সেদিন কুট্টুস

মেঘ অদিতি

রোদ ঝলমলে একটা দিনে কুট্টুস বাড়ির সামনের বাগানটায় বসে আকাশ দেখছিল।

কুট্টসকে চেনো তো?




ওই যে বাগান থেকে ঘরের দিকে দৌড়ে গেল যে ছেলেটা ওই কুট্টুস। ও গেছে ওর ড্রইং খাতা আনতে। আর পায়ে পায়ে ন্যাজ উঁচিয়ে কুট্টুসের পিছু যে দৌড়ালো ওর নাম তাতা । তাতা কুট্টুসকে খুব ভালবাসে। আর কুট্টুসও তো খুউব ভালো ছেলে। কী ভালো ছবি আঁকে সে। সাদা তুলো তুলো যে মেঘগুলো নৌকোর পাল তুলে দূরের আকাশের দিকে পাড়ি দিচ্ছে সেগুলো দেখে কুট্টুসের আসলে ছবি আঁকতে ইচ্ছে করছিল।




সে ঘরে ঢুকে আগে মামণিকে খুঁজলো। মামণি স্যান্ডুইচ করছে কুট্টুসের জন্য। কুট্টুস পিছন থেকে মামণিকে জড়িয়ে বলল, এসো, মামণি দেখো আকাশে মেঘগুলো কেমন নৌকো হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে দেখবে চল। আর দূরে আকাশের গায়ে নীল নীল পাহাড়গুলোও আজ দেখা যাচ্ছে। কুট্টুস জানে বাপী বলেছে দূর থেকে পাহাড় নীল মনে হলেও সেগুলো নীল নয়। কিন্তু কুট্টুস ওদের নীল পাহাড় বলেই ডাকে।



মামণি কুট্টুসের চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল, তোর ভালো লাগছে?

-খুউব। মামণি আমি ছবি আঁকবো। মামণি বললো, নিশ্চয়ই আঁকবি। আমি সবার খাবার তৈরী করে নিয়ে বাগানে যাচ্ছি কুট্টুস। তুই তোর আঁকার খাতাটা নিয়ে যা।



কুট্টুস ওর ঘরে গেল। টেবিলে ওর ছবি আঁকার খাতা, রঙ পেন্সিল। তাতা কিন্তু ঘরে ঢুকেই কুট্টুসের রামধনু রঙা বলটা নিয়ে ছুটোছুটি শুরু করেছে। কুট্টুস একটু বকে দিল তাতাকে
- তাতা তুমি বল তো খেলবেই কিন্তু এখন তো আমার একটু সাহায্য কর। এই রঙ পেন্সিলগুলো তুমি নাও। আর আমি আঁকার খাতা।

তাতা রঙ পেন্সিল মুখে করে কুট্টুসের আগে আগে ছুট লাগাল। বাগানে এখন অনেক ফুল। খরগোশগুলো বাগানের এদিক ওদিক খেলছে। কুট্টুস দেখলো ঘাসের ওপর মামণি একটা মাদুর পেতে দিয়েছে। কুট্টুস এখন মাদুরের ওপর তার আঁকার খাতাটা খুলে আরাম করে বসেছে।




মামণি এসে গেছে। বললো কী আঁকবি রে কুট্টুসবাবু? কুট্টুস আবার দূরের পাহাড়গুলো দেখলো। বাপী একটা আরাম চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বই পড়ছে। খরগোশগুলোর সাথে তাতা এখন খেলা করছে। কুট্টুস পেন্সিল নিল হাতে আর দেখতে দেখতে একটা মস্ত পাহাড় একে ফেললো। পাহাড়ের নিচে দিয়ে আঁকলো সেই নদীটা, যার নাম শঙ্খ নদী। তারপর খুব মন দিয়ে ও পাহাড়টাকে রঙ করতে লাগল। তারপর রঙ পেন্সিলে নদীটায় সে জলের ঢেউ দিল যেই, ওমা, অমনি নদীটা কথা বলে উঠলো
- কুট্টুস তুমি খুব ভালো।



কুট্টুস খুব অবাক হয়ে গেল। বলল, তুমি কথা বলছো কী করে! আমি তো তোমাকে আঁকছি, ছবি কি কথা বলতে পারে? ওমা, নদী তাকে জল ছিটিয়ে দিল খানিকটা। সত্যিই তো কুট্টুসের হাঁটুর ওপর চলকে পড়েছে জল।



কুট্টুস বেজায় চমকে গিয়ে বলল
- এই এটা কী হলো?

পাহাড় এতক্ষণ কিছু বলেনি, এবার সে কুট্টুসকে বললো
- কুট্টুস এই যে আমি আমিও কিন্তু কথা বলতে পারি। আমরা এখন তোমার বন্ধু।

কুট্টুস এবার খুব মজা পেল, পাহাড়কে জিগ্যেস করল
- আমি যদি তোমার গায়ে বেয়ে একটা ঝর্ণা আঁকি, তুমি কি খুব ব্যথা পাবে?
পাহাড় হেসে বললো- না।

সে ঝটপট এঁকে ফেলল ঝর্ণা। কী আশ্চর্য, পাহাড় থেকে ঝিরিঝিরি নেমে এল ঝর্ণার জল, মিশে গেল শঙ্খ নদীর জলে। কুট্টুস আঁকলো একটা গাছ। কিছু ঘাস। কুট্টুস দেখলো ওর আঁকা ছবিগুলো ওর সাথে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু কিছু একটা ও আঁকেনি বলে পুরো ছবিটায় আলো যেন কম। ওহ.. সে তো সূর্যটাই আঁকেনি। কী করে আলো হবে। সেজন্যই তো ঝলমল করছে না ওরা। এবার কুট্টুস এঁকে ফেললো সূর্য। আর অমনি হেসে উঠলো সবাই আলো পেয়ে।



গাছ বলল- এসো। নদী বললো- এসো।
পাহাড় বললো- এসো সব্বাই মিলে গান করি, খেলা করি।

কিন্তু তাতা? কুট্টুসের তাতাকেও চাই। কুট্টুস সবার আগে এঁকেছিল পাহাড়। কাজেই ও বয়সে সবার বড়। পাহাড় বলল - - ওভাবে তো নেওয়া যাবে না। তুমি ওর ছবি এঁকে ফেল ঝটপট।

কুট্টুস পাহাড়ের কথা শুনে তাতাকে আঁকতে বসলো। তাতা কিন্তু একটু একটু দুষ্টুমী জানে। কুট্টুস যখনই ওর চোখ আঁকতে যায় তাতা চোখ বন্ধ করে ফেলে। কুট্টুস দুবার ইরেজার ঘষে বললো- তাতা দুষ্টুমী না প্লিজ। তোমাকে আঁকা হলেই আমরা খেলব সবাই মিলে। এখন তাতা লক্ষ্মী। কুট্টুস রঙ শেষ করতে তাতা জিগ্যেস করলো- এবার তো দুষ্টুমী করতে পারব? তাতা এমন করে বলেছে যে পাহাড়ও হেসে ফেলেছে। অনেক মজা হচ্ছিল তবে ওর মধ্যে একবার তাতা জলে ঝাঁপ দিতে গিয়ে প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। কুট্টুস তাড়াতাড়ি ওকে তুলে নিয়ে বুঝিয়ে বলেছে সাঁতার না জানলে জলে ওভাবে ঝাঁপ দিতে নেই।



অনেক খেলা শেষে সূর্য পাহাড়কে বললো- ফিরতে হবে।
পাহাড় বললো নদীকে যে, ফিরতে হবে।
নদী বললো গাছকে।
গাছ বললো ঘাসকে।
ঘাস বললো তাতাকে।
তাতা বললো কুট্টুসকে।

সব্বাই ফিরে যাবে শুনে কুট্টুসের কী ভীষণ মন খারাপ। ও নদীকে বললো
– তোমরা যেও না প্লিজ যেও না।

নদী - তা বললে হয়, ফিরতে তো হবে আমাদের।

পাহাড়, গাছ, ঘাস, সূর্য কেউ থাকতে রাজি হলো না।
কুট্টুসের খুব মন খারাপ..

- আমাকেও নিয়ে চলো তোমাদের সাথে। নদীর সেকথা শুনে চোখে জল এলো।

-কুট্টুস তুমি যেতে চাও আমাদের সাথে?

- তোমরা থেকে যাও সেটা চাই। আর যদি চলে যাও তাহলে আমাকেও নিয়ে চাও তোমাদের সাথে।

সূর্য এতক্ষণ শুনছিল ওদের কথা। কুট্টুসের চোখে জল। নদীর চোখেও জল। সূর্য সব দেখে শুনে কুট্টুসকে বলল, শেষবারের মতো তুমি একটা কিছু আঁকো। কুট্টুস হাতে পেন্সিল তুলে নিল।
*****

মামণি আর তাতা যখন ওকে দুপুরের খাবারের জন্য ডাকছিল, তখন কুট্টুস ঘুমিয়ে গেছে ওর ড্রইং খাতার ওপর। ওর চোখ বেয়ে নেমে আসা জলের দাগ তখনো ওর গালে।

ওর খাতায় আঁকা পাহাড়, নদী, ঝর্ণার সাথে একটা ছেলেও আছে যে কুট্টুসের মতই দেখতে। সেই কুট্টুসটা আবার তাতাকে নিয়ে বোটিং করছে।



ইলাস্ট্রেশনের জন্য ছবি সংগ্রহ: ইন্টারনেট