বর্ণচোরা

কৌশিক দত্ত



যেই না বাবলি দোকানটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, অমনি যেন মাটি ফুঁড়ে উঠল লোকটা। বাবা লোকটাকে খেয়াল করেছে বলে মনে হল না,কিন্তু তার মুখের রেখায়, চোখের তারায় এমন এক রূপকথা ছিল, যা বাবলিকে টেনে নিল নিজের দিকে। অনেকদিন ধরে চাইছিল সে একটা প্লে স্টেশন। পরীক্ষা ভালো হওয়ায় আজ বাবা কিনে দেবে সেই স্বপ্ন। এমনিতে বায়না করলেই নানা জিনিস কিনে দেয় বাবা। কাজের তালে বাইরে বাইরে থাকে, সময় দিতে পারে না, বদলে মেটায় হরেক কিসিমের আবদার। ক্ষতিপূরণ। কিন্তু পরীক্ষার আগে মায়ের প্রবল আপত্তিতে প্লে স্টেশন বাড়িমুখো হতে পারেনি। আজ বাবলি তার কাছে এসেছে বাবার সাথে। বড় হলে নিজের পকেট থেকে ফটাফট টাকা বের করে দুনিয়ার সেরা ভিডিও গেমস কিনে ফেলবে, কারো কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতে হবে না... এইসব ভাবছিল কদিন ধরে। অথচ এখন সেই প্রিয় যন্তরের খুঁটিনাটি মন দিয়ে দেখবে কি, বার বার চোখ চলে যাচ্ছে আজব লোকটার দিকে।

অন্য কেউ নজর করছে না মানুষটাকে, বাবলি দেখল। এমনিতে জামা-কাপড় ঠিক-ঠাক। দাড়ি কেটেছে বোধহয় পরশুদিন। পায়ের জুতোটা পালিশ করা হয়না নিয়মিত। চশমাটা চোখে নেই, জামার বুক-পকেট থেকে ঝুলছে। চোখদুটো এত উজ্জ্বল যে বিশ্বাসই হয়না সেই চোখের কোনো চশমা প্রয়োজন হতে পারে। কী এক বিচিত্র কৌতুক সেই চোখে! বাবলির সাথে চোখাচোখি হতেই একবার ভুরু নাচিয়ে এক ঝলক হাসি ছুঁড়ে দিল লোকটা। বাবলি মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর যতবার সেদিকে তাকায়, দেখে চোখদুটো হাসছে। কী কিনতে যে এসেছে লোকটা, বোঝার জো নেই। দেখছে এটা সেটা, কিন্তু দাম জিজ্ঞেস করছে না কিছুরই, এমনকি ছুঁয়েও দেখছে না কোনো জিনিস। শেষে এসে দাঁড়াল তাদের ঠিক পিছনে ক্যাশ কাউন্টারের কাছে। বাবা তখন সবে বিল মেটানোর তোড়জোড় করছে। লোকটা বাবার কাঁধের ওপর হাত রাখল।
- কিছু বলবেন?
- না না, আপনি কিনুন যা কিনছেন।
- তাহলে ডাকলেন কেন?
- ডাকলাম? কই না তো!
- তাহলে গায়ে হাত দিলেন যে! অচেনা লোকের গায়ে হাত দেন নাকি দুম করে?
- ওহো! ভুল হয়ে গেছে। আচ্ছা, আমি সরে দাঁড়াচ্ছি।

বাবলি একবার লোকটাকে আর একবার বাবাকে দেখে। বাবার মুখে ভ্রূ কোঁচকানো বিরক্তিটা লেগে রইল, কিন্তু অভ্যস্ত হাত চলে গেল পকেটে আর সেখান থেকে বেরিয়ে এল পেটমোটা মানিব্যাগ। যাক, লোকটা পকেটমার নয়, অথবা হলেও নিতে পারেনি কিছু, এই ভেবে বাবার মুখে একটা প্রশান্তি ফুটে উঠছে, বাবলি খুব মন দিয়ে দেখল। বাবার কপালের ভাঁজগুলোর উপর দিয়ে কে যেন আলতো করে ইস্তিরি বুলিয়ে দিল। আজকাল বাবলি এসব লক্ষ্য করে আর মানুষকে তার খুব মজাদার এক প্রাণী বলে মনে হয়, প্রায় বেড়ালছানার মতো।

কিন্তু কপালের ভাঁজ ফিরে এল অচিরেই। মানিব্যাগ খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল আধময়লা একতাড়া কাগজ। টাকার নোটের মতোই আয়তাকার দেখতে তারা, কিন্তু এপিঠ-ওপিঠ কোথাও কিছু ছাপা নেই। মোটাসোটা মানিব্যাগের দাম হঠাৎ একেবারে শূন্য। এই ভানুমতির খেল দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। দোকানের ক্যাশিয়ার হাঁ করে চেয়ে রইল খদ্দেরের মুখ আর মানিব্যাগের দিকে। বাবলির বাবা এতটাই হতভম্ব, যে রেগে যাবার শক্তিও নেই। বাবলি চট করে ঘুরে তাকাল সেই লোকটার দিকে। চোখদুটো তখনো হাসছে। কেমন করে যেন বাবলি বুঝতে পারে, এ সবই এই বিদ্ঘুটে লোকটার ম্যাজিক।

দোকানের বাইরে বেরোতে বেরোতে বাবলি তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে। যেন তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে লোকটা নিজের পকেট থেকে বের করে এক মানিব্যাগ, তার ভেতর থেকে বেরোয় ধপধপে সাদা কয়েকটা কাগজ। সেই কাগজগুলো দুই আঙুলে ঘষতে থাকে সে, আর ধীরে ধীরে রঙ বদলে তারা হয়ে ওঠে কড়কড়ে টাকার নোট। সেই টাকাগুলো বাড়িয়ে ধরে বাবলির পছন্দ করা প্লে স্টেশনটা কিনে নেয় লোকটা। ইস্! বাবা হাত ধরে টানায় বাড়ির দিকে হনহনিয়ে হাঁটা দিতে হল, দেখা হল না সেই বিচিত্র আগন্তুক কোন দিকে যায়।

রাস্তায় একটাও কথা বলেই বাবা আর মেয়ে। বাবার পকেটে এখনো সেইসব কাগজেরা, বাপ-বেটির মনেও তারা। দুজনেই ভাবছে, কেমন করে হল? বাবলি ভাবে কী করে ম্যাজিকটা করল বাবার কাঁধটুকু ছুঁয়েই? বাবা ম্যাজিকে বিশ্বাস করতে ভুলে গেছে, বড় হলে নাকি এরকম হয়। বাবা ভাবছে, কে চুরি করল?

তার পর নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক। দৃশ্যপট বাবলিদের বাড়ি। কোনক্রমে জুতো খুলে সোজা শোবার ঘরে গিয়ে আলমারির দ্বারস্থ বাবলির বাবা। বাবলি আর তার মাও একটু বাদেই ছুটে গেল আর্তনাদ শুনে। আলমারির দরজা হাট করে খোলা। খোলা রয়েছে তার লকার। ছড়িয়ে রয়েছে কয়েক বাণ্ডিল কাগজ। ছোট-বড় নানা মাপের কাগজের আয়তক্ষেত্র, কোনোটা একেবারে সাদা, কোনোটা সামান্য ধূসর, কিন্তু কারো গায়ে কিছু লেখা, আঁকা বা ছাপা নেই। একটা কাগজের তাড়া হাতে নিয়ে স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে দেখে চমকে উঠল বাবলি। এই কাগজগুলো বাবার টাকা ছিল? কে যেন রবার দিয়ে তাদের সব দাম মুছে দিয়েছে!

বাবাকে এভাবে দেখেনি কখনো বাবলি। পাগলের মতো এদিক-সেদিক হাতড়াচ্ছে লোকটা। ড্রয়ার, তোষকের তলা, পুরোনো ব্যাগ, সবকিছুর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে গোছা গোছা সাদা কাগজ। ঘামতে শুরু করে মানুষটা। ধপ করে বসে পড়ে বিছানায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে কোটরে ঢুকে গেছে তার চোখদুটো, যেন তার সব আলো, সব হাসি চলে গেছে দোকানে দেখা সেই লোকটার চোখে, ঠিক যেমন এ বাড়ির টাকাদের শরীর থেকে সব রঙ, সব লেখা চলে গেছে সেই লোকটার সাদা কাগজগুলোর গায়ে। এমনকি প্লে স্টেশনটাও চলে গেছে তার কাছে। কী করবে লোকটা খেলার যন্ত্র নিয়ে? বড়রা কি খেলে? বাবা তো খেলে না কখনো, শুধু কাজ করে। কী কাজ, তা অবশ্য বাবলি জানে না। এটুকু জানে যে তার বাবা খুবই কাজের মানুষ, সর্বদা ব্যস্ত। কিন্তু ঐ লোকটা তো খেলাই করছে সকাল থেকে!

বাবার অবস্থা দেখে মা এগিয়ে এসে তার মাথাটা বকে টেনে নেয়। দিন তিনেক বাবা-মায়ের মধ্যে প্রায় কথাই হচ্ছিল না কোনো কারণে। এখন আবার দুজনকে কাছে আসতে দেখে বাবলি খুশি হয়। যাক, একটা ভালো অন্তত হয়েছে টাকাগুলো উবে গিয়ে।

মা জড়িয়ে ধরতেই বাবা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। “কী হবে এবার?”
“তুই ও ঘরে যা বাবলি,” মা বলে।

পাশের ঘরে গিয়ে বাবলি ভাবতে থাকে, কী অদ্ভুত কাণ্ড! এভাবে সব ভ্যানিশ! কাগজগুলো আছে, উবে গেছে শুধু তাদের মূল্য। সারা জীবন অসম্ভব পরিশ্রম করে বাবা এই কাগজগুলো রোজগার করেছে। বাবলির মনে হয়, আসলে কাগজের গায়ের আঁকিবুকি নয়, বাবার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে অনেকটা সময়। কোনোদিন বাবাকে তেমনভাবে পায়নি বাবলি। তিন্নির বাবা রোজ বিকেলে বাড়ি ফিরে আসেন তাড়াতাড়ি। ওদের বাড়িটা ছোট, আসবাব-পত্র সামান্য। কিন্তু ওরা হাসিখুশি। বাবালিদের বাড়িটা বড়, সুন্দর করে সাজানো, তবু কেমন যেন ছন্নছাড়া। কী যেন নেই! খুব দামি চিকেন বিরিয়ানিতে নুন কম হয়ে গেলে যেমন হয়। এতদিনে বাবলি বুঝতে পারে কেন তার মন খারাপ করত সন্ধে হলেই। বাবা তার জীবনের সবটা সময় দিয়েছে এই কাগজগুলোকে, যেসব কাগজ আজ রঙ বদলে ধোঁকা দিয়েছে বাবাকে। বাবলি আবার বাবা-মার শোবার ঘরে যায়। জড়িয়ে ধরে বাবাকে। “কিছু ভেবো না বাবা, আমার গেমস চাই না।“ বাবা আর মেয়ে পরস্পরের চোখ মুছিয়ে দেয়। তিনজন মানুষ তিনজন মানুষকে আঁকড়ে ধরে, ধরে থাকে অনেকক্ষণ। ক্রমশ তারা একটা পরিবার হয়ে ওঠে, যাদের অনেক অনেক টাকা হঠাৎ হারিয়ে গেছে, কিন্তু যারা নিজেদের খুঁজে পেয়েছে টাকা খুঁজতে গিয়ে।

নিজের ঘরে গিয়ে ছবি আঁকতে বসে বাবলি। একটা নিরিবিলি গ্রাম, কয়েকটা কলাগাছ আর তার পিছনে ছোট্ট একটা বাড়ি। পাশে পুকুর। পুকুরপাড়ে একটা ছোট মেয়ে। পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা।

“আরে! আশ্চর্য!” পাশের ঘরে জোরে বলে ওঠে মা।
“কী হল আবার?” বাবার গলা।
“দেখো এসে।“
বাবালিও দৌড়ে যায়। দেখে সব কাগজের তাড়াগুলো আবার রঙিন হয়ে উঠেছে। আবার তারা মূল্যবান। কিন্তু বাবা আর সহসা ফিরে পাওয়া টাকাদের দিকে ছুটে যায় না, মাটি থেকে তাদের কুড়িয়ে নিতে তাড়াহুড়ো দেখায় না। বদলে মেয়েটে টেনে নেয় কাছে। আবার একবার আদর করে তাকে।
“বেড়াতে যাবি?”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে মেয়ে।
“চল যাই। তোর স্কুল ছুটি হলেই। অনেক দূরে কোথাও যাব বুঝলি! তুই তো পাহাড় আঁকিস খুব। চল, পাহাড়ে যাই।“
বাবা এত কথা বলে? বাবা পাহাড় ভালোবাসে?

খুশি আর অবাক হয়ে ফিরে আসে বাবলি। এসে দেখে, ওমা, সেই প্লে স্টেশন তার টেবিলের ওপর গ্যাঁট হয়ে বসে! সেই লোকটা তাহলে!

টেবিলের দিকে যায় না বাবলি। এখন, এই মুহূর্তে, নতুন গেম তাকে টানে না। বোধহয় আর ততটা দরকার হবে না এসব যন্ত্রপাতি। আজ সারাদিনে সে পেয়ে গেছে আরো অনেক কিছু। আঁকার খাতাটা তুলে নেয় বাবলি। ছবিটা শেষ করতে হবে। পুকুরপাড়ে একটা মেয়ে। পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা, তার ডান হাত মেয়েটার কাঁধের ওপর। দুজনে মিলে কী যেন দেখছে পুকুরে জলে! হয়ত সেখানে ছায়া ফেলছে সম্পূর্ণ একটা আকাশ!