সে এক ভাসমান দ্বীপের কথা

কনকবরণ ঘোষ


অনেক দিন আগে ছিল মহাসাগরের বুকে এক ভাসমান দ্বীপ। সেখানে হিরের গাছে পান্নার পাতা আর ডালে ডালে ঝুলে থাকতো লাল টুকটুকে চুনীর ফল আর মুক্তার ফুল । একদিন এক ভিনদেশি রাজপুত্র বাইশ মাল্লায় দাঁড় টানা ময়ূরপঙ্খী নৌকো করে বেড়াতে বেড়াতে এসে পড়লো সেই ভাসমান দ্বীপে। ভিনদেশি রাজপুত্রকে দেখে সেখানকার রাজা সত্রাজিৎ ও রানীমা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। তাদের কাছ থেকে রাজপুত্র শুনলো সেই দ্বীপের ইতিহাস। আগে অনান্য দ্বীপের মতোই ভাসমান এই হোরাই দ্বীপ স্থির ছিল। রাজা সত্রাজিতের পিতামহ অত্যাচারী রাজা যুধাজিৎ একবার হোরাই দ্বীপে তপস্যারত এক ঋষির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। সেদিন থেকেই ঋষির অভিশাপে হোরাই দ্বীপ ভেসে বেড়ায়। এই শুনে রাজপুত্র বললো, এই দ্বীপকে কি আবার স্থির করে দেবার কোনো উপায় নেই ? রানীমা বললেন , যে ঋষি অভিশাপ দিয়ে হিমালয়ে চলে গেছেন , তিনিই কেবল পারবেন।রাজপুত্র বললো, তবে আমিই যাবো ঐ সন্ন্যাসীকে সন্তুষ্ট করতে । আপনারা আমাকে অনুমতি দিন । এমন আন্তরিক ইচ্ছের কথা শুনে রাজা রানী সজল চোখে তাকে অনেক স্নেহ আশীর্বাদ দিয়ে রওনা করিয়ে দিলেন হিমালয়ের উদ্দেশ্যে। দিন যায় মাস যায় রাজপুত্র চলেছে তো চলেছে। ক্রমে শুরু হল পাহাড়ি পথ । পাহাড়ি অধিবাসীদের কাছে খোঁজ করতে করতে অবশেষে এসে পড়লো হিমালয়ের বিচিত্র সব গুহার সামনে।
এইসব গুহাগর্তে খুঁজে দেখতে দেখতে এক জায়গায় দেখলো ধুনিতে আগুন জ্বলছে । আলোতে দেখা যাচ্ছে এক অতি বৃদ্ধ সন্ন্যাসী । তার চোখের চামড়া ঝুলে পড়ে চোখদুটো ঢেকে গেছে । কেউ এসেছে বুঝতে পেরে বৃদ্ধ তার চোখের চামড়া তুলে তাকে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর আবার চোখ বন্ধ করে বললেন, তুমি নিশ্চয়ই অঞ্জনগড়ের রাজা রুদ্রসেনের পুত্র পবনকুমার । ভাসমান দ্বীপ হয়ে এসেছো আমার কাছে । পবনকুমার অবাক হলেন না । কারণ ঋষি মুনিরা তপস্যার দ্বারা সবকিছু জানতে পারে। পবন বললো, ঋষিবর আপনি তো সবই জানেন। এও নিশ্চয়ই জানেন আমি কেন এসেছি। ভাসমান দ্বীপকে স্থির করে দিতে আমাকে সাহায্য করুন দয়া করে। সন্ন্যাসী বললেন , সে বড় কঠিন কাজ। তুমি কি পারবে ? পবন সাগ্রহে উত্তর দিলো , আপনার আশীর্বাদে ঠিক পারবো ঋষিবর। সন্ন্যাসী বললেন, আমার দেহত্যাগের সময় হয়েছে। তার আগে এসো তোমাকে শিবমন্ত্র দিয়ে যাই। এই মন্ত্র অমাবস্যার রাতে এক লক্ষ বার জপ করবে। এই নাও আমার ত্রিশূল । একে আমার দেওয়া মন্ত্র পড়ে দ্বীপকে সমুদ্রে গেঁথে দিলে হোরাই দ্বীপ তবেই স্থির হবে । আর এই কাজ ততক্ষণ তুমি পারবে না যতক্ষণ না তুমি বিবাহের পর কোনো পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে তাতে উত্তীর্ণ হতে পারছো। এই বলতে বলতে বাঘের চামড়ার আসনে বসে বসেই কোত্থাও কোনো আগুনের সংযোগ ছাড়াই সন্ন্যাসীর দেহ চোখের সামনে ধূ ধূ করে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেল । রাজপুত্র অন্যান্য তপস্বী সাধুদের ডেকে তার জন্য ভাণ্ডারার আয়োজন করলেন। সাধুদের তো শ্রাদ্ধ হয় না । দেহত্যাগ করলে এমনি সাধুদের ডেকে খাওয়ানো হয়। এর নাম ভাণ্ডারা।
ভাণ্ডারা হয়ে গেলে সেখান থেকে রাজপুত্র ফিরে এল হোরাই দ্বীপে। সন্ন্যাসীর নির্দেশমতো কাজটা কীভাবে করবে একমনে তাই ভাবছে কেবল। পবনকে চিন্তিত দেখে রানীমা কারণ জিজ্ঞাসা করলেন । পবন জানালো সবকিছু । অঞ্জনগড়ে ফিরে গিয়ে বিবাহ করে ফিরে আসবে তাও বললো । শুনে রানীমা বললেন, এই কথা ! বেশ তো কুমার । যদি তোমার পছন্দ হয় আমাদের কন্যা দীপশিখাকে তুমি বিবাহ করতে পারো। তোমার চেয়ে যোগ্যতম রাজকুমার আমরা কোথাও পাবো না। রানীমার কথা শুনতে শুনতে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো রাজপুত্রের মুখ। দেখে রানীমা আনন্দে উলুধ্বনি দিলেন। রাজা ও রানীমা পবনকে পিতামাতাকে সবকিছু জানিয়ে আশীর্বাদ নিয়ে আসতে বললেন ।


রাজকুমারী দীপশিখার আসন্ন বিবাহের আনন্দে ভাসমান হোরাই এর কাছেই আছে আরেকটা ছোট্ট দ্বীপ , যেখানে রাজকন্যে হরেক ফুলের মাঝে ঘুরে বেড়ায় গান গায় মালা গাঁথে সেই ছোট্ট বেলা থেকে, সেখানে সখীরা আনন্দ উৎসবের আয়োজন করেছে খুব ধুমধাম করে। রানীমা'কে একজন সখী এসে বললো সে কথা । রাজপুত্র আর রাজকন্যাকে নিয়ে তারা আজ আনন্দ করবে। পরেরদিন রাজপুত্র পবনকুমার ফিরবে অঞ্জনগড়। রানীমা'র অনুমতি নিয়ে দীপশিখা ও পবনের সঙ্গে ফুলে ফলে ভরা সেই ছোট্ট দ্বীপে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠে বসলো। কিছুটা দূর যাওয়ার পর ঠাণ্ডা বাতাস বইতে লাগলো। দেখতে দেখতে সমস্ত আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেলো। ঝড় উঠে এলো প্রবল বেগে। নৌকা টালমাটাল দুলতে লাগলো মোচার খোলার মতো। রাজকন্যার সখী সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মাথায় পড়ে তলিয়ে গেল কোথায়..। রাজপুত্র রাজকন্যা জ্ঞান হারিয়ে নৌকার ভিতরেই পড়ে রইল। দিগ্বিদিক নেই ভেসে চললো নৌকো।
জ্ঞান ফিরতে তারা দেখলো সুন্দর সুন্দর মানুষ সব ঘোরাফেরা করছে ঘরের বাইরে । রাজপুত্র তাদের একজনকে ডেকে জানলো যে , তারাই উদ্ধার করে এনেছে পবনদের। অদ্ভুত এই সুন্দর মানুষরা কথা বলে সুরে সুরে ছন্দ মিলিয়ে। চারদিক থেকে বিচিত্র সব বাজনার টুং টাং শব্দ ভেসে আসছে। এই প্রাসাদ এক দ্বীপের রাজপ্রাসাদ । রাতের বেলা নাচ গানের উৎসব হবে অতিথিদের সম্মানার্থে। এই দ্বীপের নাম কিন্নর দ্বীপ। এইসব দেখে শুনে রাজকন্যা দীপশিখার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। রাজপুত্র পবনকে ফিসফিস করে বললো , এই দ্বীপের প্রত্যেক নারী পুরুষ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর দেখতে। সবাই নাচ গান বাজনায় অসাধারণ দক্ষ । এই গুণ এরা পেয়েছিল ঈশ্বরের আশীর্বাদে । কিন্তু এক লোভী মায়াবিনী এই দ্বীপে এসে সবাইকে লোভী করে তুলেছে ।এরপর থেকে ভিনদেশি পুরুষ এখানে এলে কিন্নরীরা তাকে নাচগানে চিরকালের জন্য মোহ মুগ্ধ করে রাখে। আর পুরুষরাও ভিনদেশি নারীকে একইভাবে মোহ মুগ্ধ করে ফেলে । দ্বীপের প্রকৃত কিন্নরী রানী বন্দিনী হয়ে চোখের জল ফেলছেন গোপন কুঠুরিতে। ভীষণ বিপদে পড়েছে দুজনে বুঝতে পেরে রাজকন্যা দীপশিখা তাদের রাজপরিবারের গুরুদেবের কাছে মনে মনে সাহায্য প্রার্থনা করলো। গুরুদেব আবির্ভূত হয়ে মন্ত্র পড়ে তাদের চারদিকে এক অদৃশ্য বলয় তৈরি করে দিয়ে অন্তর্হিত হলেন।
সন্ধ্যাবেলা যথারীতি নাচগানের আসর বসলো। সুন্দর সুন্দর নাচ গান হচ্ছে । যে দেখবে শুনবে সেই মুগ্ধ না হয়ে পারে না। কেবল রাজপুত্র পবনকুমার আর রাজকন্যা দীপশিখা হেসে কুটোপাটি । কিন্নর নারী পুরুষ তাদের এই অবস্থা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো , কই গো ভিনদেশি অতিথি , আমাদের নৃত্যগীত কি তোমাদের ভালো লাগছে না ? শুনে পবনকুমার হাসতে হাসতে পেট খামচে ধরে কোনমতে বলতে পারলো , এই তোমাদের নাচ গান ! আমাদের কানে তো গ্যাঙর গ্যাঙ ব্যাঙের ডাক শুনতে পাচ্ছি আর চোখে দেখছি ইয়াব্বড় বড় কোলাব্যাঙ কুনোব্যাঙের লাফানি ঝাঁপানি। খুব মজা পাচ্ছি হা..হা..হা..হো..হো..হো...। এই শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সেই লোভী মায়াবিনী রানী কিন্নর রাজাকে চিৎকার করে পবনকুমারদের কিন্নর দ্বীপ থেকে তাড়িয়ে দিতে বললো। একটা ছোট নৌকা করে মাঝ সমুদ্রে ওরা পবনদের ভাসিয়ে দিলো। অকূল সমুদ্রের বুকে ভেসে চলেছে তারা দিনের পর দিন । জল নেই খাবার নেই খিদে তৃষ্ণায় প্রাণ যায়। এমন সময় হঠাৎ এক মাছ ধরতে আসা বিরাট জেলে নৌকার সর্দার মাঝির চোখে পড়ে গেল পবনদের নৌকা। ক্লান্ত অবসন্ন রাজপুত্র পবনকুমার ও রাজকন্যা দীপশিখাকে তারা তুলে নিয়ে মাছপোড়া আর জল খাইয়ে শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তুললো তাদের । সব শুনে সর্দার মাঝিরা পৌঁছে দিলো তাদের অঞ্জনগড় । রাজা রুদ্রসেন কুমারদের পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অনেক ধনরত্ন উপহার দিলেন তাদের। পরে রাজকন্যা দীপশিখাকে রাজবধূ রূপে বরণ করে নিতে সবাই এলেন হোরাই দ্বীপে। সাতদিন সাত রাত্রি ধরে মহা সমারোহে বিবাহের আনন্দ উৎসব চললো ভাসমান হোরাই দ্বীপে। বাকি রয়েছে দ্বীপকে ভাসমান অবস্থা থেকে স্থির করে দেবার কাজ।
কিন্নর দ্বীপ থেকে রাজপুত্র পবনকুমারদের তাড়িয়ে দিয়েও কিন্তু পিছু নিয়ে ওরা মাঝসমুদ্রে মরল কিনা বা আর কিছু হল তা জানতে গুপ্তচর পাঠিয়েছিলো লোভী মায়াবিনী রানি। ঈশ্বরের কৃপায় ওরা মরেনি তাই মৃত্যুর খবর দিতে না পারলেও কেন পবন'রা নাচে গানে মুগ্ধ হয়ে বাঁধা পড়েনি এদিক থেকে সেই সব গোপন খবর নিয়ে গিয়ে গুপ্তচর তুললো মায়াবিনী রানীর কানে। একেই তো চূড়ান্ত রেগে ছিলো পবনদের উপর । এই খবরে যেন আগুনে ঘী পড়ে গেল । কিন্নর রাজাকে বললো সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে পবনকুমারকে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে। সমস্ত হোরাই দ্বীপ দূরে থেকে ঘিরে ফেললো কিন্নর বাহিনী। নেতৃত্ব দিচ্ছে কিন্নর রাজা ও লোভী রানী। অপেক্ষায় আছে কখন পবনকুমার ত্রিশূল নিয়ে সমুদ্রে নামবে। পবনের বিবাহের সাতদিন হয়েছে । অষ্টম দিন অর্থাৎ পরের দিনই পবন মন্ত্রপূত ত্রিশূলে গেঁথে দ্বীপকে স্থির করে দেবে। পরের দিন সকাল হলে স্নান করে পুব আকাশের রক্তিম সূর্য প্রণাম করলো রাজপুত্র পবনকুমার আর রাজকন্যা দীপশিখা। সেইদিন রাত্রিতে অমাবস্যা। সমস্ত রাত হিমালয়ের সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর দেওয়া শিবমন্ত্র জপ করে ত্রিশূল মন্ত্রপূত করে নিয়ে ভোররাতেই সমুদ্রে ঝাঁপ দিলো সমুদ্রের গভীর তলদেশের সঙ্গে হোরাই দ্বীপের নীচের দিকটা গেঁথে দেবে বলে। কিন্তু কিন্নর বাহিনী পবনকুমারের উপরে আক্রমণ শুরু করে দিলো। তাকে ওরা বন্দী বানিয়ে নিয়ে যাবে । রাজপুত্র বিপদে পড়েছে অনুমান করে হোরাই দ্বীপের খোলা আকাশের নীচে আর্ত ভাবে গুরুদেবকে স্মরণ করলো দীপশিখা । গুরুদেব বললেন , এই সেই পরীক্ষা যা কুমারকে নিজের বুদ্ধিবলে সৌর্যবলে উত্তীর্ণ হতে হবে । আমি অসহায় । ভগবান শিবের কাছে প্রার্থনা করো। রাজকন্যা দীপশিখা আকুল হয়ে কাঁদছে আর প্রার্থনা করছে। ওদিকে সমুদ্রের নীচে ঘোর যুদ্ধ করছে পবনকুমার। কিছুতেই যেন পেরে উঠছে না। একরকম বেপরোয়া হয়ে ত্রিশূলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বললো --

জয় জয় শিব ডমরুধারী ভোলানাথের জয় ।
ত্রিশূলে তোমার হোরাই যেন সাগরে স্থির হয় ।।
অমাবস্যার ঘন রাতে লক্ষ মন্ত্র জপ করে ।
গেঁথে দিলাম দ্বীপ যেন আর এখান ওখান না ঘোরে।।

এই বলে পবনকুমার যেইমাত্র ত্রিশূল দিয়ে দ্বীপকে সমুদ্রে গেঁথে দিলো অমনি সেই কিন্নরেরা আর লোভী মায়াবিনী রানী শুদ্ধ যারা পবনকে আক্রমণ করে আঘাত করেছিলো তারা সব একে একে ত্রিশূলে এসে আটকে যেতে লাগলো। ত্রিশূল ক্রমশ মোটা আরও মোটা হতে হতে এক বিশাল স্তম্ভের আকার নিলো। এক বিরাট লোহার থামের উপরে হোরাই দ্বীপ সেই থেকে সমুদ্রে স্থির হয়ে গেল । কিন্নর রাজা আর যারা বন্দিনী কিন্নরী আসল রানীর সেবা করতো তাদের উপর থেকে মোহজাল সরে গেল । নিজের ভুল বুঝতে পেরে রাজপুত্র পবনকুমারকে বন্ধু করে নিয়ে ফিরে গেলেন কিন্নর রাজা তার প্রকৃত কিন্নরী রানীর কাছে। আর কি হল ! অঞ্জনগড়ের রাজা রুদ্রসেনের বড় মায়া হল রাজকন্যার বাবা সত্রাজিতের করুণ মুখখানা দেখে । একমাত্র কন্যা দীপশিখা তাদের জীবন । কেমন করে বাঁচবেন তারা তাকে ছেড়ে । স্থির হল অঞ্জনগড় রাজ্য দেখবে সেই সর্দার মাঝি। আর সব্বাই একসঙ্গে আনন্দে থাকবেন বাকি জীবন । কখনো হোরাই দ্বীপে.. কখনো অঞ্জনগড়ে..কখনো কিন্নর দ্বীপে.....