যেখানে ভূতের ভয়

নীতা মণ্ডল



(১)
গোগোল, টিন্টো আর তিতলির খুব মজা। কাল বিকেলে পার্কে খেলতে গিয়ে ওরা খবরটা পেয়েছে। আনন্দে আজ আর ইশকুলে মনই বসছে না। তিতলি তো ক্লাস টিচারের কাছে ধমকও খেল। কী যে করে বেচারা! কেবল ভালোদাদুর মুখটা মনে পড়ছে ওর। ম্যামের কথা কানে ঢুকবে কেমন করে! ম্যামকেই বা ও কী করে বোঝাবে ভালদাদু মানে কী!
ভালোদাদু হল ঋভুর দাদু। শান্তিনিকেতনে থাকেন। মাঝে মাঝেই ঋভুদের বাড়ি আসেন। বিকেলবেলা এক হাতে ট্যারাবাঁকা একটা ছড়ি আর অন্যহাতে ঋভুকে ধরে পার্কে বেড়াতে আসেন। ছড়িটা পাইন গাছের ডাল দিয়ে তৈরি। হিমালয়ে বেড়াতে গিয়ে কুড়িয়ে এনেছিলেন। ওই ছড়িই যমুনোত্রী যাওয়ার পথে দাদুর সহায় ছিল। হিমালয় থেকে ফিরে ছুতোর মিস্ত্রীর কাছে ডালটার একপ্রান্ত থেকে ইঞ্চি ছয়েক কেটে, সেটা দিয়ে একটা হ্যান্ডেল বানিয়ে নিয়েছেন। দাদুর সেই হিমালয় ভ্রমণের গল্প যে কী সাংঘাতিক রোমহর্ষক! ‘রোমহর্ষক’ শব্দটা ভালোদাদু ওদের মুখস্থ করিয়েছিলেন। ইশকুলে যেরকম ম্যাম স্পেলিং মুখস্থ করান। ওরা বলেছিল, ‘টাফ ওয়ার্ড, তার চেয়ে ‘এডভেঞ্চারাস’ ইজি।’ শুনে ভালোদাদু বলেছিলেন, ‘বাঙালি হয়ে যে বাংলা শব্দ উচ্চারণ করতে পারবে না, তার সঙ্গে আমার আড়ি।’ ‘ভালোদাদুর সঙ্গে আড়ি!’ একথা যে ওরা কেউ ভাবতেও পারে না।
পার্কের এক কোণে একটা বড় বকুল গাছ। গাছটার চারিপাশ বাঁধানো। সেদিকে ভালোদাদু আর ঋভুকে আসতে দেখল ওরা। তিতলি দোলনা ছেড়ে, মাঙ্কিবার ছেড়ে গোগোল আর সি-স এর অপরপ্রান্তে বসে থাকা বন্ধুকে নস্যাৎ করে দিয়ে লাফিয়ে নামল টিন্টো।
ভালোদাদু বকুলগাছের গোঁড়ায় লাঠিটা নামিয়ে রেখে গুছিয়ে বসলেন। ঋভু বরাবরের মত লেপ্টে গেল দাদুর ডানদিকে। মুখে একটা অহংকারের দীপ্তি। ভাবটা, ‘ইনি আমার দাদু। এমন সম্পদ আছে তোদের?’ দাদুর বামদিকটা তিতলির দখলে। ভালোদাদু ওকে ডাকেন ‘রাঙ্গাদিদি’। গোগোল আর টিন্টো, তিতলি আর ঋভুর পাশে জায়গা করে নিল। তারপর চারজনেই বায়না ধরল, গল্প শুনব।
ভালোদাদু কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে বললেন ‘তাই তো, কি গল্প শোনান যায়! শোন, তখন সবে আমি ইশকুলের মাস্টারিতে ঢুকেছি...’
তিতলি ভালোদাদুর মুখে হাত দিয়ে থামিয়ে দিল। লম্বা আর সরু একজোড়া বেণী দুলিয়ে বলল, ‘না তোমার চাকরির গল্প শুনব না। অন্যকিছু বল। বল না, প্লিজ-প্লিজ-প্লিজ ভালোদাদু।’
গোগোল বলল, ‘দাদু তুমি যখন আমাদের মত ছোট ছিলে, স্কুলে যেতে। তখনকার গল্প বল। তোমাদের স্কুল কেমন ছিল। ম্যামরা কিভাবে পড়াতেন। পড়া না পারলে কি পানিশমেন্ট দিতেন...’
টিন্টো ভালোদাদুর সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘তখন ম্যামরা পড়াতেন না, আমি জানি। ম্যামের হাজবেন্ডরা পড়াতেন। অবশ্য মেয়েদের ইশকুলে দিদিমনি ছিলেন, তবে সে আর কজন! নামমাত্র, হাতে গোনা। আমাকে আমার ঠাম্মি বলেছে।’
ঋভু ঘেঁষতে ঘেঁষতে ভালোদাদুর কোলে উঠে পড়ল। দুহাতে দাদুর কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি কিন্তু ভূতের গল্প শুনব না। আমার খুব ভয় করে। জান, একদিন লাইট নেই। চারিদিক অন্ধকার। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। মা বলল, এই সময় ভূতের গল্প যা জমবে না! আমি বললাম, আমি ভূতের গল্প শুনব না। মা বলল, ঠিক আছে শুনতে হবে না, কিন্তু তুই যদি এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখিস আমার মুখটা ভূতের মুখ হয়ে গিয়েছে কি করবি? জানো দাদু, আমি খুব কেঁদেছি তাই শুনে! মা যদি সত্যি ভূত হয়ে যায়, আমার কি হবে? কে আমাকে হোমওয়ার্ক করিয়ে দেবে! কে টিফিন বানিয়ে দেবে! কে রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেবে! কে আদর করবে!’
ঋভুর কান্না কান্না মুখে ভালোদাদু চুমু খেয়ে বললেন, ‘দাঁড়াও তোমার মাকে মজা দেখাচ্ছি। আজ তাকে এমন পানিশমেন্ট দেব!’
মায়ের পানিশমেন্টের কথা শুনেই মজা লাগল ঋভুর। ও কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই গোগোল বলল, ‘কী পানিশমেন্ট দেবে গো ভালোদাদু? এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি কান ধরে উঠবোস?’
ভালোদাদু বললেন, ‘কিন্তু তার আগে তোমাদের একটা জিনিস জানা দরকার।’
‘কী ভালোদাদু?’ সকলে মিলে এক সুরে প্রশ্ন করল।
‘ভূত বলে কিছু হয় না। ও সবই হল মানুষের ভয় আর মনের ভুল।’
কী মনে করে ভালোদাদু খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি তাহলে একটা ভূতের গল্পই বলব আজকে।’ তারপর গোগোলের দিকে এক ঝলক চেয়ে নিয়ে বললেন, ‘তোমার মন খারাপ করার কিছু নেই দাদুভাই। গল্পটা কিন্তু আমাদের ইশকুলে পড়ার সময়কার।’ ঋভুর চুলটা ঘেঁটে দিয়ে বললেন, ‘ভূত বলে যে আসলে কিছু হয় না, এ হল সেই গল্প। তাহলে একই গল্পে ভূতের গল্পও হল, আমাদের ছোটবেলার গল্পও হল আবার ভূত যে নেই তার প্রমাণও হল।’
টিন্টো দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘বুঝেছি, বুঝেছি। অল ইন ওয়ান।’
ভালোদাদু টিন্টোর গাল টিপে দিয়ে গল্প শুরু করলেন।
(২)
আমরা তখন ইশকুলে পড়ি। তবে তোমাদের মত এত ছোট নই। উঁচু ক্লাস, এই ধর নাইন টেন। আমাদের গ্রামে তো ইশকুল ছিল না। যেতে হত ন-কিলোমিটার দূরে লাভপুরে। গ্রামের ক’টা ছেলেই বা তখন লেখাপড়া করত? কেউ কেউ প্রাইমারীতেই গুটিয়ে দিত। আর কেউ বড়জোর এইটপাস। ওই হাতে গোনা দু-চারজন কলেজ টলেজ যেত। তো যাই হোক, ম্যাট্রিক দেব তাই বাবা ইশকুলের বোর্ডিঙে রেখে এলেন। আমার মত দূরের গ্রাম থেকে আসা আরও জনা পাঁচেক ছেলে থাকে ওই বোর্ডিঙে। সে বোর্ডিং আবার তোমাদের আজকালকার হোস্টেলের মত ছিল না। ইশকুল লাগোয়া দুকামরা মাটির বাড়ি। মাথার উপর খড়ের চাল। আমরা ছয় জন থাকি। এক একটা ঘরে তিনজন করে। সামনেই মাটির দাওয়া। পড়তে বসা বল, খেতে বসা বল বা গল্পগুজব সবই সেই দাওয়ায় চাটাই পেতে। দাওয়া লাগোয়া রান্নার চালা। একফালি উঠোনও ছিল বোর্ডিঙে। ছিল বেশ কিছু ফুলের গাছ। যেমন ধর নয়নতারা, করবী, জবা এইসব। পাশের বাড়িতেই সপরিবারে থাকতেন পন্ডিত মশাই। ফুলের গাছগুলো ওনার স্ত্রীর যত্নেই বেঁচে ছিল। একজন মাসি এসে ঘরদোর পরিষ্কার করে, পন্ডিত মশাইয়ের ঘর থেকে কলের জল এনে দিয়ে যেত। আর রান্নার জন্যে ঠাকুর আসত দুবেলা। খাওয়াদাওয়ার দিকটা হেড মাস্টারমশাই নিজে দেখতেন। ভীষণ রাশভারী, রাগী আর পন্ডিত মানুষ। কোনরকম বেচাল দেখলেই গার্জেন কল আর বাড়াবাড়ি হলেই টি সি।
‘টি সি... টি ফর টিচার, সি - সি - সি কি দাদু?’ তিতলি প্রশ্ন করে।
‘না গো রাঙ্গাদিদি টি ফর ট্রান্সফার আর সি ফর সার্টিফিকেট। মানে হল, ক্লাস থেকে নাম ঘ্যাচাং।’ ভালোদাদু আঙ্গুল দিয়ে ক্রস চিহ্ন এঁকে বুঝিয়ে দেন।
আমাদের মধ্যে শিবু, মানে শিবশঙ্কর ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সাহসী আর দরদী ছেলে। তবে দুষ্টু বুদ্ধিতেও কম যায় না। এই ধর সরস্বতীপুজোর আগের রাতে ফুল চুরি করা, লোকের বাগান থেকে আম, জাম, নারকেল চুরি করায় একেবারে সিদ্ধ হস্ত। হাতে নাতে কেউ ধরতে না পারলেও, শিবুর উৎপাতের চোটে একদিন আমাদের বোর্ডিঙের দুর্নাম রটল। তাতে হেডমাস্টারমশাই করলেন কি, রাতেরবেলা একবার দেখতে আসা শুরু করলেন। সারপ্রাইজ ভিজিট। শিবু বিছানায় লম্বা করে পাশবালিশ শুইয়ে তার উপর লেপ চাপা দিয়ে বের হত। হেডমাস্টার এসে ছড়ি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখতেন। আমরা খোঁচা খেয়েও চুপচাপ পড়ে থাকতাম। শিবুর বিছানাতেও বালিশ চুপ। মাস্টারমশাই সন্দেহ না করে বেরিয়ে যেতেন।
এই শিবুর আবার রান্নার লোক মাধাইঠাকুরের সঙ্গে খুব ভাব ছিল। ঠাকুর খুব শুদ্ধাচারী মানুষ ছিলেন।
শব্দটা মনে রাখ, ধরব। ‘শুদ্ধাচারী’।
কুলীন ব্রাহ্মণ বলে মাধাইঠাকুরের ছিল খুব অহংকার। হাঁটুর উপর সাদা ধুতি আর গায়ে একটা সুতির চাদর জড়িয়ে আসতেন। মাথায় ছিল ইয়াব্বড় একটা টিকি। সেখানে কখনও কল্কে ফুল কখনও গাঁদা ফুল বাঁধা থাকত।
ঠাকুর রান্না শুরু করতেন আর শিবু মোড়া নিয়ে বসে থাকত রান্নাচালার সামনে। তরকারির নুনটা, ঝালটা চেখে দেখত আর ঠাকুরের কথা শুনত। ঠাকুরের হাত চলত, মুখও চলত। গল্পের বেশির ভাগই ওনার বাহাদুরির কাহিনী। আশপাশের পাঁচটা গ্রামে অসংখ্য যজমান বাড়ি ওনার। ফলে নিত্য নতুন গল্পের অভাব নেই। শিবুর মত আমরাও মাধাইঠাকুরের ভক্ত হয়ে গেলাম। অমন জ্ঞানী, সাহসী তোমাদের কথায় ‘হিরো’ বলে কথা! তার গল্প শুনতে ইচ্ছে করবে না? তারপর এই যেমন তোমরা আমাকে ঘিরে বসে আছ, আমরাও তেমনি মাধাইঠাকুরকে ঘিরে বসে যেতাম গল্প শুনতে।
মাধাইঠাকুরের বাড়ি ছিল লাভপুরের কাছেই পশ্চিম কাদিপুর মানে কাদপুর গ্রামে। লাভপুর আর কাদপুরের মাঝে একটা মাত্র গ্রাম, মসতল। এটুকু রাস্তা উনি দিনে দশবার হেঁটে যাতায়াত করতেন। মসতলের শেষ সীমানায় ছিল একটা বিশাল বট গাছ। আর তারপরেই মাঠ। ক্লান্ত মানুষজন ওই গাছের তলায় বসে বিশ্রাম নিত। আমরাও বাবা কাকাদের সঙ্গে লাভপুরের হাটে এলে কত বার ওই গাছের তলায় বসে জিরিয়ে নিয়েছি। চপ মুড়ি খেয়েছি। মাধাইঠাকুরের মুখে শুনলাম, দিনের বেলা গাছটা যতই নিরাপদ হোক, রাতে কিন্তু ভয়ানক।
‘কি রকম?’
মাধাইঠাকুর বললেন, ওই গাছে একটা ভূত বাস করে। সে অ-নে-ক বছর আগের কথা। ওদের গাঁয়ের একটি ছেলে বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে ওই গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে মারা যায়। অপঘাতে মৃত্যু, তাই তার অতৃপ্ত আত্মা ওখানেই আশ্রয় নিয়েছে। সন্ধ্যের পর ওইদিকে গিয়েছ কি আর রক্ষে নেই। এই করে কতজনের যে সর্বনাশ হয়েছে, হিসেব নেই। ঠাকুর নিজেই কতজনকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছেন! তাদেরকে সুস্থ করে নিজে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন। কারোর তো ভূত দেখে মাথাটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে।
শিবু বলল, ‘কিন্তু তুমি তো প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা ওই পথ দিয়ে হেঁটে যাও। তোমার ভয় করে না?’
ঠাকুর নিজের টিকির ফুলখানা দুলিয়ে পৈতে বের করে কপালে ছুঁইয়ে বললেন, ‘আমি হলাম গিয়ে কুলীন বামুনের বেটা। গায়ত্রী মন্ত্র জপ না করে আমাদের তিন পুরুষের কেউ কোনদিন জলস্পর্শ করে নাই। আমাদের হাত ছাড়া গাঁয়ের বুড়ো শিব পুজো নেয় না। ভূত আসবে আমার সামনে?’
একদিন রাতে খেতে খেতে শিবু বলল, ‘তোরা ভূতে বিশ্বাস করিস? আর যদি ভূত থাকেই তাহলে মাধাইঠাকুর ব্রাহ্মণ বলে ওকে ছেড়ে দেয়। একথা বিশ্বাস করিস তোরা?’
আমদের চুপ করে থাকতে দেখে শিবু রেগে গেল, ‘তাহলে আমরা বিজ্ঞান পড়ে কি শিখলাম? শুধু তোরা বল কো-অপারেট করবি। দেখ আমি প্রমাণ করে দেব ভূত বলে কিছু নেই। আর ওই মাধাইয়ের বামনাগিরির দাম কানাকড়ি।’
শিবু আমাদের ফার্স্ট বয়। তাছাড়া ওরকম বুকের পাটা। আমাদের আর রাজী না হয়ে উপায় কী!
(৩)
দেখে শুনে অমাবস্যার রাতটাকেই বেছে নিল শিবু। আমাদের সবাইকে ট্রেনিং দিয়ে রেখেছিল। সেই মত রান্না শুরু করার পর থেকেই আমরা ব্যস্ত রেখেছিলাম ঠাকুরকে। সেই ফাঁকে শিবু মাধাইঠাকুরের হ্যারিকেনখানা সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে কিছুটা তেল বের করে নিয়ে জল ভরে দেয়। ওর বক্তব্য তেল তো জলের চেয়ে হালকা তাই হ্যারিকেন জ্বলবে কিছুক্ষণ। তবে ওই বটতলার কাছাকাছি এসেই নিভে যাবে।
দুজন বেলা থাকতেই পৌঁছে গিয়েছিল বটতলায়। মাধাইঠাকুরের রান্না শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বাকি চারজন ঘুরপথে দৌড় লাগালাম। সন্ধ্যে নেমেছিল আগেই। চারিদিক অন্ধকার। আমাদের কাছে অবশ্য তিন ব্যাটারির টর্চ আছে, তবে তা জ্বালানো যাবে না। আমরা কাছাকাছি ডালগুলোয় জায়গা করে নিয়েছি। মাথা সহ শরীর ঢাকা আছে চাদরে। আমাদের গা ছমছম করছে কিন্তু শিবুর ভয়ে সেকথা বলতে পারছি না। একটা গা শিরশিরে ভয় নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি।
‘রুদ্ধশ্বাস মানে হল, দম বন্ধ করে থাকা।’ দাদু বড় করে শ্বাস টানলেন।
‘অপেক্ষা করতে করতে এক সময় চোখে পড়ল একটা আলোর বিন্দু। আলোর বিন্দুটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। শিবু ফিসফিস করে বলল, ‘সাবধান। আসছে। কেউ কিন্তু বেচাল করবি না।’
আলোর বিন্দুটা বটগাছের নীচে এসে দপ দপ করতে লাগল। মনে মনে শিবুর বুদ্ধির তারিফ করলাম। ঠিক তেল ফুরিয়ে এসেছে। মাধাইঠাকুর গাছের নীচে পৌঁছল। শিবু ওর ডান পা খানা বুলিয়ে দিল মাধাইঠাকুরের মাথায়। আমাদের আর এক বন্ধু প্রণব একটা সাদা চাদর ঝুলিয়ে দিল ডাল থেকে। আমরা সবাই মিলে উলু দেওয়ার মত আওয়াজ করলাম ‘হু---উ---উ----উ’। ভয় দেখাতে গিয়ে আমাদেরই ভয় করছে। হাত পা কাঁপছে। চেপে ধরে আছি গাছের ডাল।
এদিকে গাছের নীচ থেকে একটা বিকৃত কন্ঠের চিৎকার শুরু হল। দেখলাম মাধাইঠাকুরের হ্যারিকেনটা র‍্যান্ডম মোশনে এদিক থেকে ওদিকে নাচছে। তারপর দপ দপ করতে করতে হঠাৎ নিভে গেল। ‘ধপাস’ করে একটা শব্দ হল। মাধাইঠাকুরের চিৎকারটাও থেমে গেল আচমকা।
শিবু বলল, ‘সর্বনাশ করেছে। চল নামি। ঠাকুর তো চিৎপটাং, দেখ আবার মরে ফরে গেল নাকি!’
আমরা ডাল থেকে নামলাম। সবার হাতে তিন ব্যাটারির টর্চ জ্বলে উঠল। দেখলাম মাধাইঠাকুরের ঝোলা একদিকে আর হ্যারিকেন একদিকে পড়ে। কাঁচ ভেঙে গিয়েছে। গায়ের চাদরটা খুলে গিয়েছে।
রমেন জল জোগাড় করতে ছুটে গেল গ্রামের ভেতর। ও ফেরার আগেই অন্য একজন ছেলে এসে ‘বাবা, বাবা’ করতে করতে মাধাইঠাকুরের উপর উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। রমেন ফিরে এল এক ঘটি জল নিয়ে। চোখে মুখে জলের ছিটে দিতেই ঠাকুর চোখ মেললেন। তারপর আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তো- তো- তো- তোমরা!’
আবিষ্কার হল কাঁদতে থাকা ছেলেটি মাধাইঠাকুরের ছেলে। বাবাকে এগিয়ে নিতে আসছিল। বাবা আর ছেলের অবস্থা দেখে আমরা ওদের বাড়ি পৌঁছে দিতে গেলাম।
সব শুনে মাধাইঠাকুরের বৌ বললেন, ‘আঃ মরণ! তিনকাল গেয়ে এককালে ঠেকল তবু বুড়োর ভয় গেল না গো। লোকটার জন্যে একটাদিনও বাপের বাড়িতে রাতবাস করতে পারলাম না! কি? ...না ভূতের ভয়। কি জ্বালা বল তো বাবারা! তোমাদের রান্না করে রামনাম জপ করতে করতে ফিরে আসে। তবে বটগাছতলা একা পেরনোর মুরোদ নাই। রোজ হাবল এগিয়ে যায়। আজ ওর একটু দেরি হয়ে গেয়েছিল... তবু ভগবান রক্ষা করেছেন। ভাগ্য ভাল যে তোমরা দেখেছিলে!’
আমরা আর কথা বাড়ালাম না। ভাবলাম যা বলার কালকে মাধাইঠাকুরকেই বলব।
পরের দিন সকাল থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। মাধাইঠাকুর আর আসেন না। দুপুর গড়িয়ে গেল, মাধাইঠাকুর এলেন না। তার জায়গায় এসে উপস্থিত হলেন হেড মাস্টারমশাই স্বয়ং। দেখেই আমাদের পিলে চমকে গেল। বুঝতে পারলাম, ম্যাট্রিক আর দেওয়া হল না আমাদের। এখানেই পড়াশুনোর ইতি ঘটবে। উনি কিছুতেই এত বড় অন্যায় মেনে নেবেন না।
হেডমাস্টারমশাই বললেন, ‘তোমাদের দুদিন একটু কষ্ট করতে হবে। নতুন ঠাকুর দেখার জন্যে আমি বলে দিয়েছি। মাধাইয়ের যে কি হল! দরকারে নাহয় মাইনে বাড়িয়ে দেওয়া যেত! কিন্তু সে তো দেখাই করতে চায় না। ছেলেকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে...’
দাদুর কোল থেকে লাফিয়ে নামল ঋভু। খুব খুশি হলে ও হিন্দি, ইংরাজি, বাংলা সব ভাষা মিলিয়ে কথা বলে। বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ দাদু। আমি আর ভয় করব না, প্রমিস। বুঝেছি- ভূত ভূত কুছ নাহি হোতা হ্যায়।’
তিতলিও বেণী দুলিয়ে বলল, ‘ঠিকই তো। হয় নাই তো। আমিও আর ভয় করব না।’
গোগোল আর টিন্টো বলল, ‘আরেকটা গল্প দাদু... প্লি –ই- ই- জ।’
ভালোদাদু বললেন, ‘তার আগে রাঙ্গাদিদি আর গোগোলদাদু বলত ‘শুদ্ধাচারী’ বানান কি হবে। আর তোমরা দুজন বল ‘রুদ্ধশ্বাস’ বানান। যে যে ঠিক বলতে পারবে, পুরস্কার পাবে। আর যে পারবে না, তাকে মুখস্থ করিয়েই ছাড়ব।
-সমাপ্ত-