মাঃ প্রিয়তায়, মুগ্ধতায়

বৃতি হক




প্রিয় মা,
বসার ঘরের ধুলো ঝাড়তে গিয়ে একদিন সুদৃশ্য বেলজিয়ান ফুলদানীটা ভেঙে গেলো বলে খুব মন খারাপ করেছিলে। বলেছিলে, কোন কিছু ভেঙে গেলে জোড়া লাগানো কঠিন। মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে নীলচে ধূসর ছাদের দিকে তাকিয়ে মনে পড়লো সেকথা। আমার ঘুমহীন ক্লান্ত চোখ। বহুকাল নিদ্রিত তুমি, পৃথিবীর সুদূরতম শহরে ঘুমাচ্ছো, একা। ঘুম ভাঙার অবকাশ নেই আর। ভোরের আলো চোখে মেখে পাশ ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে না কখনো, “আমার মামনি” বলে জড়িয়ে ধরবে না। অনেকদিন তোমার সাথে কথা বলাও হয় না।
আব্বু একবার চট্টগ্রাম যাচ্ছিল ট্যুরে, সেজ খালাকে চিঠি না লিখে কিছু কথা সিডিতে তুমি রেকর্ড করলে তখন। অনেক লম্বা কথা-চিঠি। সেই কথা-চিঠি হাত ঘুরে এখন আমার কাছে, মাঝেমাঝে কখনো শুনি। কাজের ফাঁকে, গান শোনার অবসরে। গর্ভে থাকাবস্থায় শিশু নাকি তার মা’র কন্ঠস্বর শুনে আত্মস্থ করে, অভ্যস্ত হয়ে যায় মা’র সুর ও ভাষার অনন্যতায়। মাতৃভাষা তাই জন্মপূর্ব স্মৃতিতে গাঁথা। পৃথিবীতে পদার্পণ করে চোখ না মেলেই সে ভাষার কারণে মা’কে চিনে ফেলে শিশু, তার কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। চোখ মেলে প্রিয় মুখটিকে দেখে অবশেষে, কোমল সুরে একদিন মা ডাকে। মস্তিষ্কে আমার আজীবন বয়ে নিচ্ছি তোমার সেই সুর, মা, সেই কন্ঠ। অ আ ক খ—তোমার সাথে হাত মিলিয়ে পেন্সিলে আঁকা কাগজের ওপর প্রথম যে ছবি আর বর্ণের ছাপচিত্র, প্রোত্থিত হয়ে গেছে নিউরণে তাও, নিজের অজান্তেই। তুচ্ছ মানুষ ইতিহাসে যুদ্ধ আর বিগ্রহের কথা সগৌরবে লিখে রেখেছে, লিখে রাখেনি মা আর এক খুকুর বিজয়কাহিনী। গুটি গুটি হাতে লেখা অ আ ক খ’র পালাশেষে-- “মা, তোমাকে ভালোবাসি” লিখে দিগ্বিজয়ের আনন্দে দু’জনের উদ্বেলিত হওয়ার নিখুঁত গল্প। কখনো লিখেনি তোমার চোখের কোণে জমে ওঠা আনন্দাশ্রুর ইতিবৃত্ত, তোমার মুখের অনাবিল হাসির পদাবলী। জীবনের শুদ্ধতম ইতিহাস এক মেয়ের বুকে পাতার পর পাতায় লেখা আছে, মা। আজ এই নির্ঘুম রাতের অবসরে তা উল্টেপাল্টে দেখছি।
তুমি তো জানো, হাঁটতে আমার ভালো লাগে। তোমার কড়ে আঙুল ধরে শৈশবে হেঁটে গেছি বহুদূর। ইশকুলের প্রধান শিক্ষিকার ধরাবাঁধা কাজশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরতে। ঘরেও কাজের কমতি ছিল না। নিজ হাতে সব সামলাতে, সন্ধ্যেয় নামাজ শেষে বাসার পাশের সরু রাস্তাটায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে বের হতে আমার হাত ধরে। সে এক মহার্ঘ সময়! পড়ন্ত এক শীতসন্ধ্যায় ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ছোট মফঃস্বল শহরের একপ্রান্তে আমরা দুজন হেঁটে যাচ্ছি। তোমার পরণে সুতি শাড়ির ওপর হালকা সবুজ সোয়েটার, আর ফুলতোলা কাশ্মিরী শাল। সেজো খালার বুনে দেয়া লাল টকটকে সোয়েটার আর টুপি পরে আমি। চারপাশে কেমন এক মিশ্র গন্ধ ভেসে বেড়াতো। শ্যাওলাচ্ছন্ন পুকুরের ধার থেকে সোঁদা গন্ধ, পাশের উকিলবাড়ির উনুনে দেয়া মাংসের তরকারির মশলামাখা মৌতাত, বাবলুদের বাসার সামনের ঘরটি থেকে ভেসে আসা মশার কয়েলের ঘ্রাণ। সে ঘরে তারা দু’ভাই-বোন এক টেবিলে পড়তে বসেছে। আমার পাশে মা মা সুবাস। মন উচাটন এসব গন্ধস্মৃতি এই বড়বেলাতেও কখনো দৃশ্যপট ভাসিয়ে নিয়ে আসে; আমাকে স্থির দাঁড় করিয়ে দেয়! তোমার হাত ধরে আমি আবার সেই ছোট খুকু। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরবেলায় খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছি, তোমার সাথে গান গাইতে গাইতে, ফুল হাতে, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? ভোরের আলো মাখা তোমার হাসিমুখখানি স্পষ্ট দেখতে পাই। আমার শ্যামলা বরণ অপার্থিব সুন্দর মা তুমি!
আমি এখনও হেঁটে বেড়াই। একা। এই ভ্রমণে কেউ আমার সঙ্গী হয় না। নদীর ধার ঘেঁষে। সড়কের পর সড়ক, গ্রামের পর গ্রাম। পৃথিবীর পর পৃথিবী। হাঁটতে হাঁটতে নক্ষত্ররাজি পার হই, সময়কেও অতিক্রম করি। ঝিম ধরা দুপুরে আদর্শ শিশু বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়ে পঞ্চম শ্রেণীর ছোট কামরাটায় ডেস্কে গিয়ে বসি। ইরফান ভাই ঘন্টা বাজাচ্ছেন, খালেদা ইসলাম এখনই বাংলা দ্বিতীয় পত্রের ক্লাস নিতে আসবেন। আজ পরীক্ষা। লুনা, তিথি, শরীফ, রনি—সবাই যে যার ডেস্কে, ঘাড় নিচু করে নোটখাতা ঘাঁটছে। শরীফের ফর্সা স্বচ্ছ ত্বকের নিচের নীলচে শিরা আগের মতই স্পষ্ট দেখা যায়। আমাকে ওরা দেখতে পায় না। আপাকে ক্লাসরুমে ঢুকতে দেখি, গুটিবসন্তের চিহ্নমাখা দৃঢ় অথচ কি মায়াবী মুখ! হাতে একগাদা প্রশ্নপত্র। সেখানে আছে সমাস, কারক, ণত্ব বিধান, ষত্ব বিধান। এক, দুই,‌ তিন করে প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
প্রশ্নের হাত থেকে এই বয়সেও, এখনও রক্ষা নেই। অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও যে খুঁজে পাইনি! মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা এতো কঠিন কেন, মা? তোমার মত নিঃস্বার্থভাবে দু’হাত মেলে কেউ আলিঙ্গনে আমায় বাঁধতে পারে না কেন? মানুষের প্রতীক্ষাই বা এতো দীর্ঘ কেন? ছাপোষা কেরানি যেমন প্রতীক্ষায় থাকে শুক্রবারের ছুটির দিনটির, পরিবারের সবার সাথে সময় কাটাবে। তরুণী সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকে বসন্তের প্রথম প্রহরের। হলুদ ফুল আর শাড়িতে নিজেকে রাঙিয়ে প্রিয়তমের হাত ছুঁয়ে হেঁটে যাবে এক দীর্ঘপথ। প্রতীক্ষা! রাস্তার ওপাশের অন্ধ ভিখারিনীর “মিলন হবে কতো দিনে, আমার মনের মানুষের সনে?” গান শুনতে শুনতে ভাবি, সেও কী এক অসম্ভব সুখের প্রতীক্ষায় আছে? আচ্ছা, সে কেন হেলেন কেলার হল না? তমসাচ্ছন্ন পৃথিবীতে এক স্বচ্ছসুন্দর আলো জ্বেলে দিতে পারত সে! অপার সম্ভাবনায় আমি-ই বা কেন হলাম না সেই অন্ধ ভিখারিণী? ভাঙা গলায় রাস্তায় গান গেয়ে গেয়ে বেড়াতাম। শতচ্ছিন্ন কাপড়ে-মোড়ানো তার অতি-সাধারণত্ব আর বইতে পড়া হেলেন কেলারের অসাধারণত্বের মাঝামাঝি আমার সাধারণ আটপৌরে জীবন এরকম হাজারো প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
মা, একদিন বলেছিলে, প্রতিটি জন্মের পেছনে প্রকৃতির কোন উদ্দেশ্য আছে। প্রতিটি কাজের পেছনে যেমন একটি কারণ থাকে। আমি এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছি আমার জন্মের উদ্দেশ্য, আমার সত্যিকার গন্তব্য। পাশে থাকলে তুমি হয়ত অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতে। নিরন্তর অন্বেষণে শুধু বুঝেছি, অকিঞ্চিৎকর এই জীবনে ব্যর্থতা আর সাফল্যের মানদণ্ড প্রচলিত বিশ্বাসের থেকে অনেকটাই অন্যরকম। অনেকে তা বুঝতে পারে না। তোমার আপাতঃ সাধারণ প্রতিটি কাজ আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। তোমার মনের বিশালতা আর সৌন্দর্য আমায় বিশ্বাস করিয়েছে যে, তুমি একজন সফল ব্যক্তি।
ভালোবাসি তোমায়, মা। ভালবেসে আত্মা বোঝে না দিনপঞ্জিকা আর ঘড়ির হিসেব, বোঝে না দূরত্ব। আমার আত্মা তোমার আত্মার সাথে প্রতিক্ষণ কথা বলে চলুক। আমি নাহয় নীরব থাকি, মা।
তোমার খুকু।