বাড়িতে যা যা হয়

সাগুফতা শারমীন তানিয়া




যখন কুশান হয়নি তখন কুশানের মা একটা বেড়ালছানা নিয়ে এলো বাড়িতে। বাড়িতে এসে বেড়ালছানা বল্লো, “কিউহঁআআআ।”
কুশানের মা বিরক্ত হয়ে বল্লো, “না পুষি, বলো মিউঁ!”
বেড়ালছানা আবার বল্লো, “কিউউউউহ্যাঁআআআআ।”
কুশানের মা বেজার হলো। কুশানের মা’র কাশ্মীরি শালের মতো নরম আর গরম বলে বেড়ালছানার নাম দেয়া হলো ‘কাশ্মীর’।
দেখা গেল, কাশ্মীর ক্যাটফুড খায় না। কাশ্মীর ইঁদুর ধরে না। কুশানের মা জ্বর হলে যে টোমাটো স্যুপ খায়, সেটা কাশ্মীর ভালবেসে খায়। কুশানের মা যে নোনা জলপাই শিশি ভরে কিনে আনে, কাশ্মীর সেটা খায়।
কুশান যখন জন্মালো তখন সে এক ফুটের মতন লম্বা। তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি এনে কুশানের মা কাশ্মীরকে বল্লো, “আজ থেকে এটা তোমার বড়ভাই।”
কাশ্মীর থাবা চাটতে চাটতে বল্লো, “উঁহু আমি বড়ভাই। আমার নামে যুক্তাক্ষর আছে। আমি আগে বাড়িতে এসেছি। ও আমার ছোটভাই।” কুশানের মা এবারও ভারী বেজার হলো।
কুশান দেড় ফুট লম্বা হতে হতে সে ঠিক করলো, সে মাকে ‘মেমে’ ডাকবে। তার মা তাকে কোলে নিয়ে বল্লো, “বলো আম্মা। আম-মা!”
সে বল্লো- “মেমে।”
তার মা তাকে চাঁদ দেখিয়ে বল্লো, “চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা! বলো মা, বলো মাআআআ!”
সে বল্লো- “মেমে।”
কুশানের মা আবার বল্লো, “বলো আম্মু।”
কুশান চাঁদের দিকে তাকিয়ে পেঁচার গলা করে ডেকে উঠলো- “টুইট্টুউউউউউ!”
কুশান দুই ফুট লম্বা হতে হতে মায়ের বন্ধুরা মাকে ডাকতে লাগলো- ‘মেমে’। কুশানের বন্ধুরাও কুশানের মাকে ডাকতে লাগলো – ‘কুশানমেমে’। মেমের আসল নামটাই সবাই ভুলে গেল।
কুশান বড়সড় ছেলেবাচ্চা হতে লাগলো। কাশ্মীরও বড়সড় বেড়াল হতে লাগলো। মেমেও দিনদিন আরো বেজার হতে লাগলো। কুশান ক্যাটফুড খেয়ে ফেলে। কাশ্মীর ডিমপোচ খেয়ে ফেলে। এ বাড়িতে কেউ কারো কথা শোনে না।
কুশান তিন ফুট পার হয়ে ইস্কুল গেল। ইস্কুলে যাওয়ার সময় নতুন ব্যাগ নিল, নতুন ওয়াটার বটল নিল, কাশ্মীরকে দেখিয়ে দেখিয়ে টুনা মাছের স্যান্ডউইচ নিল, কাশ্মীরকে নিল না। কাশ্মীর এক বেলা মেজাজ খারাপ করে বসে থাকলো। কুশান ইস্কুল থেকে ফিরে এলো। কাশ্মীর ইচ্ছে করে কুশানের ওয়াটার বটল ফেলে দিল, তারপর ভান করলো এটা অ্যাক্সিডেন্ট। কুশানের ব্যাগের ভিতর গিয়ে কাশ্মীর বেড়াল-বেড়াল গন্ধ করে দিয়ে এলো, তারপর ভান করলো এটা সে ইচ্ছে করে করেনি। সন্ধ্যাবেলা কাশ্মীর টুনামাছ খাওয়ার জন্য কাঁদতে লাগলো। মেমে এসে বল্লো, “কাশ্মীর, মিউঁ বলো, বলো মিউউউউঁ, তাহলে টুনামাছ দেব।”
কাশ্মীর ফ্যাঁচফেঁচিয়ে কেঁদে বল্লো, “কিউহাঁআআআআআআআ।”
মেমে রাগ করে দুমদাম হেঁটে চলে গেল।
কাশ্মীর জানালায় গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে কেঁদে কেঁদে পাড়ার সব বেড়ালদের এই দুঃখের গল্প করতে লাগলো। পাড়াবেড়ানি ‘মখমলি’ বল্লো, “কেঁদো না। তুমি না বড়ভাই! তোমাকে নিয়ে সুকুমার রায় ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল’ লিখেছেন। কুশানকে নিয়ে তো লেখেননি। তোমার কি কান্না সাজে?”
বিছানামুতুনি ‘তুলতুলি’ আর বাপেখ্যাদানি ‘হিলহিলে’ জোর গলায় বল্লো, “আমরা হচ্ছি বেড়াল। মিশর দেশে আমাদের রাজার সাথে পিরামিডে যেতে হতো। আমাদের কি টুনামাছের জন্য শোক করা সাজে?” মায়েতাড়ানি ‘পিলপিলে’ও একই মতামত দেবার পরে চোখ মুছে কাশ্মীর জানালা থেকে নেমে এলো। এসে দ্যাখে, কুশান টিফিনে অর্ধেক খাওয়া টুনামাছের স্যান্ডউইচ হাতে করে সরু করিডোরটা ধরে যাচ্ছে। কাশ্মীর আলগোছে কুশানের সামনে এসে এমনভাবে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল যে কুশান হুমড়ি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত কুশান পড়লো না, তবে তার হাত থেকে স্যান্ডউইচ পড়ে গেল। কাশ্মীর সেটা টপ করে মুখে তুলে নিয়ে জানালায় চলে গেল। কুশান কাঁদতে কাঁদতে বিদায় হলো।
মেমে কিছুই জানতে পারলো না, কারণ একটু আগেই কুশান মেমেকে বলেছে সে টিফিনে সবটুকু স্যান্ডউইচ সাবাড় করেছে। কাশ্মীরও ‘আমাদের কি টুনামাছের জন্য শোক করা সাজে’ চেহারা করে জানালায় বসে আছে, গোঁফও মুছে ফেলেছে।
যাই হোক, কুশান একসময় তিন ফুট ছাড়িয়ে রান্নাঘরের সিংকের নাগাল পেতে লাগলো। সে ট্রেন ভালবাসে। কাশ্মীরও ট্রেন ভালবাসে। একদিন মেমে তাকে বল্লো, হোমওয়ার্ক হিসেবে কাগজ পেতে একটা ছবি আঁকতে। সেখানে সবুজ গাছ থাকবে। লাল লাল ফুল। নীল নীল প্রজাপতি।
কুশান ফেলে দেয়া একটা বাক্সের ওপর ছবি আঁকতে বসলো। নীল নীল রেলসড়ক আঁকলো। কমলা কমলা বেড়াল আঁকলো। ইঁদুরমুখো মেমে আঁকলো। মেমের মুখে পিংক পিংক স্ট্রবেরি দেয়া দরকার, কিন্তু কুশান স্ট্রবেরি আঁকতে পারে না বলে সে স্টিকার বসিয়ে দিল। বেড়ালগুলোকে স্কেটবোর্ডে দাঁড় করিয়ে দিল। বাক্স আঁকা শেষ হলে কুশান সেটা ইস্কুলে জমা দিয়ে এলো। কুশানের মিস বল্লো, “বাহ কুশান। তুমি একটা বক্সে এঁকেছ, কিন্তু ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তা করেছ।”
মেমে কিন্তু রাগ হয়ে গেল কুশানের বাক্স দেখে। কুশানকে মেমে তার নিজের ছোটবেলার ছবি দেখালো, যেখানে সবুজ গাছ, লাল ফুল আর নীল প্রজাপতি। আকাশ ফিকে আসমানি। তাতে হলদে চাঁদ। কুশান সেটা দেখে বল্লো, “মেমে, চাঁদ উঠলে তো আকাশ আসমানি রঙের থাকে না। কালো থাকে।” মেমে আবার রাগ করে দুমদাম হেঁটে চলে গেল।
কুশান যখন ঘরের সুইচবোর্ডে হাত দিয়ে বিজলি বাতি জ্বালাতে পারে, তখন একদিন মেমের বন্ধু কিমুলোনিম্বাস খালা মেমেকে বল্লো, “কুশান একটা ছবি আঁকুক, তুমি তার সাথে একটা গল্প লেখো। আমি সেটা ছাপাব।”
কিমুলোনিম্বাস খালা তো এসব বলে চলে গেল। সারাদিন ভেবে ভেবে মেমে সবুজ গাছ, লাল ফুল আর নীল প্রজাপতি ছাড়া কিছু ভাবতে পারলো না। বাপেখ্যাদানি ‘হিলহিলে’ আর মায়েতাড়ানি ‘পিলপিলে’ এসে মেমের আলুক্ষেতে গর্ত করছিল বলে মেমে বেশিক্ষণ ভাবতেও পারলো না।
আলুক্ষেত খুরপি চালিয়ে সমান করে মেমে ফিরে এলো। ফিরে এসে কুশানকে বল্লো, “আমি একটা বেগুনি জলহস্তি আর একটা ধূসর সজারু নিয়ে গল্প ভেবেছি। তুই তেমন তেমন করে এঁকে দে। তারপর আমি গল্পটা লিখব।”
কুশান কাগজ পেতে ছবি আঁকতে বসলো। সে এখন ছবি আঁকে না, স্কেচ করে। ইস্কুলে সর্দিওয়ালি ‘লায়লা’ তাকে স্কেচ করতে শিখিয়েছে, খুব সোজা, ঘনঘন পেন্সিল দিয়ে ঘষাঘষি করলেই স্কেচ হয়ে যায়।
আধঘন্টা পরে মেমে এসে দেখলো, কুশান একটা রেলগাড়ি এঁকেছে যেটা একটা দূর্গের মতো দেখতে। এটা দূর্গ রেলগাড়ি। মানে এই রেলগাড়ি দূর্গের কাজও করে। কুশান স্টেশন এঁকেছে আর স্টেশনের পাশে মেমের ‘সুন্দরবন’ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের গাছের শিকড়গুলি বটের ঝুরির মতো। কুশান মুখ গম্ভীর করে বল্লো, “এটা বটের ঝুরি না, এটা কলা। গাছে কলা ধরেছে।”
কাশ্মীরও পাশ থেকে বল্লো, “এটা কলা। গাছে কলা ধরেছে।”
কলাগাছের পাশে একটা নরমাল গাছে একটা পাখি বসে আছে। তার পাশে একটা নারকেল গাছে নারকেল ফলেছে। মেমে এইসব দেখে বল্লো, “মানুষ দে। বাড়িঘর দে।”
কুশান আরো গম্ভীর হয়ে বল্লো, “ফরেস্টে মানুষের বাসা দিলে তো সব শেষ। হোটেল দেব একটা শুধু। কেউ কেউ ফরেস্ট দেখতে আসবে।”
মেমের সামনে বসে কুশান রেলসড়কের সাইডিংএ একটা হোটেল দিল। হোটেলে মানুষ দিল। টিভি দিল। টেবিলে কাঁটাচামচ আর ছুরি দিল। মেমে একবার বল্লো, “টিভিটা ভাল করে আঁক। সংবাদ হচ্ছে, ঝড় আসবে।” কুশান একবার কাশ্মীরের দিকে তাকিয়ে তারপর মেমের দিকে তাকিয়ে বল্লো, “মেমে, টিভি নষ্ট, তাই ঝিরিঝিরি লাইন দেখা যাচ্ছে শুধু।”
মেমে বিরক্ত হয়ে বল্লো, “দুই একটা বাড়িঘর দে। লাল-নীল জামা পরা মানুষ দে।”
কুশান তবু বাড়িঘর আঁকলো না, তাঁবু এঁকে বল্লো, “মেমে এই দিলাম তাঁবু, ক্যাম্পিং করতে একটা অ্যাডাল্ট এসেছে আর সাথে বাচ্চা। সামনে একটা ক্যাম্পফায়ারও দিলাম যাও।”
নানী ফোন করেছে বলে মেমে তখন কিছু বলতে পারলো না। ফোন রেখে মেমে কুশানকে জড়িয়ে ধরে বল্লো, “আজকে তোর নানী আসবে।” কুশান জিজ্ঞেস করলো, “ঢঙ্গী নানী নাকি গম্ভীর নানী?” মেমে হেসে ফেলে বল্লো, “গম্ভীর নানী। আমার মা।”
গম্ভীর নানী এলো। গম্ভীর নানী ভালবাসে কেক, আপেল আর নাশপাতি। মেমে রেঁধেছে ভাত, ডাল, পটলভাজা। দেখা গেল গম্ভীর নানী কুশানের ছবির তারিফ করছে। মেমে সেটা দেখে রাগ আর রাখতে পারলো না, চেঁচিয়ে বল্লো, “কই, তুমি তো বললে না দূর্গটা কেন রেলগাড়ির মতন, বটগাছে কেন কলা ধরেছে, মানুষ কেন ঝিরিঝিরি টিভি দেখছে!”
গম্ভীর নানী কোনো জবাব না দিয়ে পটলভাজার ভেতরের বিচি কড়মড়িয়ে খেতে লাগলো।
মেমে আরো জোরে চেঁচিয়ে বল্লো, “এবাড়িতে কেউ কথা শোনে না।”
গম্ভীর নানী হাসিমুখে বল্লো, “তুই তোর গল্পটা এখন এই ছবিটার সাথে মিলিয়ে লিখে ফ্যাল।”
মেমে হতাশ হয়ে বল্লো, “আমি একটা বেগুনি জলহস্তি আর ধূসর সজারু ভেবে রেখেছি, এখন আরেকটা গল্প কি করে বানাবো? কেমন করে কিমুলোনিম্বাসকে দু’দিনের ভেতর লেখা জমা দেব?”
গম্ভীর নানী সান্তনা দিয়ে বল্লো, “তোকে বলেছিলাম লাল ডাক্তার হ, নীল দারোগা হ, আসমানি টিচার হ। তুই বললি তুই সবুজ শিল্পী হবি। লাল ডাক্তার নীল দারোগা আসমানি টিচার হলে আজ এতো চিন্তা করতে হতোই না। আমার বাড়িতেও তো কেউ কথা শুনতো না।”
দুপুরের খাওয়া শেষ হতে হতে অবশ্য সবার মন ভাল হয়ে গেল।
কুশান বেগুনি জলহস্তি আঁকতে গিয়ে গোলাপি তিমি এঁকে ফেললো।
কাশ্মীর স্কুলব্যাগের ভেতর গিয়ে ঘুমের আয়োজন করতে লাগলো।
গম্ভীর নানী আর মেমে ‘সবুজ শিল্পী’ নিয়ে আর কিছু বললো না।