ভাষানো মা

বেবী সাউ




এক .


এইসব লাগা না লাগা নিয়ে কখনোই পাল্টে যাওয়া দেখিনি মায়ের । চুপচাপ আর চুপচাপ । ছোট্ট গ্রাম আমাদের । মাঠভর্তি রবিশস্য । পুবের সূর্য ঢেলে দিচ্ছে কলসী ভর্তি আলোর দরজা । চাঁদ মায়া ছড়িয়ে রেখেছে ছাদময় । নদী নেই । ধূধূ বিস্তারিত সংসার শিখছেন মা ।শরীরে আবহমানের সুখ। এক আশ্চর্য ব্যাপার নিয়ে ওইসব আমার না- জন্মানো কালটা কে খুঁজে ফিরি । একা একা ওইসব নির্জণ দুপুর , মা আর আমি , আমি আর মা এক শরীর একাত্মা হয়ে চোখ তুলি মেঘের দিকে --- রোদের দিকে । একাকীত্ব ভরে কখনও কখনও নাইতে যাই পৃথিবীর নির্জণতম ঘাটে । ভাবি , পৃথিবী কারো নয় । নিজস্ব কোন অনুধাবন নেই তার। এই সমাযোজন প্রক্রিয়া বুঝতে বুঝতে কলেজ ক্যাম্পাসের বি. এড ক্লাস বেজে ওঠে । মনোবিজ্ঞান আসলে মনকে কেটেছেঁটে দুটুকরো করার প্রণালী । রক্ত সেখানে ছাপার কালি । জন্মদিনের সুদৃশ্য রঙ ।তখন আধুনিকতার মোড়ক মুড়ে উন্মোচন হয় ভাষার সাথে এডজাস্ট । মানিয়ে নেওয়ার হিউলেশন । সুর্বণরেখার জলে মায়ের শাঁখা বাজে ধীরে - সিঁদুর বাজে । আমার মেয়েজন্ম তখন --
" জলকে আজকাল মায়ের মত
লাগে
আধারহীন, আকৃতিহীন " (কাব্যগ্রন্থ- - বনঘাঘরা , বেবী সাউ)

দুই .

যে রেখা আমি চিনি না , যেখানকার দিগন্তে আমার রাজপুত্রের পক্ষীরাজ ভাসে না -- এই সীমানা কখনো আমার না । দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে শুধু দৈনন্দিন উচ্চারণ , মৃদুমন্দের ব্যর্থতা আর কিছু নিঃসঙ্গতার দেওয়াল ডিঙিয়ে এইসব চিরসত্য দেখি কেমন অলীকে পরিণত হয় । আমি তখন ক্লাস এইট । আমি তখন কৃষ্ণচূড়া চিনি । তখন আমি প্রথম পিরিয়ড । লাল দাগে মানিয়ে নিতে নিতে মায়ের আগলে রাখা শিখছি । বিছানার চাদর ভর্তি শুকনো রঙ সামলাতে সামলাতে শুনছি একুশের মিছিল । ফাগুন জুড়ে ফ্রেবুয়ারি তখন । ফাগুন তখন স্কুলের পোস্টার । মায়ের আলতা শিশি থেকে রঙ চুরি করছি । পোস্টারে আঁকছি রফিক সালাম বরকত এর নাম । পোস্টার এত লাল কেন ? অক্ষরে অক্ষরে রক্ত কেন !
আরও আরও শব্দহীন হোক এই উচ্চারণ । আরও বিস্তারিত হোক এই লালের ফসিল । আরও কেঁদে উঠুক শহীদ মিনার, আসামের খানাখন্দ । পাহাড়ের গোপন হোলিখেলা । বুক জুড়ে তখন রক্ত বমি । অ্যামেনিমা র ট্যাবলেট খেতে খেতে রক্ত সংগ্রাহকের ভূমিকা যখন আমার হঠাৎই দেখি চোখে কেমন হলুদ সর্ষের ক্ষেত পেতে বসে আছেন মা । কপালে টগবগে সূর্য বাবার জন্য , দশআঙুলের রেখায় সন্তানের বরাভয় পুষতে পুষতে আমার মায়ের চোখ চুরি করে নিয়েছে সেই মাইথোলজির রাক্ষসী । বেদজ্ঞ পুরুষ শক্তি বলেছে যাকে । পুজো আসলে শত্রুকে ঈশ্বর সাজানোর এক নিপুণ কৌশল ।
দেখি একদিন -- এইসব রক্তবমি সেরে আমিও কেমন মায়ের কাছে ভীড়ে গেছি । মা আর আমি তখন সমবয়সী । কোন দেশ নেই , কাল নেই , ধর্ম নেই , লিঙ্গ নেই । শুধু সন্তান আর মা । মা আর সন্তান ।

তিন .

জীবনের পর্ব জুড়ে শুধু কুহকের টান । শুধু রঙ রঙ খেলা । এইসব রঙের জাদুঘরে মা চিরকালীন এক আশ্রয়- -- ছায়াময় আশ্রম । প্রতিদিনের জমানো আত্মহত্যাগুলোকে এনে ছড়াই মায়ের আঁচলে । আদরে যত্নে মা বের করে আনেন পুরোনো প্যাটরা , আলমারীর দেরাজ । এত জমানো কষ্ট নিয়ে মা আমার ঈশ্বরী হয়ে উঠেন । হাতে বরাভয় , বামহাতে সন্তানের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলেন --- "বাছা আমার কতদিন কাঙালের মতো বাড়ি বাড়ি ফিরেছে ! "

চার .


কাল অঝোরে কেঁদেছে আমাদের ভালো কথা

কিন্তু ,
ঈশ্বরের মন খুশী ছিল খুব
চিলেকোঠা ঘরে লুকিয়ে থাকা শৈশব
তুলে এনে নিজেকে রাজা ভেবে বসেছে

শৈশবের হাত ধরে দরজায় ঢুকছে আনন্দ
আনন্দের সাথে হারানো ভাষা , যে ভাষায় আমরা মাকে চিনেছি প্রথম

উপায় না পেয়ে ঈশ্বরের পিছন পিছন ঘুরছি আমিও

এতদিন পরে মা আলতা পায়ে পায়েস রান্না করছেন

ঈশ্বর আর আমি উনুনের পাশে বসে ঝিমোচ্ছি

ভাষা লিখছি