অন্য মা....

স্বপন রায়



#
পয়লা নভেম্বর ১৯৫৫ থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৭৫ পর্যন্ত চলেছিল ভিয়েতনামের যুদ্ধ।সায়গনের পতন ওই দিনেই হয়েছিল।
#
এবার তথ্যের বাইরে যে অনিবার্য সমাপতন আছে দেখা যাক তারা কোথায় কিভাবে মেলাচ্ছে, ভাঙছে, এক বিধ্বস্ত দেশের সামাজিক আবহাওয়াকে।সেই আবহাওয়ায় যথারীতি ছিল ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। চরম হিউমিডিটি। প্রখর গ্রীষ্মের কষাঘাত।পুরুষ,মহিলা। শিশুরা। কুড়ি বছর ধরে চলা যুদ্ধে প্রাণ গেছে কুড়ি লক্ষ মানুষের।তিন লক্ষ পঙ্গু হয়েছে।আর অনাথ হয়েছে হাজার হাজার শিশু।সায়গন থেকে পাততাড়ি গোটাচ্ছে আমেরিকানরা।
#
একটি মেয়ে, ছাব্বিশ বছর।নাম দিচ্ছিনা। সেইসময় মেয়েদের বিয়ের বয়স ছিল ষোলো থেকে কুড়ি।আক্ষরিক অর্থেই কুড়ি পেরোলে বুড়ি, বিয়ের পাত্র পাওয়া যেতনা!দীর্ঘ সময় ধরে চলা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধে ভিয়েতনামের মহিলারা গেরিলা যুদ্ধে সরাসরি যোগ দিয়েছিল।মৃত্যু হয়েছিল। তার সংখ্যা এতটাই যে পুরুষ নারীর অনুপাত বিগড়ে যায় মারাত্মকভাবে।
#
যুদ্ধের পরে যেসব মেয়েদের বয়স বাইশ বা তারো বেশি তারা একা হতে শুরু করলো।বিয়ে হবেনা, পুরুষের চোখে সে তখন বৃদ্ধা।অনেকেরই পরিবার বিধ্বস্ত।ওল্ড এজ হোম ভিয়েতনামের দস্তুর নয়। তাহলে?
#
ছাব্বিশ বছররের সেই মেয়েটি তার পরিবারকে কিছু বলল।
পাহাড়ের গায়ে গ্রাম। পাহাড়ের গায়ে ঝর্না। নাপাম বোমার ধোঁয়া যেন, পড়ছে পাহাড়ের মাথা থেকে। মৃত্যু তখনো যে কোন উদয়ে, যে কোন অস্তে। মেয়েটি আবার বলল একই কথা।ব’লে বেরিয়ে এল। তারই মত আরো কিছু একা, সবহারানো মেয়েরা। মেয়েটি তাদের কাছে গেল। তাদের বলল, যা সে তার পরিবারকে বলেছে...
#
আজ যদি সেই গ্রামে কেউ যান দেখতে পাবেন ষাটোর্ধ বেশ কিছু মহিলা নাতি, নাতনিদের নিয়ে খেলায় ব্যস্ত। কেউ হাসছে। কেউ গাইছে। দূরের খেতে কাজ করছে খড়ের টুপি পড়া পুরুষ, মহিলারা। সে অনেকদূরে। তাদের ধারে কাছে কোন পুরুষ নেই। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে তারা অস্বীকার করেছিল কোন পুরুষকে সারাজীবনের জন্য গ্রহণ করতে।
#
চল্লিশ বছর আগে, বিধ্বস্ত ভিয়েতনামের আরো বিধ্বস্ত সামাজিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে গিয়ে সেই ছাব্বিশ বছরের মেয়েটি বলেছিল,সে বিয়ে করবে না। যে সমাজে মেয়েদের কুড়ি পেরোলেই বৃদ্ধার তকমা দেয়া হয়, প্রত্যাখান করা হয়, সেই সমাজের কোন পুরুষকেই সে বিয়ে করবে না।
#
কিন্তু, সে মা হবে। সন্তান ধারণ করবে। যে সন্তান এবং সন্ততিরা বৃদ্ধ পিতা, মাতাকে ভিয়েতনামের সামাজিক রীতি অনুযায়ি দেখভাল করতে বাধ্য!পরিবার, মেয়েটির, সেই ছাব্বিশ বছরের মেয়েটির আকাশ থেকে পড়েছিল।
#
দশলক্ষ মৃত মানুষ আর তিনলক্ষ বিকলাঙ্গর দেশে তখনো মেয়েরা, যারা বিপ্লবে অংশ নিয়েছে, মৃত্যুবরণ করেছে, বেঁচে গেছে যুদ্ধজয় ক’রে তারা সমাজের বিরুদ্ধে আরেক যুদ্ধ শুরু করলো।
#
মেনে নইতে বাধ্য হল পরিবার।তাদের জানা ছিল ছাব্বিশ বছরের এই মেয়েটি যখন বৃদ্ধা হবে, তাকে কেউ দেখবে না। পরিস্থিতি বাধ্য করল তাদের।মেয়েটি মা হল।পুরুষের ভূমিকা এতটাই। কোন ইমোশনাল সম্পর্ক নয়। মেয়েটি ছেঁটে ফেলে দিল পুরুষের বাবাতন্ত্রকে।সেই মেয়েটির পরে পুরো ভিয়েতনাম জুড়ে আরো অনেক মেয়ে।বাইশ, তেইশ,চব্বিশ, পঁচিশ,ছাব্বিশ, সাতাশ, আঠাশ....সিঙ্গল মাদার....তাদের পুরুষ চাইনা।যে পুরুষ সমাজের দোহাই দিয়ে একুশের মেয়েকে বৃদ্ধা বানিয়ে দেয় সেই পুরুষকে উৎপাদন যন্ত্রে পরিনত করল ভিয়েতনামের মেয়েরা।আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে।
#
১৯৮৬ সালে ভিয়েতনামের সরকার এই অন্য মায়ের একাত্বকে স্বীকৃতি দিল।সম্মান জানালো।বিপ্লবের পরেও যে বিপ্লব জারী থাকে, প্রমাণ করেছিল ভিয়েতনামের বিপ্লবী মেয়েরা!
#
মায়েরা...