এই আমিত্বের উৎসে ভরা জোয়ার ----মা, মা, মা

তানিয়া চক্রবর্তী



গঠনে,তালিমে যে ধার্য করেছে আমায় তাঁর পূর্ববর্তী ঘোমটা লাগা মুখ দেখছি , একটি আলো মূলক প্রতিমা, যে আগমনী না গাইলে আমি আসতাম না!সদ্য বিবাহমাখা মুখ আমি তুলে আনলাম পুরোনো অ্যালবাম থেকে। এহেন ধারালো মুখ আমি বেদীতে বসাইনি, কিচ্ছু করিনি, শুধু গালে গাল রেখে , হাতে হাত রেখে বুঝেছি, ভালবাসা কেবল এখানেই তৃপ্তির পরও মরে না। আর জাদুকরের গল্প, ভবিষ্যতবক্তার শব্দ সব এই নারীর মুখে এসে মিলে যাচ্ছে। তাঁর নাভিরজ্জু থেকে আমি ছিন্ন হয়েছি শুধু। দশমাসের আস্তানার অভ্যাস আমার চেয়ে তাঁর বেশী। সক্রেটিস যেমন মৃত্যুর আগে অবধি তার অনুচরদের বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিলেন এই দেহ “ অংশত আত্মা ও অংশত দেহ” আর মৃত্যু কোনো অন্তিম দুর্ভাগ্য নয় তেমন এই মা জাতি আমাদের বিশ্বাসের প্রশ্রয় দিয়ে এরা সহ্যের দ্রাঘিমাহীন। “দৃশ্যকে বোঝা একটি জেতা আর অদৃশ্যকে বোঝা প্রজ্ঞা” সেই অদৃশ্য প্রসবযন্ত্রণা যার কোনো উৎস নির্ণয় নেই শুধু বিস্তৃত এক অদৃশ্য ব্যথা যা সৃষ্টিকারী আমি তথা সন্তান অপাঙ্গ অবধি জল এনে তার সবটুকু শুষে আকৃতি নিলাম পার্থিব স্বীকৃতির । আর সে আমায় কপালে চুম্বন করে কোলে, বুকে আঁকড়ে নিল। সে আমার শোষণকে প্রশ্রয় দিল। আঃ এ মা --- আঃ এ মাটি মা --- তার গা ঘেঁষে ঘেঁষে রাস্তা, ভারী বাড়ি, গাড়ি --- সে ভার নিচ্ছে চুপচাপ--- মাঝে মাঝে শুধু কেঁপে উঠছে ---“মা” এই ডাক আর কাউকে দিতে নেই--- আমি দেব না মা --- মা একক --- এ কেবল একটিমাত্র শব্দ যার ধার পৃথিবীর কোনো বিকল্পের কাছে নেই । হ্যাঁ এই ঘোমটাজড়িত সিঁদুর মাখা মুখ আমি আধুনিকতার রং চড়িয়ে দেখছি --- দেখছি আবছা হচ্ছে আমার মাধ্যম। এ এক দীর্ঘ পুরোনো খেলা, বিজ্ঞান আর বাস্তব বলে আমি তোমাদের বিবাহ দেখিনি, কিন্তু মা বিশ্বাস করো আমি অণুসরণ করেছি তোমাদের, আমি আসব বলে তোমরা এসে গেলে সেতুতে প্রকৃত ভালবাসার আচরণে। ভালবাসা আসলে প্রার্থনা, তাই তো তুমি খাটের পাশ থেকে উঠে গেলে সেই অদৃশ্য টানে টান পড়ত, আমি জেগে উঠতাম। এখন আমার রক্তচাপজনিত কারণ উচ্চ, ভাবি তুমি তো আছোই, তুমি তো থাকবেই, তোমায় নিয়ে কী কিচ্ছু লেখা যায় মা! আমি নির্বোধের মতো তোমায় আঁকছি পৃষ্ঠায়! তুমি এতো বিস্তৃত, তুমি এত ব্যাপক যে তোমাকে আঁকা এক বোকা বাচ্চার খেলা! তুমি বারান্দার নরম হাওয়া, তুমি আছো আর থাকবে বলেই আমি এত নিশ্চিন্ত! কিন্তু যখন আমার স্নায়ুমূলে বার্ধ্যকের ডাক আসবে যখন বসন্ত আমার মজ্জাকে হাসাবে তখন যদি তুমি না থাকো! ভাবতেই পারি না! তুমি অপরিহার্য বলে আমার জলটা, খাবারটা, কান্নাটা তোমার অবয়বে মিশে যায়। তোমাতে একীভূত বলেই একা হয়নি এখনো! তাই তো মা শব্দের এত দীর্ঘ টান! তাই বুঝি আনন্দে, কষ্টে স্বতঃপ্রণোদিত মুখে চলে আসো “মা” !আমার ফোনে সবচেয়ে বেশী তুমি আসা যাওয়া করো, আমার যান্ত্রিকতায় তুমি বাতাসের হাওয়া লাগিয়ে দাও। কত ঝগড়া করি, কত বকি, কত দ্বিমত অথচ কী এক! তুমি আমার কান্না হয়ে ওঠো আমার অশ্রু তোমার চোখে ভেসে ওঠে আমার হাসি তোমার হয়ে যায়। তোমার মতো সুন্দর আমি কাউকে দেখি নি আর কখনো দেখব না। তুমি এত আমার মা, তোমার কথা বলতে গিয়ে আমার লজ্জা হয় ভীষণ ! আমার নিয়ে তো আমিত্ব করে মূর্খরা! মূর্খই সই!
আসলে পৃথিবীর গন্ধ শুঁকে শুঁকে বুঝে গেছি ভালবাসার আসল আস্তানা তুমি ভিন্ন কোথাও নেই। এ আপেক্ষিক সৌন্দর্যের পৃথিবীতে তুমি এক দীর্ঘ নকশা করা ফুল যা আমায় গর্ভপুষ্প থেকে গাছ হওয়ার প্রবণতা দেয়। আমার এ অস্তিত্ব এর প্রতিষ্ঠা হোক বা না হোক আমি এক স্বচ্ছল রূপের সন্তান ভাবতে ভাবতে চোখ বুজে আসে, আমার চোখ যা সবাই বলে অনেকটা তোমার মতো মেলে --- মিলুক মা --- তোমার সব আমাতে মিলে যাক --- তোমার পাওয়া- না পাওয়ারা আমার ভেতরে প্রস্ফুটিত হোক। তুমি তো আমি আর আমি তো তুমি।বিংশ শতাব্দী প্রথম এই মাকে নিয়ে দিন বার করেছিল, মায়ের দিন! সংস্কৃত তোমার ডাকের রূপক এনেছিল প্রথম! অথচ পৃথিবীতে সবকটা দিন তোমার,কারণ তুমি উৎসমূল। একমাত্র তুমি পৃথিবীর সব দিন নিতে পারো মা আর পৃথিবীর সব ডাক! হ্যাঁ এখন এ পূর্ণযুবতী দেহ তোমাকে ডাকে , তোমার গর্ভ পেতে চায় এর মতো নিরাপদ ঘর আর কোথাও নেই যে!তুমি বারে বারে আমায় জন্ম দিও ম...
প্রাচীন নাভিশ্বাসকে ধামসা-মাদলের সুর শেখাচ্ছি
আসলে বলয়ে বলয়ে অতিরিক্ত চেনার খেলা
চিহ্নিত হওয়ার আগে টালমাটাল
টালমাটাল হওয়ার আগে চিহ্নিত
#
পূর্বরাগ ও পূর্বরাগ
তুমি বাকল চেনো গাছের
পাহাড়ে পাহাড়ে বাকল দেখেছ
দেখেছ, পাহাড়ের ফাটল ও বাকলের বন্ধুতা
এই গল্পে অপলক শিশু
স্তন অভিমুখে পান শিখছে
এক হাতে পায়ের বুড়ো আঙুল
কচি, বিশুদ্ধ চোখ বাতাসকে প্রশ্ন করে
শোষণ, শোষণ কী?
ও গালা ভরা বালা আর কানপাশা
মুদ্রামাফিক স্থূল হচ্ছ কেন?
হালকা সোনা ধোয়া রঙে তুমি বলয়ের মতো
হে কমলালেবুর কোয়া,
তোমার আবেষ্টনে পৃথিবীর গোলক খিদে ভুলেছি
তাই অক্ষরেখা আমায় ঠেলে ফেল দিল গর্ভে
এখন গর্ভে আমি নির্ধারিত হচ্ছি
মায়ের পেটে কান দিয়ে শুনতে পাচ্ছি
বাইরের পৃথিবীতে নারীবৃক্ষের গল্প
আমার ভয় করছে, জন্মের ভয়
একটু পরেই আমার জন্ম হবে
ভয় বলতে ক্রমশ লালচে আপেল পর্বে
---ধুকপুক, ধুকপুক
আমার লালিত দিন লালনের উপযোগী হবে
আমাকে কে যেন ঠেলে বার করে দেবে
এ গালা ভরা সোনার উঠোনে!
সুবর্ণরেখার শুকিয়ে যাওয়ার পর
আমার জন্ম হবে
কি কান্না, কি উলু, কি আনন্দ!
আঃ কোনো আনন্দ নয়
হ্যাঁ, আনন্দ তো বটেই
এখানে টান ও টানচোর
আমায় জ্যান্ত বার করে দিল ভূ-ত্বকে
আমি, আমি, আমি গর্ভজাত, রক্তজাত
নাভিকুর্ণিশ গর্ভশিশু, গায়ে বড় কান্নার দাগ
অন্ধগুহার থেকে আলো লালিমায়
এত চোখ ব্যথা করে
যে রাত্রিকালীন এ পূর্ণযুবতী দেহ
মাতৃগর্ভের দশমাস বিরতি চায়--- ভ্রূণবিরতি
অসময়ের বৃষ্টির মতো
গাঢ়, গ্রাহ্য প্রাণ নারকীয় ঘরানার
নিক্কণ ভুলে ঘুম চায়
দৈত্যঘুম, নেশাঘুম, ভ্রূণঘুম
ঘুম স্থানীয় ওম থেকে জন্ম সন্ধির
ত্রাতার হাতে আমার হাত
হাতের শেকড়ে আয়ুগল্প
তাকে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে লাল করি
এ ভ্রূণপর্ব সবচেয়ে শ্লীল ও সুখী
এখানে রক্তচাপ জন্মকালীন
প্রবাহ করে নিজস্ব আহ্লাদে,
এ দেহ থেকে খুলে যাচ্ছে জ্বালিকারসের রাগ
দেহ থেকে খুলে খুলে পড়ছে
তন্ত্র, অঙ্গ, কলা, কোষ
কী হালকা এ ঝুমুর শরীর!
ক্রমশ জরায়ুফুলে লেপটে লেপটে যাচ্ছি
গাত্রে কত গুচ্ছমূল, রসে ভরিয়ে দিচ্ছে
আঃ এ মাটিগর্ভ, অন্তস্থ মা
বিচ্যুত স্মৃতি খসে গেল
ভ্রূণজদেহে শুধু জন্মের ডাক
শুধু জন্মের ডাক
---কী আশ্চর্য ঘুম
কী আশ্চর্য ঘুম!