ভাল লাগার সময়গুলো

দ্বৈপায়ন মজুমদার


পুজো শেষ, মানেই গায়ে একটা ঠাণ্ডার অনুভূতি । রাতে গায়ে একটা পাতলা চাদর । সন্ধ্যেতে বেরোতে গেলে টুপি আবশ্যিক । মাথায় নাকি শিশির পড়ে, ঠান্ডা লাগে । পুজোর ছুটি তখন প্রায় এক মাস । ছুটি পর স্কুল খুললে একটু ভয় । পরীক্ষা হত তখন ছুটির আগে । ‘হাফ-ইয়ারলী’ নাম ছিল । তার খাতা দেখাবে, মানে বাড়িতে নির্ঘাত বকা খেতে হবে । ছুটির আগেই হয়ে যেত পরীক্ষা । বাড়িতে বলতাম ভালই হয়েছে । পুজোর আগে বকা খেতে কারই বা ভাল লাগে । কিন্তু ছুটি টপকে গেলে খাতা বেরত । অঙ্কে অসংখ্য ভুল । বাংলাতেও ডুবেছি । বাড়িতে বকার সঙ্গে এক-দুটো থাপ্পরও পড়তে পারে । কিন্তু দরজায় তখন শীত কড়া নাড়ছে । তাই থোরাই কেয়ার বকা-ঝকা । ঝক-ঝকে দিন গুলো ছিল রঙিন ও বন্ধুত্বের । ডিসেম্বর ঢুকে গেলেই আবার ছুটি-ছুটি । তখন এত পড়া-পড়া খেলা ছিল না । ছিল রঙিন সোয়েটর, পিকনিক আর ফাটা ঠোঁটের জ্বালা । মাস শেষ হয়ে গেলে যীশু আসবেন । সঙ্গে আসবে কেক, জ্বলবে ক্যান্ডেল । বছর গড়িয়ে পা দেবে নতুন বছরে । শহরের কাছের নদী, জঙ্গল আর পাহাড়ে ছুটে যাবে এক দল মানুষ । পিকনিক, মানে দল বেঁধে আনন্দের দিন । বাড়ির বড়দের সঙ্গে আমরা ছোটোরাও শামিল । সেদিন কেউ বকবে না । মাথার উপর খোলা নীল আকাশ, পায়ের নিচে পাতা ঝড়া মাটির আদর । সঙ্গে ক্রিকেট ব্যাট আর বলের অবাধ্য দাপা-দাপি । আমাদের ছোটোবেলার মফসসলের শীতেই জমত ক্রিকেট । সবারই কিছু প্রিয় খেলোয়ার থাকে । তাদের আদলে ব্যাট-বলের চমকের চেষ্টা । বাড়িতে লুকিয়ে চলত খেলার হিরোদের ছবি খবরের কাগজ থেকে সযত্নে কেটে রাখা । এখন যেমন বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা – নব্বই দশকের আমাদের ছোটোবেলা রঙিন করে রেখেছিল ছোট্ট সচিন, আর সঙ্গে অবশ্যই কপিলদেব । আসলে সময় পেরোয়, কিন্তু কিছু ভালবাসা দুষ্টুমি একই থেকে যায় ।

তবে কিছু মজা ছিল, যা শুধু আমাদের জেলা শহরগুলোর বৈশিষ্ট বলা যেতে পারে । যেমন শীতের সকালে পাওয়া যেত টাটকা স্বচ্ছ সোনালী খেজুর রস, অমৃতের স্বাদ । সন্ধ্যে নামত ঝুপ করে । রাতের বেলায় পাড়াতে দাদা-কাকারা হলুদ বাল্ব জ্বালিয়ে খেলত ব্যাডমিন্টন । আমরা ছোটোরা তাড়াতাড়ি পড়ে নিয়ে বাবার সঙ্গে খেলার আসরে, শুধুই দর্শক । তবে তাতেও আনন্দ কম নয় । তখনও দিন-রাতের ক্রিকেট এত রমরমিয়ে শুরু হয়নি । তাই শীতের রাতে সাদা শার্টল-ককের লড়াইয়ের মজাই আলাদা ।
আর এত কিছুর পর শীত যখন শেষের দিকে তখন আসত সরস্বতী পুজো । আমাদের স্কুল জীবনের সম্ভবত সব চেয়ে রঙিন দিন । সকাল বেলা ঘুম চোখে উঠে কোন মতে চোখ-মুখ ধুয়ে অঞ্জলী । ঠাকুরকে বলা, সামনের পরীক্ষাটা যেন ভাল করে উতরে যায় । তার পর প্রসাদ, প্রথমেই নজর কুলের দিকে । আসলে পুজোর আগে কুল খাওয়া ছিল মানা । ইচ্ছে যেত, কিন্তু ভয় । যদি খেয়ে পরীক্ষা খারাপ হয় । তাছাড়া বাড়িতে লুকিয়ে খাব, তেমন সুযোগও হত না । আর বাড়ির পুজোর কাজ মিটলেই এক ছুটে স্কুলে । সেদিন দিনটা বন্ধুত্বের । এখনকার ‘ফ্রেন্ডসিপ ডে’ বলে যা আগস্ট মাসে হয় তখন তা ছিল অজানা । দুপুর-বেলা স্কুলে হত খিচুড়ি । সঙ্গে একটা বাঁধাকপির তরকারী আর চাটনী, ‘ব্যাস’ । আজও পুজোর দিনে এই স্বর্গীয় খাবারের জন্য হাজার মাইল হাঁটতে রাজি । সবাই মিলে মাটিতে বসে খেতাম । স্যাররা করতেন তদারকি । প্রত্যেক বছর ক্লাস নাইনের দায়িত্ব পড়ত পুজোর । সবাই ভাবতাম কবে বড় হব আর পুজোর দায়িত্ব নেব । সন্ধ্যেতে স্কুলে থাকত আঁকার প্রদর্শনী । বাবা-মারা দেখতে আসত, অন্য স্কুলের বন্ধুরাও আসত । আর একটা জিনিস ছিল, যেটা হয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে । স্কুলে তখন আসে-পাশের সমস্ত স্কুল আমন্ত্রনের ‘কার্ড’ পাঠাত । সেগুলো সব একটা বোর্ডে লাগান হত সুন্দর করে । একটা খাতা রাখা থাকত, সবাইকে বলা হত তার কেমন লাগছে লিখে যেতে । খাতাটা পড়ে পড়তে দারুণ লাগত ।
আজও শীত নামে । আসে মাঘ মাস , নিয়ম করে সরস্বতী পুজোও হয় । কিন্তু আজ আমার আর মাটিতে বসে খিচুড়ি জোটে না ।