২৩ ফুলের গল্প

অপরাহ্ণ সুসমিতো




ছোটবেলায় আমাকে শব্দ করে সুর করে ক্লাসের পড়া বাসায় পড়তে হতো। শব্দ করে পড়লে মা খুশি থাকতেন। একটু দূরে মা মেঝেতে বসে শাক কাটতেন বা দুপুর বা রাতের রান্নার আয়োজন করতে করতে আমার সশব্দ সুর করে পড়ার ধ্বনি তাকে মোহিত করতো। তিনি ভাবতেন ছেলে তাঁর পড়াশুনায় ভীষণ মনোযোগী।
শব্দ করে না পড়লেই তিনি হৈ রৈ করে উঠতেন।
: কি ব্যাপার রাঙ্গা? বিএ এমএ পড়ো নাকি যে মনে মনে পড়তে হবে। শব্দ করে পড়। আমি যেন এখান থেকে শুনতে পাই।
মা রেগে যাবার নমুনা সমূহ;
ক.আমাকে তুমি বা আপনি করে সম্বোধন
খ.রাঙ্গা বলে সম্বোধন
গ.ডাল ঘুটনির খোঁজ

আমাকে শায়েস্তা করার তাঁর প্রধান অস্ত্র এই কাঠের ডাল ঘুটনি। বহুবার আমি লুকিয়ে রেখেছি বা ফেলে দিয়েছি,কাজ হয়নি। মা কেনার সময় কিছু এক্সট্রা ডাল ঘুটনি কিনে লুকিয়ে রাখতেন। যেন চোরের উপর বাটপারী।
আসলে তখন নি:শব্দে পড়ার প্রধান কারণ ছিল গল্পের বই। বাসায় গল্পের বই মানে আউট বই,আর তা পড়া বারণ। ক্লাসের পড়ার ক্ষতি হবে। লুকিয়ে গল্পের বই পড়ার এই বিশেষ পদ্ধতি শিখেছি আমার বন্ধু জসীমের কাছে।
গল্পের বইটাকে প্রথমে খবরের কাগজ দিয়ে সুন্দর করে মলাট লাগিয়ে দিতাম যাতে চট করে প্রচ্ছদে বইটার নাম,লেখকের নাম চোখে না পড়ে। মলাটের উপর আবার কালির কলম দিয়ে বড় বড় করে লিখে নিতাম : সহজ সমাজ বিজ্ঞান বা ছোটদের পৌরনীতি।
মুশকিলটা হলো যখন গল্পের বইটা পড়া শুরু করতাম আমার পড়ার টেবিলে;প্রথমে উপরে ক্লাসের বইটা মেলে ধরে সেই বইটার নিচে আউট বইটা খুলে রাখতাম। সুযোগ বুঝে একটু পর পর গল্পের জগতে ডুব। স্বাভাবিক ভাবেই গল্পের বই জোরে সশব্দে পড়া যায় না,কিছুক্ষণ ক্লাসের পড়া পড়ে আবার থেমে যেতে হতো,মন আঁকুপাকু করত সেই রঙ্গীন গল্পের বইয়ের পাতায় পাতায়।
এই গোয়েন্দা পদ্ধতি বেশিদিন সফল হলো না,ধরা পড়ে গেলাম একদিন। যথারীতি মা কর্তৃক ডাল ঘুটনি’র উত্তম প্রয়োগ হলো আমার পিঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সদৃশ নির্বাহী আদেশ জারি হলো;
: বন্ধু জসীমের আমাদের বাসায় ভিসা সাময়িক স্থগিত।

একুশে ফেব্রুয়ারী এলে আমাদের স্কুলে সাজ সাজ পড়ে যেতো। আসলে শোকের অনুষ্ঠানও দীর্ঘমেয়াদে আনন্দের অনুষ্ঠান হয়ে পড়ে। তাছাড়া বায়ান্নোর একুশের তাৎপর্যও হয়তো বিশদ করে বোঝার বয়স তখন ছিল না। আমাদের বাগানে ফুলের তেমন সমারোহ নেই। জসীমদের বাসার কাছেই আমাদের আরেক ক্লাসমেট ইন্দিরা মন্দিরাদের বাসা। ইন্দিরা মন্দিরা ২ বোন। ইন্দিরা এক ক্লাস ফেল করাতে এই ২ বোনই এখন আমাদের সহপাঠী। ওরা খুব ভালো গান করে,ভালো কবিতা পড়ে। অনুষ্ঠান এলেই ইন্দিরা মন্দিরার সে কী ডিমান্ড ! সবচেয়ে বড় কথা হলো ওদের বাসার সামনের বাগানটা অসম্ভব সুন্দর,খুব যত্ন করে তৈরী। ওর বাবা খুব বাগান বিলাসী। অজস্র ফুলের মিলন মেলা ।

বিশে ফেব্রুয়ারী রাত ১২.০১ মিনিটে শহীদ মিনারে যাবার অনুমতি ছিল না,তবে অধীর অপেক্ষা করতাম পরদিন একুশের প্রভাত ফেরীর জন্য। সে কী আকুলতা! সূর্য ওঠার আগেই আমরা রেডি..রাতে ভালো না ঘুমাবার লক্ষণ চোখে মুখে..তবু সে কী প্রবল উত্তেজনা!
শহীদ মিনারে তো আর খালি হাতে যাওয়া যায় না,ফুল নিতে হবে। ফুলের উৎস তো আমাদের ইন্দিরা মন্দিরাদের বাগান। ওরাও জানতো যে একুশ এলেই ওদের বাগানে গোপন হামলা হবে।
ফুল লুন্ঠন হবে। ওরা রাত জেগে পাহারা দিত।

জসীম আমি রাত বাড়তে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওদের বাগানের পেছন দিক দিয়ে হাজির। দূর থেকে রাতের অল্প আঁধারে টের পাচ্ছি বাগানের মাঝে একজন হাঁটাহাটি করছে।
প্ল্যানটা এরকম যে জসীম একদিক দিয়ে বাগানে ঢুকবে,ঢুকে পাহারাদারের মুখ চোখ চেপে ধরবে,আমি আরেক দিক থেকে বাগানে ঢুকে তখন ঝটপট ফুল ছিঁড়ে চম্পট দেবো। রাতেই আমাদের বাসায় এসে ফুলের একটা তোড়া বানিয়ে রাখব,সকাল হলেই প্রভাত ফেরীতে আমি আর জসীম …

মন খারাপের বিষয় হলো মন্দিরাদের বাগানের ফুল মিশন সফল হলো না,জসীম বাগানে ঢুকে দেখে পাহারাদার মন্দিরা স্বয়ং। একটা মেয়েকে এভাবে পেছন থেকে জাপটে ধরা শোভন হবে না ভেবে হতাশ হয়ে ফিরে আসতেই শুনতে পেল;মন্দিরার গলা। ফিসফিস করে বলছে;
: জানতাম তোরা আসবি। তোদের জন্য অল্প ফুল আমি রেডি করে রেখেছি। আয় চুপচাপ নে। শব্দ করিস না ..বাবা টের পেলে আমাকে খুন করে ফেলবে..

জসীম আর আমি সেই গাঢ় অন্ধকার রাতে দুজনেই এক সাথে মন্দিরার প্রেমে ডুবুহাবু। জসীম গম্ভীর হয়ে কি যেন ভেবে বলল;
: তাহলে ইন্দিরার কি হবে?

সে রাতে বাসায় এসে আমরা দুজন মহা আনন্দে মন্দিরার দেয়া ফুলগুলো দিয়ে একটা স্তবক বানানোর চেষ্টা করছি,কিছুতেই পারছি না। আসলে আগে বুঝতে পারিনি যে ফুল দিয়ে কিছু একটা বানানো যে ভারী কঠিন কর্ম। ফাল্গুনের অল্প গরমে আমরা দুজন গলদঘর্ম। বারান্দায় দুজন পা ছড়িয়ে বসে আছি,ভাবছি কি করা যায়।

এমন সময় বারান্দায় মা এসে হাজির। ভেবেছিলাম উনি মহা ঘুমে থাকবে। আমাদের দুজনের অসহায় চেহারা আর সামনে ছড়ানো ফুলগুলো দেখে বুঝে ফেললেন নিমিষেই। গম্ভীর গলায় বললেন;
: সামনে থেকে সর শয়তান..
জসীম আর আমি ভয়ে শেষ। মা আর কিছু বললেন না। সামনে ছড়ানো ফুলগুলো সব কুড়িয়ে নিলেন যত্ন করে। আমরা বারান্দায় দুজন অসহায় বসে আছি। রাত বাড়ছে টকটক করে তেঁতুল রঙে। বুঝতে পারছিলাম না কি করব..
প্রায় আধা ঘন্টা পর হবে,দুজনে ঝিম মেরে চোখ বন্ধ করে বারান্দায় বসে আছি,ঘুমানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা,ব্যর্থ হরতালের মতো। এমন সময় ক্যাচক্যাচ করে বারান্দার লাগোয়া দরজাটা খুলে গেল,চমকে তাকাতে দেখি মা দাঁড়ানো।

প্রায় আধো আলো অন্ধকারে মা’র মম হাসিমুখখানা দেখতে পেলাম মনে হয়। মায়ের হাতে কী সুন্দর একটা ফুলের স্তবক। মা বলছেন রাতের ফেব্রুয়ারী মমতা মাখিয়ে;

: গুনে দেখলাম তোরা ২৩ টা ফুল এনেছিস। ২১টা ফুল দিয়ে তোদের জন্য একটা কিছু বানিয়ে দিয়েছি। এই নে দেখ তো পছন্দ হলো কিনা ?
আর শোন ১টা ফুল আমি রেখে দিলাম আমার জন্য। জসীম তুই ১টা ফুল নিয়ে যা তোর মা’র জন্য।

সকালবেলার আলো এসে পড়েছিল আমাদের স্কুলের ধ্রুপদ বারান্দায়। একটু পরেই একুশের প্রভাত ফেরী শুরু হবে। ফাগুনের মোহনা থেকে আ মরি মোহন মূর্ছনা ছড়াচ্ছিল যেন চারপাশে,যেন অনুপম প্রজাপতি। স্কুলের ছেলেমেয়েদের সুশৃংখল সারিবদ্ধ করছিলেন স্যাররা। জসীম আর আমার হাতে মায়ের বানিয়ে দেয়া সেই স্তবক,দুজনে প্রগাঢ় ধরে আছি।

দূরে মেয়েদের সারিতে দেখতে পেলাম ইন্দিরা মন্দিরা দুই বোনকে। স্কুলের ড্রেসে ওদের কী যে সুন্দর লাগছে !