রেট্রোস্পেক্টিভ

অনির্বাণ ভট্টাচার্য



মাকে যখন প্রথম দেখি, তখন আমার বয়স পঁয়ষট্টি। ডাক্তার বলেছে পেটে জল বাড়ছে। শরীর আর নিয়মিত সাড়া দিচ্ছে না। জল বার করতে হচ্ছে তিন চারদিনের গ্যাপে। আমার। মায়ের সেরকম কোনও রোগ নেই। মায়েদের সেরকম কোনও রোগ থাকে না। শুধু আঙ্গুলটা সেই একবার বিষিয়ে গেছিল তারপর আর সাড়া পাচ্ছে না। নেতিয়ে গেছে। একটা আলতো আলনায় একের পর এক শাড়ী মেলে যাচ্ছে মা। আমার পাঞ্জাবি। বোনের চুড়িদার। বাবার সোয়েটার। আমার মা’কে দারুন দেখতে। জলের কাছাকাছি এলে মনে হয় ছায়া পড়ে। আর তা দেখে ভালোবেসে ফেলে আকাশ। আমার মাকে, তাই, বোধহয় শুধু বাবারা ভালোবাসতে পারেনা। তবে অনেক রাতে মাকে জলের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি। দেখেছি কী ভীষণ ছোট হয়ে যাচ্ছে ঢেউ। বেঁকে যাচ্ছে গাছ। কুণ্ঠায়। মনে হয় ঢিল ছুঁড়লে বড়সড় কোনও বৃত্তও তৈরি হবে না জলে। মা, ‘জল কি তোমার কোনও ব্যথা বোঝে?’। বাকি রাতটা ঘুমোত না। কুয়োয় জলের স্পর্শ পেতাম। দড়ি নীচে নেমে যেত। কে জানে কাকে ওঠাবে বলে? কারণ মায়ের ছায়ায় আরেকটা মা যে ওপরে ঝুঁকে আছে। আর ওপরে নীচের দিকে ঝুঁকনো আমার আসল মা। তখনো আলো ফোটেনি। নাহলে দুই মায়ের নিশ্চয়ই দেখা হত একদিন। এক বোন চুল বেঁধে বইখাতার তোড়জোড় তো অন্য মা ঝগড়ুটে, দুধের গেলাস ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মনে পড়ে যেত, না আজ তো ‘রঙ্গোলী’, আজ তো স্কুল নেই। আজ পড়াও নেই। তবে স্যার আসত। কে জানে, চশমা থেকে ধুলোর অজুহাত মোছার ফাঁকে সেই যুবক কোন মা’কে দেখে আগে ভালোবেসে ফেলত!
মাকে যখন দ্বিতীয়বার দেখি, তখন পঁয়ত্রিশ পেরচ্ছি। মার বয়স কমেনি। বাড়েওনি। আসলে মায়েদের বয়স বলে কিছু থাকে না সেভাবে। সে তুমি পাথর বলতে পারো, বা মরা তারা। পায়ের তলার মাটি বা মহানিঃসীমতা ছাড়া আর কিছু নেওয়ার নেই বাইরের থেকে। আমি রসদ পাই ছোট ছোট হাত পায়ে। শয্যায়। মা ভবিতব্যে। সজারুর মতো শব্দ করে হাঁটে। মায়ের নাম কোনোদিন মেরী ছিল না। তবে পিঠের কাঁটাগুলো সেভাবে সাজালে একটা মুকুট মনে হতেই পারত। যেরকম বাতিল অগ্রাহ্যকর উলগুলো ওম হয়ে যেত মায়ের আঙ্গুল পেলেই। রোদ লাগত। আর লাগত অবসর। দুপুরের লঙ্কা, পোস্তবাটা আর দেড় মুঠো ভাতের পর। মনে হয় মাও ঘরভরতি বালি পেলে একটা রাজপ্রাসাদ বানাতেই পারত। কিম্বা টানা তিনদিন খেটে দশপ্রহরেণধারিণী। শুধু মাকে একটা সমুদ্রসৈকত কেউ দিল না। আর বাড়ির সবার জন্য ভাত বাড়তে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেছিল, সেই সুযোগে মার চৌকাঠ থেকেই মাটি চলে গেছিল প্রতিমার গায়ে প্রথমতম ছোঁয়ায়। মার পাপ ধুয়ে ফেলেছিল মা, নিজস্ব নারীজন্মেই।
মাকে যখন শেষ দেখি ...। শব্দগুলো ধরতে পারি শুধু। অনুমানও বলতে পারো। শাঁখা থেকে একটা হলদে অবসন্ন টিমটিম ঘরের আলোর মতো মা’কে মনে হত। মা’র মুখটা অবিকল একই। ওই যে বললাম, বয়সটাও। বারোয়ারি উঠোন, যৌথ রান্নাঘর আর একটা ঘোরানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠত নামত মা। ‘কালো দরজা খুলে বাইরে তুমি এলে’। মা’কে বাদামী বেড়ালের মতো মনে হত। ন্যুনতম ভালো লাগার, ভালাবাসার, ভালো রাখার একটা ছাদ খুঁজছে। সন্তানদের মুখে করে নিয়ে যাচ্ছে পাড়ার কুকুর, বাইরের টান। গেরস্থ বলতে একবেলা কিছুটা খাওয়া আর শরীর-সর্বস্বতা। ট্রেন আসা ট্রেন যাওয়া। ধোঁয়ায় মাঠ আর কালো ঝিলটার মাঝের সীমান্তটা ঝাপসা হয়ে যেত। মা বুঝতে পারত না এইসব জলে ছায়া পড়ে না কেন। মা বুঝতে পারত না এরা আছে কেন। অথবা মা নিজেও আছে কেন। তখনো পদবী রাখা যায়, মা জানত না। অবশ্য সে অহঙ্কার মা’র তো ছিল না। মা জানত একটা বয়সের পর সবকিছুই ফেলে আস্তে হয়। সন্তানস্নেহও। নারীর সংজ্ঞা পাল্টে পাল্টে যায় পুরুষের কাছে। শরীরেরও। যে স্পর্শ পেলবতা দিত তা এখন অন্য অর্থ নিয়ে ফুল ছুঁড়তে আসে। মা সরে আসে।

মা’কে মনে করতে করতে সিকুয়েন্সটা ঠিক এরকম থাকে। আর এর চেয়ে দূরে গিয়ে আর ভাবতে পারি না। মা’কে নিয়ে বরাবরই খুব সুখে ছিলাম। মানে ওই যে বললাম, ওই স্বপ্নের মা বোধটাকে নিয়ে। তাই মুখটা মনে পড়ত না। পড়লে ঝাপসা। তবে জানি আমার মা’কে দারুন দেখতে। ধনেখালি। বঙ্কিম। আঙ্গুলে হলদে বাটনাবাটা। কপালে লালচে কিছু, আগের রাতের ছুঁড়োছুঁড়ি, বা এয়োতির চিহ্ন, সে যা খুশীই হোক। গলায় মায়া। দৃষ্টিতে বকুনি বা উসকানি মিলে একটা কিছু। এসব মিলে, জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মা বলছে, ‘আসিস না, সাঁতার জানিস না তো, যদি কিছু হয়, বড় ভয় করে রে’। আমার মা’কে আমি দেখিনি কোনোদিন। তবে ভালবাসি ভীষণ।