আম্মা

আহমদ সায়েম




জীবনের প্রথম যার সাথে প্রেম করা হয় তার নাম ‘মা’। যার সাথে প্রেম করা হয় বা প্রেমে থাকতে ইচ্ছে হয়, তার সাথে কোনো ধরনের আড়াল চলে না। মায়ের সাথে কত রকমের যে স্মৃতি থাকে তা আর বলে শেষ করার নয়। পৃথিবী জুড়ে যত আবেগ-আকুলতা বা নিবিড় যে টান আমরা ফিল করি—কোনো বিতর্ক ছাড়া একটাই উত্তর ‘মা’। যে-মানুষটার মা নেই আমার চেয়ে সেই ভালো বলতে পারবে, মায়ের না-থাকায় কত কী এসে যায়।
সহজে পাওয়া জিনিশকে আমরা গুরুত্ব দেই না, মাকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আমরা চালু করেছি ‘বিশ্ব মা দিবস’। এতে করে মায়ের ঋণ কী কিছুটা মিটল? মনে হয় না। অন্যভাবে বলি—আমরা আমাদের মালামালসমূহের বিজ্ঞাপন দেই, আবার সব মালের দেই না, যেসব মাল বাজারে চলে কম তার বিজ্ঞাপনটাই রেডি করি, রাস্তা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম রাখি কোনো ব্যক্তির নামে, কারণ মানুষটার সাথে মানুষের প্রয়োজন না পড়লে তার নাম নেয়ার কোনো কারণ থাকে না, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে ‘আমার’ নামটা যদি মানুষ নেয়—যেমন : শাহজালাল বিমানবন্দর বা নজরুল অডিটোরিয়াম ... ওহহো কী শান্তি! এবার আমরা আমাদের নিজেকে একবার প্রশ্ন করি—মায়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কোথায় আছে? মাকে ভালোবাসা-শ্রদ্ধা জানাতে আমাদের দিবসের প্রয়োজন পড়ে কেনও!? হ্যাঁ, কেউ অবশ্যই বলবেন—ভাই আপনি তো বিষয়টাকে একেবারে উল্টে ধরেছেন। হতে পারে, এভাবে ভাবতে চাই না কিন্তু মেনেও তো নিতে পারছি না। আমি আমার বউকে ‘আই লাভ ইউ’বলে ভালোবাসা জানাইনি। আমার মনে হয় উনার জন্য তা কম হয়ে যায়। আবার এর বেশি কিছুও আমার জানা নেই, তাই চ্যাঁচামেচি করেই কাটিয়ে দিয়েছি অনেক বছর।
এবার আমার প্রেমিকার একদিনের একটা দৃশ্যের কথা এখানে টানি। খুব বেশি দূরে না গিয়ে গতকালের একটা দৃশ্যের কথা বলি। রাতে বাসায় ফিরতে খুব একটা দেরি করি না, যদি কোনো কারণে দেরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ফোনে মাকে জানিয়ে রাখি। কিন্তু গতকাল একটা জরুরি কাজে ঘরে ফেরার সময়ই বের হতে হয়, রাত দশটা নাগাদ বেরে হব। যাওয়ার সময় ঘরে বলে যাই যে আজ ফিরতে বেশ রাত হবে। মা এই সময়ে বের হতেই মানা করলেন। কিন্তু কাজের ধারাভাষ্য পেশ করলে পরে বাইরে যাবার অনুমতিটা আর আটকে রাখতে পারলেন না। বের হলাম কাজের লেজ ধরে-ধরে। কাজের ইতি টানতে অবশ্য খুব একটা সময় খরচ হয়নি। বাসার গেইটে যখন পা রাখি ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা।
দরজার চাবিটা সাথে নিয়ে যাওয়ায় খুব আস্তে-আস্তে দরজা খুলছি; কারণ এই সময়ে আম্মা-আব্বা দুজনেই ঘুমিয়ে গেছেন। ঘরে অল্প আলোর একটা লাইট জ্বলতেছে, বউ-বাচ্চা ওরাও ঘুমিয়ে গেছে। আস্তে করে দরজা বন্ধ করে রুমের দিকে এগোই...কিন্তু হঠাৎ আঁতকে উঠি, একটা গোঙানির শব্দ কানে আসে, হ্যাঁ, মায়ের গলার শব্দ। মা ডাইনিং রুমের চেয়ারে বসে বলতেছেন, “সায়েম নি রে, আইছতনি?” “অয় আম্মা, তুমি ঘুমাইছ না?” “ওউ ত এখন ঘুমাইযিমু” বলে মা উনার রুমে চলে গেলেন। এবার বলুন, উনাকে ভালোবাসা দেয়ার জন্য বা ভাবার জন্য আমাকে দিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? দিবস-টিবস এইসব গরিবের জন্য। ভালোবাসাদারিদ্র্যে ভোগা হতচ্ছাড়াদের জন্য। যাদের কম থাকে তারা দিবসেই জানায়, আর ভাবে। দিবসটাকে সামনে এনে মাকে আমরা কী ছোট করছি না?! জানি না। হতে পারে আমি উল্টো করে দেখছি, আবার তাও মানি যে আমার মতো অন্য-একজন ভাববে কেন? আমর মতো করেই যদি সবাইকে ভাবতে হয় তবে— টক-ঝাল-মিষ্টির রকমফেরের তো কোনো প্রয়োজনই নেই।
শব্দহীনতার মধ্যেই প্রেম। আর প্রেমের অন্য অর্থ ‘মা’।