ওমরসের খোঁজে...

অনিন্দ্য বর্মন




২০১৭। সান ফ্রান্সিস্কোর সেমিনারে হঠাৎ বইটা দেখে চমকে উঠল রোদ্দুর। ‘অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’। লেখক রাত্রি দাশগুপ্ত। মা!
এই বইটা রোদ্দুর আগে পড়েনি। মা আত্মচরিত লিখেছিল, এটাই তার অজানা। সেইদিন রাত্রে বইটা পড়তে গিয়ে একটা বিশেষ পাতায় চোখ নিবদ্ধ হল।

আকাশ
সেদিনের আকাশ কালচে মাঠ পেরিয়ে নেমে এল বাবার ব্যালকনিতে। পুড়ন্ত সিগারেটের শেষ রঙটুকু আঙুলে মেখে নেওয়ার স্বগতোক্তি জুড়ে ছিল একটা খালি বিছানা, ইতস্তত ছড়ানো সাদা ফুলের পাঁপড়ি এবং সামান্য ধূপের গন্ধ।
আমি তখন মায়ের গলা জড়িয়ে...
বাবার মনে আঁচড় কেটে চলেছে অমাবস্যার খোলা আকাশ।

নদী
আজ সরস্বতী পুজো। বাবাকে গঙ্গামাটি আনতে হবে। সাত-সকালেই বাইকের সামনে আমাকে বসিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।
ঠাম্মার বয়স হলেও বাণীবন্দনায় ছেদ পড়ত না। বাবা-মায়ের চাকরি, আমার ইস্কুল জুড়েই তাঁর স্বপ্নচয়ন। বাবা গঙ্গামাটি আর ফুল নিয়ে আসবে। মায়ের পুজো হবে।
গঙ্গায় নেমে গঙ্গাজল আর মাটি নিয়ে ফিরে আসার সময় কী বাবা ভেবেছিল, একদিন মা গঁঙ্গাই তাকে নিঃস্ব করে দেবে?

মাটি
আমার ইস্কুল পোষাকে মাটির দাগ। ঈশানীর সাথে টিফিনের সময় হুল্লোড়ের ফল।
মায়ের বকুনি আর ঠাম্মার আগলানোর মাঝে বেড়ে উঠছি আমি।
দৈনন্দিন শেষ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে দিতে দিতে বাবা হয়ত মনে মনে প্রার্থনা করত—আমার মেয়েবেলা যেন তার মতো অভিশপ্ত না হয়ে ওঠে।

সেতু
জীবনস্যার ভৌতবিজ্ঞান পড়াতেন। তখন বাবার ক্লাস এইট। ওই বয়সে বাবা বুঝে ফেলেছিল সে একজন পাইভট যা দাদু-ঠাম্মাকে সংযুক্ত করে রেখেছে। বাবা না থাকলে দু’টি বলয় নির্দিষ্ট কক্ষপথে ছিটকে যেত।
অথবা, দাদু মারা যাওয়ার পর বাবা বুঝেছিল ঠাম্মা প্রায়ই শেষদিনগুলোয় দাদুর কাছে গিয়ে থাকত। ছেলে বাইরে চাকরি করার বিরাট সুবিধে।
আমাকে ফিজিক্স পড়াতে গিয়ে বাবা উপলব্ধি করে যে সে ছিল পাইভট আর মা ছিল সেতু।

আলো
একটা বোধের জন্ম হয়েছিল ঠাম্মার কোলে।
- তোর মাকে আপন করে নিতে পারলে তবেই সে তোর মা। রাইমা তোর মা। এই দেশ তোর মা। এই বাংলা, এই গঙ্গা, এই দুর্গা, এই সরস্বতী তোর মা। আর রাতুল তোর বাবা।
মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
- (শুধুই নিস্তব্ধতা ছিল মায়ের বুক জুড়ে)...
শুধু আমাকে ঘুম পাড়িয়ে একবার হয়ত অস্ফুটে বলে উঠেছিল — শুভ জন্মদিন মা! — আর সারারাত মায়ের চোখের জল মুছে দিয়েছিল বাবা।
দেশভাগ এক অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছিল মায়ের বুকে।

স্নিগ্ধ চশমা
‘একজন মা ভিজে বিছানায় শুতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবেন, ততক্ষন, যতক্ষন তিনি জানেন তাঁর সন্তান শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।’ কথাটা বলার সময় গান্ধীজি কী জানতেন তাঁর কপালে দেশভাগের অভিশাপ লেখা আছে?