কুটুর ছবি

জয়শীলা গুহ বাগচী,ছবি আলেখ্য বাগচী




একটা পাহাড় এঁকে ফেলার পর ছোট্ট কুটুর মনে হল এবার রঙ দেওয়া যাক । প্রথমে সবুজ মোম রঙ বাছল সে। খানিকটা সবুজ ঘষে তার মনে হল পাহাড় যে নীল। খানিকটা নীল ঘষে নিয়ে চুপ করে রইল সে। তার নতুন প্যাস্টেলের বাক্সে কত রঙ! এই তো লাল, এই কমলা, বেগুনী রঙ টা কী সুন্দর! কমলা আর বেগুনী রঙের ছোট ছোট ফুল ফুটেছে পাহাড়ি রাস্তার পাশে। একটা হলুদ পাখি কথা কইছিল ওদের সাথে :
"হ্যাঁ গো কবে ফুটেছ?"

ফুলেরা সমস্বরে উত্তর দেয় : "ওমা তাও জান না! যেদিন নদী অনেকগুলো বল নিয়ে লোফালুফি করছিল, যেদিন সুর্য পুব আকাশে উঠতে গিয়ে অল্প ঘুমিয়ে পড়েছিল, যেদিন দুষ্টু চাঁদ টা বেবীর গাঢ় নীল ন্যাপি চুরি করে পরে মিট্ মিট্ করে হাসছিল। ওই তো যেদিন ছোট পিঁপড়ে রা নয় ঘরের নামতা কিছুতেই ঠিকমতো বলতে পারেনি আর ওদের মামমাম রেগে গিয়ে ওদের আবার ডিম বানিয়ে বলেছিল সেইদিন। "

তাই শুনে ছোট্ট ছেলে কুটুর চোখগুলো গোল গোল হল। মুখটা একটু লাল হল। কুটু দেখল ডিমের কথা শুনে দৌড়ে এসেছে তিনটে পিঁপড়ে। কুটু ওদের গায়ে লাল রঙ এঁকে দিল। পিঁপড়ে রা বলল : " কোথায় ডিম? না তো, আমরা তো বড়। এই দেখ ৯*১=৯, ৯*২=১০ ,৯*৩=১১ সঅব জানি।
এদিকে পাহাড়টা খানিক বোকা ধরণের। একটু অভিমানী। কুটু ওর গায়ে মাত্র দুটো রঙ বলে ও এতক্ষণ চুপ করে ছিল। আর না পেরে এবার এল গলা ফুলিয়ে গল্প করতে। পাখিকে জিগ্যেস করল 'তা হরুদ্দা পক্ষীর কোথা থেকে আসা হল শুনি?' সঙ্গে সঙ্গে কিচমিচ করে নেচে উঠল পাখি-
"হরুদ্দা পক্ষী হরুদ্দা পক্ষী
বাটনা বাটো কিয়া
ছোট্ ঠাকুদ্দা কয়া গেছে
বট্ ঠাকুদ্দার বিয়া

উত্তর না পেয়ে আর একটু অভিমান হল পাহাড়ের। রইল সে চুপ করে। এদিকে পদ্য শুনে খেলা থামিয়ে হাততালি দিয়ে উঠল নদী। ছড়িয়ে পড়ল নানা রঙের বল গুলো চারদিকে। নদী বলল : ' পদ্য আমিও জানি...
ইচিং বিচিং চিচিং চা
প্রজাপতি উড়ে যা '

সঙ্গে সঙ্গে বল গুলো প্রজাপতি হয়ে উড়তে লাগল। কুটু একটু সরে এল পাহাড়ের দিকে। উড়ন্ত পোকামাকড়ে ওর ভারি ভয়। যদি গায়ে আসে! সবার সামনে তো আর চেঁচাতে পারবে না... " মামমাম ওকে সরাও, ও উড়ছে.... আ.... আ....আ....ওকে বসতে বলোওওওও....."

পাখি এবার ডানা ঝাপটিয়ে পালক উড়িয়ে গায়ে পায়ে খুশী ছড়িয়ে বলল 'গল্প শুনবে গল্প?' সবাই নড়ে চড়ে কাছাকাছি সরে এল। বসল ঘন হয়ে। পাহাড়ের গায়ে এলিয়ে পড়ল নদী, নদীর গায়ে ফুল, ফুলের পাশে নামতার বই নিয়ে পিঁপড়ে, পাখি আর প্রজাপতি ডানা ভাঁজ করে বসল ঠিক গল্পের মধ্যিখানে।
পাখি শুরু করল খুব মৃদু স্বরে,প্রায় ফিসফিসিয়ে
"..... সেদিন আমি খুব ক্লান্ত, ডানা ভারি, চোখে
ঘুম, আর উড়তে পারছি না। নীচে তাকিয়ে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে এক সোনার রাজপুত্র, কত মণিমুক্তো হীরে খচিত। আমি বসলাম পায়ের কাছে। ঘুমে ঢুলে এল চোখ। টপ করে গায়ে পড়ল এক ফোঁটা জল। আমি ভাবছি বৃষ্টি এল নাকি। ওপরে তাকিয়ে দেখি রাজপুত্রের চোখে জল। সবাই চেঁচিয়ে উঠল, 'রাজপুত্রের চোখে জল কেন?' পাখি বলল, ' কত মানুষের কত দুঃখ.... ' কথা শেষ হতে না হতেই চেঁচিয়ে উঠল কুটু, -' এ গল্প আমি জানি, এটা তোমার গল্প নয়, অন্য পাখির গল্প। তোমার গল্প বল। '
- ' আচ্ছা শোন, গৃহস্থের ঘরের কোণে একটা বেগুন গাছ আছে। সেই বেগুন গাছে একটা টুনটুনি পাখি....
আবার চেঁচাল কুটু-'.... এটাও আমি জানি, নিজের গল্প জানো না? '
এবার এগিয়ে এল নদী, ' আমি বলি.... আমি বলি গল্প.... ' সবাই ঘিরে বসল নদীকে। নদী শান্ত হল, ঢেউ নামিয়ে গভীর হল।
- ' ছোট্ট মেয়ে রোজ এসে বসে নদীর ধারে। বসে বসে কাঁদে। তার কেউ নেই কিনা। চোক্ষের জল, বক্ষের ব্যথা সব মেশে নদীর জলে। নদী দেখে আর ভাবে কী করা যায়? পরদিন মেয়ে এলে নদী তার হাতে তুলে দেয় সাত রাজার ধন একটি মানিক। মুক্তো পেয়ে খুশী মনে মেয়ে চলল হাটে। হাটে আর পৌঁছল কী? চোর, ডাকাত, দুষ্টু লোক এতসব পেরিয়ে কোথায় যাবে সে? আবার কাঁদে মেয়ে... চোক্ষের জল বক্ষের ব্যথা সব মেশে নদীর জলে। নদী দু:খ পায়, নদী বলে-
মেয়ে হাসলে মুক্তো ঝরবে একটি
মেয়ে কাঁদলে মুক্তো ঝরবে একটি

শুনে তো মেয়ে ভারি খুশী। হাসছে আর হাসছে। টপ করে ঝরে পড়ল মুক্তো। তারপর হল কী এক জাদুকর মেয়েকে করল চুরী। তাকে বানিয়ে দিল বাগানের গাছ। দুষ্টু লোকেরা গাছকে মারে, পাতা ছিঁড়ে নেয়, ফুটিয়ে দেয় পিন, গাছ কাঁদে আর মুক্তো ঝরায়। "

নদীর গল্প শুনে কাঁদতে লাগল সবাই। কুটুর মুখ মলিন। কিছুদিন আগেই সে রবি ঠাকুর এর বীর পুরুষ পড়েছে। লাফিয়ে ওঠে সে।
"এই চেয়ে দেখ আমার তলোয়ার
টুকরো করে দেব তোদের সেরে"
সবাই তাকিয়ে দেখে কুটু চড়েছে কাঠের ঘোড়ায়। হাতে জ্বলজ্বল করছে কাঠের তলোয়ার। পাখি প্রজাপতি নদী পাহাড় ফুল সবাই খুব খুশী। কুটুই পারবে ছোট্ট বুনু কে ফিরিয়ে আনতে। নদী পথ দেখায়। কুটু ঢুকে পড়ে গল্পে। কাঠের ঘোড়া ঠকঠকিয়ে, তরোয়াল ঝনঝনিয়ে সে চলে কত জাদুর পথ, কত জাদুর রাত, কত জাদুর দুনিয়া.... সব পেরিয়ে কুটু জাদুর বাগানে পৌঁছতেই হেসে উঠল গাছ। কাছে যেতেই বুনুর হাসিতে মুক্তো, আবার সেই মেয়েটি। জাদুকর হয়ে গেল শহরের ভীতু অথচ দুষ্টু লোক। জাদু গুলো হল নিন্দে নিন্দে আর নিন্দে। তারা পিছু নেয় মেয়ের। খুব লড়াই করে সে। কুটু রয়েছে সাথে। কত অস্ত্র কত লড়াই। শেষ পর্যন্ত বুনু কে নিয়ে কুটু এল ফিরে। তাই না দেখে পাখি গান ধরে, প্রজাপতি নাচে, পাহাড় হাততালি দেয়। নদী মেয়েকে নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে নতুন ঘরের খোঁজে। কুটু তার ছবি শেষ করে।