ভয়

সুমী সিকানদার



মোম কেনা দরকার।আজকাল ঘন ঘন বিদ্যুত যাচ্ছে।টর্চ আছে , চার্জার লাইট আছে তবু কেন জানি অনিম খুব মোম ভালোবাসে।কারণে অকারণে সব নিবিয়ে গলতে থাকা পুড়তে থাকা শিখার গুটিয়ে যাওয়া রূপ দেখতে ভালবাসে। সে কি তবে ভেতরে ভেতরে ঈর্ষাপ্রবণ ! নইলে মোমের ক্রমশঃ গ্রাস হতে থাকা অস্থির চিত্র তাকে মুগ্ধ করে কেন। দমকা হাওয়ায় ভাবনা উস্কে যায় অনিমের।

অনেক রাত হচ্ছে ওঠা দরকার । বাতাসের আনাগোনায় গাছেরা-পাতারা নুয়ে নুয়ে মাটিকে ছুঁয়ে আবার সোজা হয়ে যাচ্ছে।যত রাত বাড়ে মানুষের আওয়াজ কমে গিয়ে বইদের বোবা সংলাপ বাড়তে থাকে। তারা ভাব বিনিময়ের চেষ্টা করে পাতা উল্টানোর খসখস শব্দে। আলো অন্ধকার একে অপরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। সব সময় আলো কিন্তু জ্বলেনা । কখনও কখনও অন্ধকারও জ্বলে।

অনিম দেখছে রাত শান্ত হতে থাকলেই বইয়ে তার মনোযোগ অসম্ভব বাড়তে থাকে। সে সারারাত লাইব্রেরিতেই থাকতে চায়, শুধুই পড়ায় ডুবতে চায় । আরো কত পড়া যায় এই ভাবনায় থাকে। যেন তার বাড়ি ফেরা খুব মামুলি একটা কাজ।

এখানে আর পড়া নেই কাজ নেই। বসে বসে পেন্সিল শার্প করতে থাকে সে। কাঠপেন্সিলের কুচিগুলো মেঝেতে পাখা ছড়িয়ে নকশা হয়ে পড়ছে অনিম মুগ্ধ তাকিয়ে আছে।আপাতত পেন্সিল শার্প করাটা তার জীবনের সব চেয়ে জরুরী কাজ আর কিছু না। এক প্যাকেট পেন্সিল কেটে মেঝে নোংরা করে ফেললো অনিম।

মা কে এই নিয়ে তৃতীয়বার ডাক্তার দেখানো হলো। ডাক্তার মিমি মারিয়া এক অসামান্য সুন্দরী এবং সুন্দর মনের মানুষ। কী যে সুন্দর করে তিনি কথা বলেন। অর্ধেক রোগী তো শুধু কথা শুনতেই আসে।
মা গুছিয়ে শাড়ি পরেছে অল্প সাজ দিয়েছে অনিম অবাক। মা কোথায় যাচ্ছো?
তোমার মিমি আন্ট যেতে বলেছেন বাবা। রিকশা থামিয়ে সরের সন্দেশ নিও তো তার জন্য।

প্রতিবার মাকে দেখার আগের দিন অনিমের সাথে প্রয়োজনীয় সিটিং দেন ডাক্তার মিমি। মায়ের সামনে অনিমের কথা বলা নিষেধ। ইনফ্যক্ট অনিম সামনেই থাকে না।আগে থেকে অনিম কে আলাদা ডেকে নিয়েই মায়ের ইদানিং আচরণের বিবরণ নেন এবং রেকর্ড রাখেন । তিনি বলেন মনের এলোমেলো আচরণের নানা ব্যখ্যা আছে। অপরাধ প্রবণতা আছে। ডিমেন্সিয়া আছে।

অনিম মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে ফেলে , মা কি আমার কথাগুলোই বলেন, নাকি অন্যরকম কিছু বলেন ? মিমি হাসেন। বলেন পেশেন্টের কথা আমরা ডিসক্লোজ করিনা । ধৈর্য্য রাখো।

বছর খানেক আগে অনিম ধরতে পেরেছিলো মায়ের ডিপ্রেশনটা। বাবা কে জানালেও কোন কাজ হয়নি।তিনি নতুন সংসারে নতুন সন্তানের পিতা হয়েছেন। ফেসবুকে সেই শিশুর শ’’য়ে শ’য়ে ছবি আপলোড করছেন। এসময় কে যেচে ঝামেলা নেয়।

মায়ের মনের এটাই সমস্যা যে , তিনি ভয় পান। স্বাভাবিক ভয় নয়। মায়েরা সাধারণত ছেলের চলাচল, রাস্তাঘাট, হাইজ্যকিং এসব নিয়ে টেনশনে থাকে ভয় পায়। কিম্বা কি নিয়ে যে ভয় পান সেটা নিজেও শিওর না। হঠাৎ ভয় পেলেন যে রান্নাঘরে কোন কালো বিড়াল লুকিয়ে আছে। কিম্বা জানালা দিয়ে কেউ জ্বলন্ত সিগারেট ফেলবে গায়ে।

মা অনিমকেও ভয় পান। ক্লাসে গেলে ভাবে তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। বাড়ি ফিরলেই অনিম মেরে ফেলবে তাকে। ফিরতে দেরি হলে কোন ভাবেই দরজা খুলবে না। অনেক কষ্টে গেট কিপার সেদিন মাকে অনুরোধ করে দরজা খুলিয়েছিলো।

অনিম অনেক রাত শুয়ে শুয়ে কেঁদেছে সেদিন। তার মাত্র ১৭ । মায়ের অসুস্থতায় অনিম কখন যেন ২৭ বছরে পৌছে গেছে। দ্রুত মায়ের দায়িত্ব নিতে শিখেছে সে।

প্রথম অনিম ভেবেছে বুঝি কোন ছবি দেখে বা অন্য কোন কারণে ভয় পেয়ে থাকবে।
হিস হিস শব্দে এক কথা বার বার বলছিলেন তিনি।‘
’ আমার ছেলে খুন করতে চায় । খুন করতে চায়।‘, আমাকে আমাকে ।’

অনিম পাত্তা দেয় নি।

গুগল সার্চ করে ডাক্তার মিমি শান্ত ভাবে অনিম কে তার মায়ের অসুখটা বোঝালেন। ডিপ্রেশনে থেকে থেকে ধীরে ধীরে মায়ের ‘বাইপোলার ডিসঅর্ডার ( bipolar disorder) হয়েছে। এসব রোগী অকারণে ভয় পায় , অস্বাভাবিক মাত্রার ভয়। সবাই নয়। নিজের আচরণের এই অসামঞ্জস্যতা মা নিজেই জানে না। তাই যখন তিনি সুস্থ থাকেন তখন আবার পুরোনো মা। এই মারছে তো সেই আদর করছে।

বেশ ভালো মুডে রান্না ঘরে গান ছেড়ে আয়েশ করে রাঁধতে লেগেছে মা। কত দিন পর অনিমের ভালো লাগছে। বাবা আলাদা হবার পর থেকে মা শখের সব রান্না ছেড়েই দিয়েছিলেন। অথচ তিনি কোন রান্না যে পারেন না সেটাই খুঁজে বের করার বিষয়।
কিছু ভেটকিমাছ ম্যরিনেট করে বেক করেছেন , মাংস চুলায় ভুনা হচ্ছে। ব্লেন্ডারে টক দই ,কাচাঁমরিচ ,পুদিনা পাতা এসব দিয়ে ভটভট শব্দ করে বোরহানি বানানো চলছে। আর সব ভর্তা আইটেম বাটিয়ে রেখেছেন বাসার সহকারী খালাকে দিয়ে।

আজ অনিমের বন্ধুদের খাওয়াবেন তিনি। অনেক দিন পর একথা তার মনে হয়েছে যে অনেক দিন অনিমের বন্ধুরা বাসায় আসে না।

বাথ্রুমে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে ম্যাথ করতে বসলো অনিম। পেন্ডিং কিছু কাজ আছে। বন্ধুরা এলে পড়া হবে না। কানে হেডফোন চাপিয়ে কাজ করতে লাগলো অনিম।

টানা পনেরো / বিশ মিনিট ধরেই এক কথা বার বার বলছেন। তোতলাচ্ছেন মা। মুখের লালা দিয়ে গাল ভিজিয়ে ফেলছেন। কাচের ঝনঝন শব্দ শুনে অনিম ছুটে গিয়ে মাকে ধরতে গেলেও মা অসুরের শক্তি নিয়ে এক ধাক্কায় তাকে দূরে ফেলে দিলেন। মাথায় আঘাত পেয়ে ব্যথা নয় অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো ছেলে। এই রকম এই প্রথম।

মা যেমনই হোক তার মা। তার আগোছালো ফ্যাকাশে জীবনের একমাত্র আনন্দ । ছুটন্ত স্পিডবোট । সারারাত তার সাথে জেগে থাকা মা। সারাদিন তার কাজে ছুটে বেড়ানো মা।

চোখের পানি মুছতে মুছতে দ্রুত ক্লিনিকে কল করে অনিম। দুপুরে বন্ধুদের আসার কথা। তাদেরকেও ফোন করে করে জানায়।
যত কিছু নিজের হাতে রেঁধে মা টেবিলে সাজিয়েছিলেন সব নিজেই টান মেরে মেরে ফেলে দিয়েছেন। মেঝেতে একাকার হয়ে আছে সাদা কাচের ক্রোকারিজ এবং রান্না সব্জীর রঙ।
এইসব খাবার নাকি অনিম বাইরে থেকে আনিয়েছে। এই সব খাবার খাইয়েই তাকে মেরে ফেলবে অনিম।
অস্বাভাবিক ভয়ের নিয়ন্ত্রণ জানা নেই মায়ের। তিনি এও জানেন না কখন কি ভেবে ভয় পাচ্ছেন।

দ্রুত মা’কে ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়ে গেছে। ডাক্তার মিমি এবং আরো তিনজন ডাক্তার আজ এক সাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । মা কিছু দিন ভর্তি থাকবে, তাকে পুরোপুরি ঔষধ থেরাপি এবং মেডিটেশনসহ ধাপে ধাপে ট্রিট্মেন্ট দেয়া হবে। দ্রুত এসব রোগী ভালো হয় না। সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে কখনই ভালো হয় না। অনিম চুপ করে থাকে। শব্দ না করে মা-মা বলে বেশ কিছুক্ষণ মা’কে ডাকে। মা তাকে গোল্লাবাচ্চা ডাকে সে গোল পুতুলের মতো সারাবাড়ি গড়াতো। মায়ের একটাই সফট টয় সে।

লাইব্রেরির জানালা দিইয়ে বাইরে ল্যম্পপোস্টের দিকে তাকিয়ে থাকে অনিম। বাতাসে ভেসে বেড়ায় অচেনা বাঁশির সুর। মন খারাপ করা। মাঝে মাঝে দুইএকজন পথচারী এসে বসে । ধূসর আলো ঘিরে আলোর পোকারা উড়ছে । হাজারো পোকার মিহি স্বরে জায়গাটা ভৌতিক হয়ে আছে। আঁধারে অনেক কিছুই বিনা কারণে ভয় তৈরী করে। আলোতে এক মূহুর্ত বাঁচেনা এসব কীট।আলোই বাঁচতে দেয়না কালোকে।

মাকেও আলোতে নিয়ে আসবে অনিম। মা তার সোনাপাখি ,খেলার পাজেল, এক পৃথিবী ।
দু’জন মিলে কুলফি খেতে খেতে তারা ছাদের ঘুরবে। বাইরে তাকিয়ে দেখবে খোলা হাওয়ার লোভ, নরম হলুদ রোদ, মেঘের চকিৎ আনাগোনা ঝপঝপ বৃষ্টি।

তখন ছোটবেলায় ফিরে যাবে। ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে আঁধার আকাশ থাকতেই প্রভাত ফেরিতে যাবে খোলা পায়ে। মায়ের গলায় থাকবে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো গান। মায়ের পরনে থাকবে কালো পেড়ে সাদা টাঙ্গাঈল। গলায় একে একে চলতে থাকবে ভাষা ডাকা গান, মিছিলের গান। বাবা-মায়ের নাকি এই পথেই দেখা হয়েছিলো। পথ মিলতেও সময় লাগে না ঘুরতেও। পথ নিজেই জানে না পথ কোথায় যায়।
বুকের কাছে এক গোছা সাদা রঙ ফুল ধরে থাকবে তার সাদা রঙ মায়ের।
মায়ের নামটাও কী সুন্দর শুভ্রা শর্মিষ্ঠা।

মা নেই আজ বাড়িতে । অনিমও আজ ফিরবে না। তাকে বন্ধুরা নিতে আসবে । রৌদ্রের বাসাতেই থাকবে সে কিছুদিন। মা ছাড়া একলা গোটা রাত তার ভয় করে।