ফিনিক

পিয়াল রায়






“ পাতায় পাতায় চোখের জল
সেখানে লিপিবদ্ধ
আর মনোবেদনা সেই এপিকের ট্র্যাজিক মলাট ;
মানুষের বুকে এতো দীর্ঘশ্বাস,
এতো দীর্ঘশ্বাস , কে জানতো !”

মানুষের ইচ্ছেগুলো আমাকে বারবার ভাঙে। শুধু ঘাম নয়, রক্তের ছোপও সমুদ্র ডিঙ্গিয়ে শরীর আশ্রয় করে। নিয়মকে তখন অগ্রাহ্য করার একটা নৈর্ব্যক্তিক সুখ চেপে ধরি। জগতের সমস্ত সৃষ্টি তার গর্ভশালা খুলে দ্যায়। আমি সেখানে উৎপাদন দেখি। তাকে ধন্যবাদ তিনি মানুষের মধ্যে এতো রঙ মিশিয়েছেন। একা চলতে গেলেই সেসব টের পাওয়া যায়। তিনি বলেন এখানে চোখ রাখো। হাওয়াইবাজির স্ফুলিঙ্গে। তার জ্বলে ওঠা, নিভে যাওয়ার মধ্যে সুরেলা গণিত খেয়াল করো। মনে রেখো অন্ধকারকে কখনো একা ভাবা ঠিক নয়। সে আসলে ছোট আধারে আটকে পরা পড়া নানান রঙ, মশাল। একে অপরকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে পারছে না। প্রতিচ্ছবি ভেসে আসার সম্ভাবনাতেই মুষড়ে পড়ছে প্রতিফলন। আমি একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছি আগ্রহ। সারা শহর জুড়ে গোয়েন্দা ছড়ানো। অন্ধকার দেখলেই আয়নায় বন্দি করছে। পা ঘষটে ঘষটে, মাথায় ঘোমটার মতো ছায়া। সিঁড়িগুলো আত্মগোপন ভুলেছে বলেই হয়ত একই রাস্তায় বারবার দেখা যাচ্ছে তাদের। এসব গুলিয়ে দিচ্ছে চেনাশোনা ছক। বীভৎস কোনও স্বপ্ন নিয়েই খুনিরা চাষ করে গোলাপের। আহা গোলাপ, কোনোদিন খোঁজ রাখেনি সে অস্ত্রের। ভীষণ একঘেয়ে ক্লান্তিকর শব্দ মাথার ভিতর। জলপ্রপাতের গায়ে যৌনতাকে ধর্ষণ করে নিংড়ে নিচ্ছে। আমি চেঁচিয়ে উঠি, বাঁধা দিই তারপর পড়ে যাই। কেউ আমাকে ধাক্কা দেয়। উঁচু থেকে পড়তে পড়তে দুহাতে আঁকড়ে ধরি শহরটাকে। শহর গেঁথে যায় বুকে। ফিনকি দিয়ে জন্ম নেয় সে।




“ আপনা খুদা ভি হোগা
আপনা হি রব লে লেঙ্গে ...”

নিজেই নিজের কৃতকর্মের জন্য কারাগারে বন্দী। কারাগারও তাকে চিনেছে ভালোই। রোজ দুবেলা রুটির পাত্রে কথামালা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ভাগ পাঠিয়ে দ্যায়। লোকটা পড়ে আর পরিচিত হতে থাকে ভাষার সঙ্গে। যে ভাষা একদিন বুকের ফিনকি থেকে জন্মেছিল। পড়তে পড়তে লোকটা ‘মা’ বলে ডাকতে শেখে। ধীরেধীরে ভাষার মধ্যে আবছা একটা আদল। ধরতে পারে, পরক্ষনেই পিছলে যায়। বুঝতে পারে প্রতিবিম্ব সঠিক ধরতে আয়নার সামনে দাঁড়ানো জরুরী। কথা বলা দরকার আয়নার ভিতর আটকে থাকা হাতগুলোর সাথে। সে নিশ্চিত হতে পারে নিজের ইচ্ছাশক্তির ব্যাপারে। কারাগার কি তাকে বলে দিতে চায় শহরের নাম? কাটাকুটি ছকে ভরে যায় দেওয়াল। ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে মুখ। একটা স্পষ্ট আদলের জন্য সে চলে যেতে যায়। দড়িটাকে উঁচু করে ধরলেই পাঁচিল নিচু হয়ে পথ করে দিতে পারে। বারবার পরীক্ষা চলে তার। যতক্ষণ না সে সক্ষম কারিগর হয়ে ওঠে।




“ তারপর থেকে পাখি ভাবতে থাকে ----
আমি ছোট পাখি। আমি সুখী। ছোট আয়ু ভরে আমি পক্ষিণীকে ডাকি ...”


আজ একটা ভাষা কুড়িয়ে পেয়েছে সে মাঠ থেকে। একটা ভাষা পেয়েছে এক মৃত মানুষের গলায় ঝোলা তাবিজটা থেকে। এক বালক মুখে ভাষা নিয়ে চিবোতে চিবোতে চলে যাচ্ছিল রূপোলী মেঘের দিকে। তার কাছে থেকে সে চেয়ে নিয়েছে ভাষাটি। এক বেবুশ্যে মাগী খদ্দেরের সাথে বিনিময় করছিল নিঃসাড় ভাষা। লোকটা ছিনিয়ে নিয়েছে তাকেও। এভাবেই সে পুকুর থেকে, গাছ থেকে, রাস্তায় গড়াগড়ি যাওয়া প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে, খোঁজা থেকে, অস্তিত্ব থেকে, পাঁয়তারা থেকে, শ্রম থেকে, অবিশ্বাস থেকে, দৃঢ়তা থেকে, সঞ্চয় থেকে, মুক্তি থেকে টুকরো টুকরো জমিয়ে ফেলেছে অনেক ভাষা। শহরে পৌঁছোবার আগেই তার খড়ি ওঠা গায়ের সাথে লেপটে গেছে তারা। ঠিক শীতের রোদের মতো। আরামদায়ক। সে শুনেছে এ শহরেই তার মায়ের স্মরণসভা। জমায়েতটাকে সে খুঁজে বের করতে চায়। দিনক্ষণ বা দূরত্ব তার কাছে অর্থহীন। জমায়েত স্থান থেকে ঠিকরে আসা আলো তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওখানেই রয়েছে আয়নাগুলো। ওগুলো ভেঙে ফেলতে পারলেই অন্ধকার ভেঙে পড়বে। চাপ চাপ রক্তের ছোপ ভেঙে পড়বে। লোকটা দৌড়ে গিয়ে উন্মাদের মতো আয়নায় ঘষতে থাকে গা। নিজেকে মিশিয়ে দ্যায়। ওর শরীরে লেপ্টে থাকা ভাষার ঘর্ষণে অন্ধকার গলে গলে পড়তে থাকে। এতদিনের বন্দি থাকা আলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে শহরের মাথার উপর। আজ আর কোনো ক্লান্তি নেই। ক্লিন্ন যন্ত্রণা নেই। হর্ষোল্লোসিত জনতার মুঠোয় মুঠোয় শিকড়। গেঁথে যাচ্ছে পবিত্র মাটিতে। কৃতজ্ঞ হাসি হেসে ওঠেন মাতৃভাষা , বুকের ফিনকি থেকে জন্ম হয়েছিল যার।
মা আশীর্বাদ করেন।