফেরীর গল্প বলি।
আগ্রহের আতিশয্যে বড়’মা সোজা হয়ে বসতে চায়, তার নিজের কথার ঝাঁপি খুলে যাবে এইবার। ঘর থেকে দুটো বালিশ এনে তাকে সোজা করে দিতে হয়। কিছুদিন হলো তার শরীরের বাঁ পাশ নিথর হয়ে আছে। অথচ যখন সে শরনার্থী হতে গিয়ে সাইকেল চালাতে শিখেছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় রাত্রিদিন না ঘুমিয়ে রীতিমত বাহাত্তর ঘণ্টা সেবিকা হিসেবে পরিশ্রমের রেকর্ড ছিল তার। তখন থেকেই তার কথার মধ্যে শব্দেরা এমন করে আসতো যেন শরৎকালের সন্ধ্যায় চাঁদের মেজাজ আস্তে আস্তে হাওয়ার আলাপে সঙ্গত করছে। তখনো বড়’মা ইঁদারার শীতল জলে গা ধুতে গিয়ে মাথা ঘুরে পরে যায়নি।
এসব গল্প অনেক আগে, আমাদের সঙ্গে চেনাজানা হবার আগের।
আমাদের পাড়ার দক্ষিণ কোনে একটা অপাংক্তেয় মাঠ। অনেকদিন সেখানে বড় বড় দুটো লোহার সিন্দুক পড়েছিল। সবাই বলতো যে মুক্তিযুদ্ধের সময় কেউ, কারো বাড়ি থেকে লুট করে এনেছিল।
কে লুট করেছিল, কার বাড়ি থেকে – কেউ এসব নাম ধাম বলতো না। সিন্দুক দুটোর ভেতর কি আছে, কে জানে, সম্ভবত এইসব নামধামও এর বিশাল কড়ার তালায় আটকে গেছে।
তবে আন্দাজে আমরা ভাবতাম যে, যে এনেছিল, তাদের ঘরবাড়ি ভাঙ্গা ছিল, হত দরিদ্র মানুষ এই বিশাল লোহার সিন্দুক, প্রথম কথা রাখবে কোথায়, দ্বিতীয় কথা – তারা এক ভেতরে রাখবে কি? ছেড়া কাঁথাবালিশ? তাহলে তো তালা ভাংতে হবে। তালা ভাঙ্গতে নিদেনপক্ষে একটা লোহার শাবল লাগে। লোকটা এত গাধা! শাবল লুট করার আগে সিন্দুক লুট করে বসেছিল!
আমরা সিন্দুক দুটোর ওপরে উঠে খেলতাম। ভারী আংটার সঙ্গে আটকে থাকা বন্ধ তালা ধরে দুলতে দুলতে এত বড় হয়ে গেলাম যে আংটাগুলি আমাদের কোমরের কাছে ঘুঞ্চির মত নেমে এলো।

ওই সময় শিরি খালা আসলো তার বোন দুলাভাইয়ের সঙ্গে।
শিরি খালার বোন, গায়ের রং শ্যামলা, বেশী সরলতা মাখানো মুখ। তিন
ছেলে, দুই মেয়ে। বয়স সবার পাঁচ থেকে সাত। ছোট দু’জন ছেলে, এক বয়েসী, লাউ
ফুলের মত নাদুস নুদুস। তিনজনের দু’জন রোগা আর হলুদাভ গাত্রবর্ণ। মেয়ে একটিই পথের পাঁচালি’র
দূর্গা’র মত ভারী মায়াময় আর দূরন্ত।
এই পাঁচজন শিশুর কথা তখন শহরের লোকের মুখে মুখে। না বললেও সবাই জেনে গেছে, এই পাঁচজনকে শিরি খালার বোন দুলাভাই কোন
এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়ে এসেছেন। একজন দু’জন না, একেবারে পাঁচজন! শিরি খালার দুলাভাই
কোন জাহাজে চাকরী করতেন। যুদ্ধের সময় দেশের বাইরে ছিলেন বলে দেশে ফিরে পিতৃমাতৃহীন শিশুদের
জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। তাই বলে একসঙ্গে পাঁচজন?
ধীরে ধীরে সবাই বুঝলো, ঐ বাড়ি আমাদের মত আরো পঁচিশজনকে ধারণ করতে পারে। শিরি খালার
বোন কী অনায়াসে আমাদের বড়’মা হয়ে যেতে পারে!

ওই বাড়িতে আশ্চর্য ব্যতিক্রম শিরি খালা। তার আঁচলের খুটে বাকদানের আংটির সঙ্গে বাঁধা থাকতো
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠির সঙ্গে বিয়ের দিনক্ষণ স্থির থাকা আর একটি চিঠি পাঠিয়ে তার যুদ্ধে চলে যাওয়ার
স্মৃতি।
সূর্য ডুবে যাওয়ার পরপর আবছায়া আলোতে সন্ধ্যামালতি ফুল যেমন উজ্জ্বল দেখায়, শিরি খালা তেমন।
তার ত্বকের আভায় ওদের বাড়িটা উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
হ্যা, ওই বাড়িটা, মাঠের অন্যদিকে। আরেক কোনায়। তাদের উঠোন পার হয়ে পেছনে কলতলা পার হলে
মাঠ। যেখানে আমাদের খেলার সিন্দুক।
আমরা যখন খেলতে আসি, তখন রোদ্রে ভাসা বিকেল। ফুটবলটাকে সূর্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ফেলে
জয়ী করে তুলতে চাই। বিকেল পরন্ত হলে আমরাও পরাস্ত ঘোড়ার মত সিন্দুকের দিকে হেটে আসি,
যেখানে শিরি খালা বসে থাকে।
আমাদের পা চলতে চায় কিন্তু তবু আমরা থেমে যাই। কারণ শিরি খালা মিটমিটিয়ে হাসে। তার লম্বা
কালো চুলের বেনী কাঁধের ওপর দিয়ে কোলের কাছে কুন্ডুলী পাকিয়ে থাকে।
শিরি খালা আমাদেরকে কখনো কাছে ডাকে না। অনতি দূর থেকে আমরা তার দুলতে থাকা পায়ের পাতা
আর ফরশা নখ দেখি। চোখের পাতার কাঁপন দেখতে পাই। খুব বেশীক্ষণ বসেও থাকে না।
হঠাৎ হঠাৎ শিরি খালাকে দেখলে ভয় ভয় লাগে। তার চোখের চাউনি বদল হয়, করুণা আর ঘৃণা দিয়ে ছেয়ে
থাকে তার চাউনি। আমরা এগিয়ে গেলেও সিন্দুকের কাছে ঘেষতে দেয় না। তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে বলে- ‘ কাছে ঘেষবে না, এ সিন্দুকের মধ্যে অনেক কাহিনী বন্দী আছে, কাছে এলে সেসব দৈত্য হইয়ে বের হয়ে পড়বে!’ শিরি খালার কণ্ঠস্বর সরীসৃপের দৌড়ের মত খসখসে।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে আরেকটা অবশ্যম্ভাবী দৃশ্যের কথা আমরা সবাই বলে দিতে পারি।
বারান্দায় বসে বড়’মা নিজের চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভুলে গিয়ে কাঁদছে। আমাদের পাড়ার মা –চাচীরা বিষাদমাখা অবয়বে শুনছে।
-‘ওই চুল আরো কাল হলো। লম্বা বেনী ট্রাকের চাকার সঙ্গে বেঁধে ওকে সারা শহর ঘুরিয়েছিল। শাড়ি শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছিল। আমরা প্রাণের ভয়ে বের হই নাই। আমার বোনটা পাকিস্তানীদের কাছে মুক্তিবাহিনীর কোন খবর শেষ পর্যন্ত দেয় নাই। এমনকি তিন বছর যখন প্রায় উন্মাদ ছিল, তখনো একটা বেফাঁস কথা উচ্চারণ করে নাই’।
এত দূরদেশে চলে এসেছি, সে জন্য কি? মনে হয় গল্পগুলো একটা পাতলা সরপড়া অন্ধকারের আস্তর সরিয়ে মঞ্চে আবির্ভূত হচ্ছে, এককাট্টা অথচ হালকা বুনন। সেখানে মানুষের কথা যেমন থাকে, থাকে একটা ডাহুক পাখি, যেটা বড়’মা’র মেঝো ভাই বিলের কিনারে শিকার করে মায়ায় পড়ে গিয়ে বাটা হলুদে ডানা মুড়িয়ে সুস্থ্য করে তুলে আর ছেড়ে দেয়নি, কিংবা ছেড়ে দিলেও পাখিটা তাকে ছেড়ে যায়নি। দিনে দিনে বেহায়া প্রেমিকের মত ঘরের কার্ণিশে ঘুর ঘুর করেছে, যদি মেঝোভাই দানা ছড়ায় আর সে খুটে খুটে খায়! মেঝোভাই কলেজে পড়তে পড়তে, কবিতার খাতায় হাতের লেখা মকশো করতে করতে বিছানায় এলোমেলো ফেলে রেখে যুদ্ধে চলে গেল। আর ফিরে আসেনি, তার কবিতার খাতা রয়ে গেছে, তার কথা আর শব্দেরা আছে। সে গল্প থেকে পাতার পিঠে বানানোর গল্পে কেমন অবলীলায় চলে যায় বড়’মা। তার শব্দের মধ্যে শব্দবন্ধ পাথরের মালার মত গেঁথে ওঠে, দামী পাথরের মধ্যে মধ্যে ছোট অনারম্বর পুতি দিয়ে কারুকাজময়।
পাতার পিঠে বানানো হতো চালের গুড়ির লেই পাতার শিরায় শিরায় আল্পনা এঁকে। এন্তার পিঠে বানিয়ে ঘরের মধ্যে স্তুপ করা হচ্ছিল, বিয়ে উপলক্ষে। ততদিনে বিয়ে হয়ে যেতে পারতো শিরি খালার। শুধু তার সহপাঠীর ফিরে আসার সংবাদ আর চিঠি চিরকুটের নিদারুণ প্রতীক্ষায় সময় অতিধীরে বয়ে গেছে। পার হয়ে গেছে অনির্দ্দিষ্ট কালের চেয়েও দীর্ঘ সময়।
শিরি খালার গল্পের অস্তিত্ব, দ্রোহ, যাতনা আর প্রেম যন্ত্রণাবাহী হয়ে গড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রতিটি
শব্দ তারপর ভ্রমণ করে, এক থেকে শতেক, থেকে রাশি রাশি হয়ে মুখের কথা হয়ে চিরকালের চক্রে চড়ে
বসে। আমাকে সেই ছেলেমেয়ের দঙ্গল থেকে আলাদা করে বিশাল মাঠের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে
প্রায়ই সে গল্পের শব্দরাজি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। কিছু জবানবন্দীর দৃশ্যপট তৈরী করে।
আর আমি জানি যে এ দৃশ্য তৈরীতে বড়’মার মুখ থেকে শোনা শব্দ, কথা আর আখ্যান গুলোই সত্যি।