মা

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়



Art is the child of nature in whom we trace the features on the mothers face
Henry Wadsworth Longfellow
মা । ছোট্ট একটি শব্দ ।অথচ সারা দুনিয়া আবহমান সময় স্তব্ধ হয়ে আছে এই অস্তিত্বের কাছে।এক মহাজাগতিক দরজার সামনে এসে খুলে গেছে সমস্ত অন্ধকার।এই অন্ধকারই তো জীবনের সারস্বত সাধনা।কল্পনার নির্বাক পৃথিবী যেখানে ডানা মেলে উড়ে চলে অন্য এক বিস্তারের খোঁজে ।অসীমের সন্ধানে।আমি এই বিশালতার দিকে তাকিয়ে থাকি আর অনুভব করি বহমান জীবনের স্রোতধারা।নিয়ত স্পদনের ওঙ্কারধ্বনির ভেতর আমরা চিনে যাই পৃথিবীর রূপ রস গন্দের আস্বাদন।বেঁচে থাকার প্রতি নিশ্বাসে থাকে মাতৃমন্ত্র ।জীবন তার অনিঃশেষ গতি নিয়ে কীভাবে প্রাণের স্বাক্ষর রেখেছে।এই যে অগনিত হৃদয়ের স্পন্দন।হাজার হাজার প্রাণ আসছে প্রতিমুহুর্তে আবার বিলীন হয়ে আছে এক অনন্ত কৃষ্ণগহ্বরে ।তার ধারক আশ্রয় প্রতিপালন এবং স্নেহবিতানের নামই তো মা ।মা ছাড়া কোন শব্দে আমরা বিশ্লেষণ করব এই অন্তহীন ভালোবাসার ঐশ্বর্য ?এই মাধ্যাকর্ষণ? অনাদি অনন্ত সমারোহের মাঝে অস্তিত্বকে ক্ষুদ্র ,অতিক্ষুদ্র অণু পরমাণুর চেয়েও মৃদু এবং ভারহীন মনে হয় ।
মা আসলে এক উনিভার্সাল সেট । যার ভেতর আমরা জমা করি আমাদের প্রতিদিনকার কান্না দুঃখ রক্তক্ষরণ এবং পরাজয়ের মর্মবেদনা । আর মা হাসিমুখে এসব সঞ্চয় করতে করতে একদিন দেখে বেদনাগুলো ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে শাড়ির দেওয়ালে।দুঃখগুলো কখন জমতে জমতে ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো উড়ে গেছে আকাশসীমার বাইরে ।সমস্ত রক্তক্ষরণ নিঃশব্দে ভাসিয়ে দিয়েছে নদীর জলে । মায়ের হলুদ লাগা হাতে মর্মমুল জীবনের ছায়া আমাদের নিবিড় আশ্রয় ।
মাকে কখনও অপ্রাপ্তির বেদনায় বিষাদকাতর হতে দেখিনি ।মায়ের হাতদুটো সারাদিন ব্যস্ত থাকত কাজে ।একান্ত অবকাশে যখন তা আমাদের মাথার উপর গালে কপালে নেমে আসত তখন মনে হত মা সত্যিই জাদু জানে । অদ্ভুত জ্যোৎস্না ছড়ানো জাদু ।এই স্পর্শের ভেতর নেমে আসে মরমী অশ্রুতশব্দেরা ।
ছোটবেলায় খুব রোগ ভোগ করতাম বলেই মায়ের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল অন্যরকম ।আমাকে ঘিরে মায়ের দুশ্চিন্তার রেখাগুলো গভীর হয়ে উঠত ।এক মিনিটও মা ছেড়ে থাকতে চাইত না । খুব কম বয়সেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে যাওয়ার কথা আমার । হজমশক্তি বরাবরই কম । লিভার কাজ করত না ঠিকঠাক ।তার উপর বারোমাসে চব্বিশ রকমের অসুখে ভুগতাম । ভুগতে ভুগতে রুগ্ন আরও রুগ্ন হয়ে যেতাম।কোমর ছিল সরু , অনেক বড় অবধি ভালো করে হাঁটতে পারতামনা ।স্কুল যেতে যেতে মাঝে দুতিন বার বসতে হত ।এই রুগ্নতা অন্যান্য ভাইবোনদের চেয়ে একটু বেশিই মায়ের স্নেহের দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমাকে । অভাবের সংসার । তার উপর এক বিপন্ন সময়ে জন্মেছিলাম আমি । মামাবাড়ি থেকে একটা গাই দিয়েছিল।মাকে বলেছিল – হাড় জিরজিরে রোগা লিকপিকে ছেলে তোর দুবেলা দুধ খাওয়াস । ভাগ্য বোধ হয় আমার এমনই বারবার প্রতারনা করেছে।ঘরের অন্যান্য জিনিষপত্রের সাথে সেই গাইটাও চুরি হয়ে গিয়েছিল কদিন পর । তারপর আর দুধ জুটত না বলে মা আমাকে বার্লি গুলে খাওয়াত । আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম । মা বলত – দেখবি , আমার হাতে জাদু । একে আমি দুধ বানিয়ে দিতে পারি নিমেষে । মা পারেনি । দুধ বানাতে না পারলেও দুধের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু অভুতপুর্ব স্বাদু তরলের স্বাদ আমার গলার ভেতর দিয়ে নামতে নামতে এক স্বপ্নাদ্য পৃথিবীর পর্যবেক্ষন আমাকে প্লাবিত করে । বাস্তব পৃথিবীর রুক্ষ্ণতা মানুষকে ভাবপৃথিবীর দিকে নিয়ে আসে। এই নেশাটাও মা ই ঢুকিয়ে দিয়েছিল আমার মগজে । মা খুব বই পড়ত তখন ,এখন আর ততখানি পড়েনা ।গল্প পড়তে পড়তে ভালো লাগা গল্পগুলো আমাদের না শোনালে তৃপ্তি হত না মায়ের । আর এই গল্প শুনতে শুনতেই বস্তু পৃথিবীর বাইরে বোধের এবং এক কল্পপৃথিবীর ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিল ছোটবেলায় । যেখানে নানা স্তর আর বিভঙ্গের সন্নিবেশ । বাস্তব ,সহজ বাস্তব আর কল্পনার কত খাঁজ এবং অলিন্দ ।
ফুল ফুটলে আমি গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতাম । ঠিক কখন গাছে উঠে ফুলগুলো ছিঁড়ে নামিয়ে আনব মাটিতে । প্রতি ঋতুতে ভরে উঠত বাগান। রঙের ঝরনায় তোলপাড় করত দিগন্ত ।
মা বলত – ফুল ফুটলে গাছকে সুন্দর লাগে । মুক্ত মনে হয় ।
-মুক্ত না রঙিন ?
-রঙ মানেই তো মুক্তি । যাদের বর্ণমালা নেই তারা বর্ণের মধ্যেই প্রকাশ করে তার সৃজনের ভাষা । সমস্ত আবদ্ধতা ভেঙে দেয় । আমি মায়ের সব কথা বুঝতে পারতাম না । শুধু বুঝতাম ফুল ফুটলে গাছকেও মায়ের মতো লাগে । আর ওই ফুলগুলোকে মনে হয় আমি আমরা ।ওদের দুঃখ কষ্টগুলো আত্মীকরন করতে পারতাম নিজের মধ্যে । একটু একটু করে । এই অনুভবের ইচ্ছেটা পশ্চিমদিগন্ত থেকে যেন পুর্বজন্মের এক স্মৃতির ভেতর ডুবে যেত অতর্কিতে । আবহমান কাল ধরে এই জীবনের সমারোহ চলছে । এখানে তো দুটি অস্তিত্ব আছে কেবল সুপারসেট এবং তার অন্তরের অজস্র সংখ্যাহীন সাবসেট ।
প্রচুর বই পড়লেও আমার মা কোনদিনও এক লাইন কিছু লেখেনি । ডায়েরির পাতাতেও না । অথচ অনেক কথা বলে যেত কত সরলভাবে । চোখের আয়ত জুড়ে ছবি আর শব্দ ভেসে বেড়াত ।আজও সূর্যোদয়ের মতো সেইসব কথার ভেতর আমি রাস্তা পার হয়ে যাই । দেখি । স্নেহ আর মমতা দিয়ে বড় করে তোলা নয় , অনুশাসন আর শৃঙ্খলার আবেষ্টনী নয় মা আমাদের কাছে অন্যরকম পৃথিবী । আমাদের ছোটবেলা আমাদের কৈশোরবেলা সম্পূর্ণ মা কেন্দ্রিক । বুকের মধ্যে কথা জমতে জমতে পাহাড় হয়ে গেলে মা ছাড়া আর কেউ ছিলনা যার কাছে উন্মচন করা যায় এই ভাণ্ডার । শিক্ষকতা , কবিতা আর রাজনীতির আবর্তে বন্দী থাকত বাবা । আজ কাকদ্ব্বীপ তো কাল কোচবিহার । পরশু বান্দোয়ান তো পরেরদিন বালুরঘাট । ফলে বাবাকে সেভাবে পেতাম না আমরা ।এই নিয়ে যে আমাদের অভিযোগ ছিলনা তেমন নয় । অভিমান ছিল হয়তো বা মৃদু নালিশও ছিল মায়ের কাছে , বলতাম - বন্ধুদের কথা তাদের বাবাদের কথা গ্রীষ্মের দুপুরে তাদের ক্যারাম খেলার কথা পুকুরে সাঁতার শেখানোর কথা , সার্কাস দেখতে নিয়ে যাওয়ার কথা । মা বলত – সবাই কি একরম হয় , সবাই কি জ্যোৎস্নার নাবিক হতে পারে ? তোর মতো তোদের মতো আরও হাজার হাজার শিশু আছে যাদের খাবার নেই , পরার জামা নেই মাথার উপর খড়ের চাল অবধি নেই , তাদের কথাও কাওকে না কাওকে তো ভাবতেই হবে । তখন মনে হত মা শুধুমাত্র বায়োলজিক্যাল একটা সম্পর্কের নাম নয় । মা এক পৃথিবীর নাম । এক সীমাহীন সীমানা অতিক্রমী ভালোবাসার নাম -মা । একক মানুষের অনন্ত হয়ে ওঠার নাম মা । মা এক ইউনিভার্সাল সেট । এভাবেই মা হয়ে উঠছিল আমাদের সবসময়ের বন্ধু আশ্রয় এবং ভরসা । একটি যৌথ পরিবারের সামগ্রিক কাজ একা হাতে সামলে মা যখন সামান্য দুটি খাবার নিয়ে বসতে যাবে ঠিক তখনই হয়তো কোন অতিথি এসে হাজির । অতিথি মানে শুধু কুটুমজন নয় । আমাদের আত্মীয়তা যেকোন মানুষের সাথে গণআন্দোলন বা কবিতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত যেকেউ । মা জিজ্ঞেস করত – কোথা থেকে আসছেন ?
তিনি বলতেন জায়গার নাম । নাম বলতেন । তারপর বলতেন – দাদা নেই ?
না, তো কি হয়েছে আমরা তো আছি । খাওয়া দাওয়া করুন একটু বিশ্রাম নিন, এর মধ্যেই এসে যাবেন ।
আমরা বুঝতাম না সে জায়গা কতদূর । ইস , কখন বেরিয়েছেন , মুখ শুকিয়ে গেছে । হাতমুখ ধুয়ে আসুন , খাবার বেড়ে দিই ।
- না , বউদি । বিশ্বাস করুন আমি খেয়ে এসেছি ।
- ঠিক আছে । বিশেষকিছু তো খাওয়াতে পারব না ভাই ।
ডিম ভাজতে ভাজতে মা গল্প করত কবিতা নিয়ে সাহিত্য নিয়ে , মানে মা যতটুকু বুঝত আর কী। এই সব কাজের মধ্যে ভাতের থালা সাজিয়ে দিত মা । আর আমরা দেখতাম নিজে সামান্য দুটি মুড়ি থালায় সাজিয়ে একগ্লাস জল খেয়ে নিত নিশব্দে । এ ঘটনা দু এক দিন প্রায়ই ঘটত । যেদিন হয়তো কেউই আসত না । সেদিন হয়তো আসত অন্ধ বাউল কিংবা দূর গাঁয়ের কোন বোষ্টমী । এসে বলত - দুমুঠো ভাত হবে মা ? সারাদিন কিচ্ছুটি জোটেনি । আমাদের মন খারাপ হয়ে যেত । তাকিয়ে থাকতাম মায়ের দিকে – বলে দাও , হাত জোড়া । এখন খেতে বসেছি ।
- তা কি হয় । বয়স্ক মানুষ , চোখে দেখতে পায়না । নিজে থেকে বাড়ি এসে খাবার চাইছেন । আজ আমার কত পূণ্যি ।
পাপ পূণ্যের হিসেব নিকেশ আমাদের জানা ছিলনা । আমরা দেখতাম নিজের সমস্ত খাবার তুলে দিতে দিতে অদ্ভুত এক দীপ্তিতে ভরে যেত মায়ের মুখ । উজ্জ্বল আলো এসে পড়ত মায়ের লাল টিপের উপর । মা মানে এই অনির্বচনীয় আলো । তারপর নিজে একগ্লাস চা বানিয়ে দুটি মুড়ি চিবুতে চিবুতে বলত – কাল যে অঙ্কগুলো দিয়েছিলাম , তা কিন্তু হয়নি । আজ ঠিক সেই জায়গা থেকেই শুরু হবে । অঙ্কে একশোতে একশো পেয়ে প্রাথমিকে বৃত্তি পেয়েছিল মা । কত জটিল অঙ্ক মুখে মুখে করে ফেলত । বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেকরাত অবধি মানসাঙ্ক বলে যেত মা । খাতা কলম নয় মুখে মুখে অঙ্ক করলে বুদ্ধি বাড়ে । আজও যেকোন যুক্তিহীন জিনিষকে সহজে গ্রহন না করার যে উত্তরাধিকার তা মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া ।
এই যে অল্পস্বল্প লিখি । গল্প লিখি । দু একটা ঊপন্যাসও লিখেছি । এই চর্চা কিন্তু আমার মায়ের কাছ থেকে । ছোটবেলায় গল্প শোনাত মা । তার নির্যাস রয়ে গেছে শরীরে , স্নায়ুর কোন এক নিভৃত উপকুলে । আমার গল্প আমি মাকে শোনাতে ভয় পাই আজও । ছোটবেলায় অঙ্কগুলো যেভাবে কেটে দিত মা । বলত – হয়নি , আরও নির্ভুল আরও যুক্তিপূর্ণ এবং আরও প্রাণভরতি উদ্দীপনাময় উপসংহারের দিকে নিয়ে যেতেহবে সংখ্যাগুলোকে । তখন আর অঙ্ক শেখাতে হবেনা । তুই নিজেই বুঝতে পারবি অঙ্কগুলো কথা বলছে ।
শব্দের মধ্যে সেই স্পন্দন খুঁজি আমি । খুঁজে চলি নিরন্তর । সেই মহাজাগতিক হৃদস্পন্দন ।