ঘুমগাছের ডালপালা

শান্তনু ভট্টাচার্য



গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে নয়ন। গাছটা খুব বড়ো নয়। তার ওপর দিকের ডালগুলো থেকে কয়েকটা নতুন শাখা বেরিয়েছে। নতুন ডালের গায়ে ক-টা সবুজ-হলুদ কচি পাতা! এগাছে যে ফল ফলে তার রং সাদা। এই গাছের ডালে পাখিরা এসে বসামাত্র ঘুমিয়ে পড়ে। কাঠবেড়ালি, গিরগিটি, প্রজাপতি, মৌমাছিরা এই গাছের ডালপাতায় বসে চোখ বোজে। ঘুমের ভেতর তারা স্বপ্ন দ্যাখে।
কিন্তু কী স্বপ্ন,তা জানা যায় না।যারা স্বপ্ন দ্যাখে তারা তো আর কথা বলতে পারে না! ঘুমের ভেতর দেখা স্বপ্নের কথা তারা মানুষকে জানাবে কী করে! তবে ওরা নিজেদের মধ্যে নিশ্চয় সেই সব স্বপ্ন নিয়ে গল্পে মাতে।কার ঘুম ভাঙার পরেও ওরা গাছ ছেড়ে যায় না।
পাতার আড়ালে বসে পাখিরা কিচিরমিচির করে,কাঠবেড়ালিরা লেজ নাড়ায়,গিরগিটিরা ডানে-বাঁয়ে তাকায়,প্রজাপতিরা ডানা কাঁপায় একে অন্যের কাছাকাছি বসে। শুধু পাখি,সরীস।
শুধু পাখি,সরীসৃপ,পতঙ্গ নয়,এই গাছ ছুঁলে মানুষেরও ঘুম পায়,সে ঘুমিয়ে পড়ে,ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দ্যাখে--
দানিদাদু,যার নাম ড্যানিয়েল বিশ্বাস,যে যিশুর পুজো করত; সে-ই নয়নকে এই ঘুম গাছ চিনিয়েছিল। কেন এটা ঘুমগাছ তা বলেছিল। নয়ন দেখত দানিদাদু এই গাছের তলায় শুয়ে কেমন ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকছে।
একবার ঘুম থেকে উঠে ওকে দাদু বলেছিল,জানিস,কি সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম! দেখলাম, একটা বাঘকে আমি গামছায় বেঁধে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।নিজের হাতে এই গাছ বসিয়েছিলাম বলেই না স্বপ্নটা দেখলাম।
তখন নয়ন পাঁচ কিংবা ছয়। আর দানিদাদু! আশি-নব্বই বা একশ-দেড়শ-দুশও হতে পারে,না হলে কারও মাথায় অত সাদা চুল হয়!
আরও বড়ো হয়ে নয়ন জানতে পেরেছিল দানিদাদুর অত বয়স নয়। দেড়শ-দুশ বছর কোনো মানুষ বাঁচতে পারে না। দানিদাদুও বাঁচেনি,আশিতেই তাকে মাটির নীচে শুইয়ে দেওয়া হয়। আরও জেনেছিল,এই ঘুমগাছে এসে কোনো পাখি,প্রজাপতি, কাঠবেড়ালি, গিরগিটি ঘুমিয়ে পড়ে না, স্বপ্ন দ্যাখে না। এই গাছ দানিদাদু বলতো,এটা একটা জামরুল গাছ।
সিমেন্ট বাঁধানো রোয়াকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল নয়ন। লাল রোয়াকের ওপর একটা সাদা পালক পড়ে আছে। তার ঠিক পাশেই সিমেন্টের ওপর ইংরাজিতে লেখা ড্যানিয়েল বিশ্বাস। সিমেন্ট দিয়ে যখন রোয়াকটা মাজা হচ্ছিল তখনই বোধহয় কাঠি বা পেরেক দিয়ে নামটা লেখা হয়েছে। কে লিখেছে ? দানিদাদু নিজে, নাকি অন্য কেউ!
নয়ন সাদা পালকটা কুড়িয়ে নিল। বাড়ি গিয়ে পালকটা রেখে দিল বইয়ের পাতার ভাঁজে। সবকিছু গোছানো হয়ে গেছে। নয়নকে এবার ওর বইগুলো গুছিয়ে নিতে হবে। বাড়ির অনেক জিনিস আগেই চলে গেছে। যা কিছু এখনও রয়ে গেছে তা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যাবে। তারপর নয়নরাও বেড়িয়ে পড়বে।
নয়নরা চলে যাচ্ছে। পুরোনো আমলের, পলেস্তরা খসা এই একতলা বাড়ি ছেড়ে অন্য পাড়ার একটা বাড়িতে। সে বাড়িটাও ছোটো,একতলা। তবে তার দেওয়াল খুব সাদা !
যাবার সময় নয়ন দেখল মায়ের চোখে জল। মা বলছে - কত দিন আমরা এখানে ছিলাম,কত স্মৃতি! বাবা বলল, কেঁদে কী করবে ! মানুষ কি কখনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে ! তাকে স্থান বদল করতেই হয়। শুধু কি এই বাড়িটা ভাঙা হবে; দানিকাকাদের বাড়ি,তার পাশের ওই জমি - গাছপালা সব ভেঙে বড়ো বাড়ি উঠবে। কত নতুন মানুষ আসবে এখানে!
মা বলল, শুধু আমরাই থাকব না। বাবা বলল,দানিকাকার একটা কথা এখনও আমার মনে আছে। কাকা বলত, পৃথিবীটা আসলে একটা বিরাট গাছ, কখন যে তার কোন ডাল ভেঙে পড়বে, কেউ জানে না। তবে তার জন্য দুঃখ পাবার কিছু নেই, দেখবি গাছের কোনো একটা ডাল থেকে আবার নতুন শাখা বের হচ্ছে।
ঠিকই। একবার এই কথাটা দানিদাদু ওকেও বলেছিল, এখন কথাটা মনে পড়ে গেল ওর। নয়ন রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। একটু পিছনে বাবা - মা। দানিদাদুর বাড়ি পেড়িয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ঘুমগাছ ! বাবার ডেকে আনা হলুদ ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে আছে গলি - রাস্তার মাথায়। সেদিকে না গিয়ে নয়ন গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরও ক-পা এগিয়ে গাছটার ডালে হাত ছোঁয়াল।

মা ট্যাক্সিতে উঠে পড়েছে। বাবা ওকে ডাকছে। নয়ন হেঁটে গিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে মায়ের পাশে বসে পড়ল। ট্যাক্সি ছুটছে। নয়নের ঘুম পাচ্ছে। ঘুম তো পাবেই, ও যে ঘুমগাছে হাত ছুঁয়েছে। নয়ন ঘুমিয়ে পড়ছে।।⁠⁠⁠⁠