ইস্টিশনের মেছোপেত্নী

মহুল রায়



আগেকার দিনে একটা পুরনো বাড়ি ছিল। অনেক পুরনো। একদিন আমার দাদু তখন ইলিশ মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরছে রাত এগারোটায়, না না রাত বারোটায়। স্টেশন দিয়ে যখন এইখান থেকে ওইখান পার হচ্ছে, (স্টেশনের এক প্ল্যাটফর্ম থেকে আর এক প্ল্যাটফর্মে) হঠাৎ করে পেছনে একটা বৌ মানুষের ছায়া দেখলো। দাদুর পেছন পেছন যাচ্ছে ছায়াটা। দাদু যাচ্ছে,পেছন পেছন ছায়াটাও। দাদু থামলে ছায়াটাও থামছে। দাদির তখন খুব চিন্তা হল। এত রাত এখনো ফিরলো না….মানুষটা কোথায় গেল? - খোকা তোর বাবা এখনও ফিরছে না! খোকা বলল -চিন্তা কর না মা। ঠিক বাবা ফিরে আসবে। জ্যাম ট্যাম আছে হয়ত। রাত তখন সারে বারোটা। দাদু তখনও ফেরেনি। হঠাৎ করে টিঙ্কু শুনলো বাইরের দরজায় কে যেন ঠক ঠক করছে। সে গিয়ে দরজাটা খুললো । - ভাই, মা দ্যাখ বাবা ফিরে এসেছে। দাদি বলছে - সেই কখন গেছো ,এত রাত্তির,এখন ফিরলে! দাদু হাঁফাচ্ছে। কথা বলতে পারছে না। ফিসফিস করে বলল - একটু জল দাও দেখি। খোকা বলল - এত লেট কেন বাবা তোমার? দাদু বলল - আমি যখন ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরছি,একটা বৌমানুষের ছায়া আমায় ফলো করছে। আমি যে দিকে যাই,সেও সেদিকে,আমি থামলে সেও থামছে। আমি পেছন ঘুরতেই,কেউ নেই… যাক ছাড়ো সে কথা। এখন তো মাছটা রাঁধো,খেতে খেতে সব বলছি। দাদি মাছ ভাজতে গেছে রান্নাঘরে,শুনতে পেলো কে যেন নাকি সুরে কথা বলছে - আঁমাঁয় এঁকঁটাঁ মাঁছ দিঁবিরে... কে বলল কথাটা? দাদি টিঙ্কুকে ডাকলো
- তুই কিছু বললি?
- না'তো
-খোকা কিছু বলল?
- না'তো
- তাহলে কে কথা বলল,ভয় লাগছে তোরে...রান্নাঘরের জানলার বাইরে তাকাতেই দেখলো,বড় বড় দাঁত,আগুন জ্বলছে চোখে,নাক এত লম্বা,কানগুলো হাতির মত। -জিভ লক লক করছে - আঁমাঁয় মাঁছ দিঁবিঁ? দেখেই দাদি অজ্ঞান হয়ে গেল,আঁক করে আওয়াজ করে। টিঙ্কু আর খোকা ইলিশমাছ - ভাত খেতে নেমেছে। দেখে মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। ওরা চীৎকার করে বাবাকে ডাকলো। দাদির মুখে জলের ঝাপটা দিতে,দাদি চোখ খুললো। দাদির মুখ দিয়ে বেরুলো -ভুউউত। দোতলায় নিয়ে এসে শুইয়ে দিলো দাদিকে। দাদির মুখ থেকে সব শুনলো দাদু,টিঙ্কু,খোকা। দাদু বললো - টিঙ্কু মাছগুলো ভাজতে হবে,তুই যা,রাত হল। ভয় লাগলে ডাকবি আমায়। টিঙ্কু নীচে গিয়ে মাছ ভাজতে যাবে যেই অমনি দেখে একটা হাড়ের হাত এসে মাছ তুলে নিচ্ছে। সেই দেখে টিঙ্কু, -উরি বাবারে বলে অজ্ঞান। দাদু আর খোকা তখন দৌড়ে নীচে নেমে দেখে এই অবস্থা। দাদু তখন হাতের কাছে জল না পেয়ে স্প্রাইট দিয়েই টিঙ্কুর মুখে ছড়িয়ে দিলো।

টিঙ্কুর জ্ঞান ফিরলো সেও বলে -ভুউউত। আর স্প্রাইট চাটছে চুক চুক করে। দাদুর তখন খুব রাগ

- বলে তোরা কি শুরু করলি বলতো। ভুত বলে কিছু নেই। - দাঁড়া আমিই ভাজছি বলে দাদু এবার নীচে নামলো। ভাজতে যাবে এমন সময় শোনে,নাকি গলায় কে যেন বলছে, - তুঁই খুঁব বঁদমাঁস। সেঁই ইঁস্টিশঁন থেঁকে তোঁর কাছে মাঁছ চাইছি,তুই দিঁচ্ছিস নাঁ...দাদু খুব সাহসী,বললো
-কে তুমি?
- ইঁস্টিশনের পেঁত্নী আঁমি

তোঁদের সঁবার যঁম

মাঁছ দেঁ শীঁগগির

নইলে চিবিয়ে খাবো, হুম


-কি চাও তুমি?
- মাঁছ খাঁবার খুঁব লোঁভ। মাঁছের কাঁটা গঁলায় ফুঁটে আঁমি মাঁরা গেঁছিলাম।
দাদু তখন বাটি শুদ্ধু মাছ জানলার ধারে রাখলো। আর যেই না রাখা,ব্যস মাছ ভ্যানিশ।


এরপর দাদু মাছ এনেছে ওই বাড়িতে। কিন্তু রাত্তিরে আর আনেনি। ইস্টিশন পেরিয়েও আনেনি। এরপর ওরা সুখে শান্তিতে ঘর কন্যা করতে লাগলো। আর মাছ আনলে উঠোনে নিমগাছের নীচে ক’পিস মাছ আগে দিয়ে তারপর রান্নাবান্না করে।
আমার কথাটি ফুরলো,নোটে গাছটি মুড়লো।

তোমরা সবাই ভালো থেকো সুখে থেকো বন্ধুরা।
*টিঙ্কু - মহুলের পিসি
*খোকা-মহুলের বাবা

*আগেকার দিনের বাড়ি – মহুল যে বাড়িতে থাকে,১০০ বছরের পুরনো