টুকি

বৃষ্টি বাগচী



“আমরা সবার সেরা, এই কথা প্রমান করার চক্করে ধ্বংস হল দু দুটো শহর।কিছু মানুষের বদ বুদ্ধির জন্য প্রাণ গেল হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ গুলোর...।” এই সব ভাবছিল টুকি। টুকির এবচ্ছর ক্লাস নাইন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ পড়ার সময় ওর মনে হচ্ছিল কথা গুলো। ও একটা দোতলা বাড়িতে থাকে। মা,বাবা , দাদু ছাড়া আর থাকে ওর দুই কাকাই। বাবা কাজ করেন ইলেকট্রিক অফিসে। বড় কাকাই কাজের জন্য বেশির ভাগ সময়েই বাইরে বাইরে কাটান। আর ছোট কাকাই,
একজন চোর।মানে ঠিক বড় মাপের চোর না , মানে ঠিক চোরও না । আবার চোরও। কারোর জিনিষ না বলে নিলে তাকে চুরি করা বলে। অতএব তিনি চোর। হ্যাঁ , টুকির ছোটো কাকাই একজন চোর।এবং একই সাথে পাড়ার একজন দাদা। প্রত্যেক বার দুর্গা পূজার সময় তিনি চুরি
করেন। সেই সময় তিনি আশেপাশের বাড়ি থেকে গাছ চুরি করেন। রাত্রি বেলা তিনি পাড়া প্রতিবেশিদের ঘুমের সুযোগের সৎ ব্যবহার করেন। পুজো শেষে ফিরে যায় গাছেরা। সবাই ওনার এই স্বভাবের সাথে অভ্যস্ত। তাই ওনাকে ঠিক চোর বলা যায় না।
টুকির মা রান্না করতে আর লোকজন খাওয়াতে ভালবাসেন। টুকির এই ব্যাপারে মত নেই। ও চায় ওর মা চাকরী কারুক , ওর বন্ধুদের মা দের মত। সারাদিন বাড়িতে রান্নাঘরে সে মা কে দেখতে চায় না। কিন্তু এসবের মধ্যে দাদু তার সবচেয়ে প্রিয় । কারণ , দাদু আজ অব্দি ওকে বকেননি। না চকলেট খেলে, না চাঁদ দেখলে। চাঁদ যে ওকে অনেক গল্প বলে এ কথা দাদু ছাড়া কেউ বিশ্বাস
করে না। গাছের পাতা বেয়ে জল পড়ছে, রাস্তার সব গর্তে জল জমে। ঘাসেরা আজ জলের নীচে।
তাই টুকি আজ স্কুলে যাইনি। দুদিন পর গ্রীষ্মের ছুটি। এবার ওরা পুরী যাবে।পুরীর অনেক গল্প শুনেছে এবার তা দেখবে। দু দিন পর যখন ট্রেনে উঠল ঘুম এল না আর। পরের দিন সকালে শহরের মধ্যে ঢুকতে কানে এল সমুদ্রের আওয়াজ। এ সেই কলকল নদীর শব্দ না। এই শব্দ সে আগে কখনো শোনেনি । যত শহরের মধ্যে ঢুকছে তত জোর বাড়ছে শব্দের। তারপর সে তাকিয়ে দেখল বালু আর জল। সেই জলের দিকে চোখ দেওয়া যাচ্ছে না।এমন তার তেজ । তেজ জলের নিজস্ব না , সূর্য মামার তেজ এসে পড়েছে। এত রোদ্দুরের জন্য তাদের আর সেদিন সমুদ্রে যাওয়া হল না। টুকির খুব ইচ্ছে ছিল যাওয়ার , হল না। এমন সময় বাবা ডাকলেন , কাকাই এর ফোন এসেছে স্যাটেলাইট ফোন থেকে।টুকির কাকাই এর কথা খুব মনে পড়ে। কাকাই কোন সিনেমার
হিরো না। কিন্তু টুকির কাছে সে অনেক কিছু । কাকাই নিজের জন্য না অন্যের জন্য বাঁচে। তার কাকাই এর জন্যই কত মানুষ নিশ্চিন্তে থাকে। টুকি কাকাই এর সাথে কথা শেষ। সারাদিন কি ভাবে ঘড়ির কাঁটা ঘুরে এখন ঘড়িতে রাত্তির নটা । টুকির মনে হল, একটা দিন কি ভাবে নষ্ট হল। বারান্দাতে এসে, এক দারুণ দৃশ্য। রোজকার চাঁদ এ নয়। এ আরো অপুর্ব। ঢেউ এর গর্জন শুনতে পেল টুকি। এক ঠাণ্ডা হাওয়া তার গায়ে কাঁটা তুলছে। সাদা ঢেউ তার দিকে ধেয়ে আসছে অথচ ছুঁতে পারছে না ।বালির ওপরে এসেই আবার ফিরে যাচ্ছে। এ দৃশ্য কোন ক্যামেরাতে রাখা যাবে না ,থেকে যাবে টুকির মনে।
সকালে টুকির ঘুম ভাঙল এক অদ্ভুত শব্দে। বাইরে গিয়ে দেখল , ছোট কাকাই কে ঘিরে অনেক লোক। ওদের কথা শুনে টুকি আবার শুতে চলে এল। ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক। ছোট কাকাইএর ঘুমের মধ্যে চলার অভ্যাস আছে। একবার সে রাস্তায়ে ঘুমিয়েও পড়েছিল । সে বার তার ঘুম ভেঙ্গে ছিল হর্নের শব্দে। তার তিন দিন পর সে বাড়ি ফিরল। তার পাড়াতে একটা বেশ দেখতে বাড়ি আছে । তার সামনে বাগান আর আছে এক বারান্দা। কিন্তু টুকি জানে , বাইরে যা দেখা যায় তা সত্যি না । বাড়ি ভাল। কিন্তু মানুষগুলো ? তাদের মন গুলো ? উডরো উইলসন , লএড জর্জ , জর্জ ক্লেমেন্স এনারা থাকতেন সুন্দর সুন্দর বাড়িতে । চাইলেই ক্ষমা করতে পারতেন , করলেন না আর ঘটে গেল এক বিশ্ব যুদ্ধ।
সেদিন বাড়িতে দাদুর সাথে যাঁরা কাজ করতেন সেই সব বন্ধুরা এসেছেন। টুকি জানে এদের ভাষা এক না, পোশাকও আলাদা। মিল আছে মনে। সাহসী এঁরা তার বড় কাকাই এর মতই।মা ব্যাস্ত রান্নাঘরে। টুকি মা কে সাহায্য করতে গিয়ে দেখল, মার সব কাজ শেষ। বাবা আর ছোট কাকাই এর মধ্যে কি নিয়ে কথা চলেছে । শুনবে বলে বাইরে এল টুকি। বাবা ছোট কাকাই কে যত বোঝাচ্ছে এবার পুজোতে যেন গাছ চুরি না করে। কাকাই কিছুতেই মানছে না।তার মতে গাছ চুরি করা অসম্ভব। টুকি জানে ছোটো কাকাই এটাও বলবে , “ঘুমের মধ্যে হাঁটা !!!...”
মুচকি হেসে ভিতরে আসে টুকি। এখনও কানে ভেসে বেড়ায়ে সেই সমুদ্রের ডাক । আর সময় নেই, সামনেই পরীক্ষা তাই ইতিহাস বই খুলে বসে টুকি। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে কি ভাবে শেষ হয়ে গেল দুটো শহর। কত কত মানুষের প্রাণ গেল । সত্যি কি আর কোনও উপায়ে ছিল না । টুকি জানে, ছিল ।