বিপ্লবী হুতু

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ





হুতুউউউ..এই হুতু..বলটা খুঁজে বার করে দে শিগগির ! হুতুর মা ক্ষেপে উঠলো। স্পঞ্জের বলটা আবার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ক'দিন মামাবাড়িতে মায়ের সঙ্গে দাদুনকে দেখতে এসে একটু লাগামছাড়া ভাগ্নে হুতু । দাদুনের হাতের আঙুলের এক্সারসাইজ করার জন্য স্পঞ্জের বলটা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই নিয়ে মায়ের হাঁকডাক শুনে বিপদ আন্দাজ করে মুখে শুকনো হাসি টেনে ইনিয়ে বিনিয়ে হুতু বললো , কী মা ? কী হয়েছে ? কী পাচ্ছো না ? মা বললো , দাঁড়া , তোর একদিন কি আমারই একদিন । কতবার বলেছি দাদুনের ফিজিওথেরাপির বল জায়গামতো রেখে দিবি। দরকারি জিনিস নিয়ে খেলবি না। তবুও বলটা নিয়ে খেলেছিস ? এখন যেখান থেকে পারিস খুঁজে বের কর। তোর মামারাই তোকে মাথায় তুলেছে । মুখ কাঁচুমাচু করে হুতু বললো , আমি কিছু করিনি। মেনি তো তখন খেলছিলো । মা শুনে চিৎকার করে উঠলো , মেনি ! ওই বিড়ালটা কি আর বল আস্ত রেখেছে ? হুতুমপেঁচার মতো হুতু বললো , মেনি তো খেলছিলো । মেনির দোষ । আমাকে বলছো কেন ? মা যখন লাঠির খোঁজ করছে সেই সময় স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যাওয়ার পর বাড়ি ফিরলো বড়মামা। জুতো মোজা খুলতে খুলতে বললো, কী হয়েছে রে হুতু ? তোর মুখটা অমন থোপসানো টমেটোর মতো লাগছে কেন রে ? মা ওদিকে সিঁড়ির ঘরে হুঙ্কার দিতে দিতে লাঠি খুঁজে চলেছে।
কিছু একটা ঘটিয়েছে বাড়িতে কীর্তিমান হুতু নিশ্চিত । হাত ধরে নিজের ঘরে তাকে নিয়ে গেলো বড়মামা। বললো , কি রে হুতু , আজ আবার কী অপকর্ম করলি ? তোর মা তো একেবারে তেলেবেগুনে হয়ে রয়েছে। এক হাতের আঙুল দিয়ে আরেক হাতের আঙুলের নোখ খুঁটতে খুঁটতে হুতু বললো , বিপ্লবী হওয়া কি খারাপ , বলো না ভোদুমামা ? শিক্ষক বড়মামা যেন আকাশ থেকে পড়লো । বললো, সেকি রে ! বিপ্লবী হওয়া খারাপ হতে যাবে কেন ? কী ব্যাপারটা আমাকে খুলে বল তো ? হুতু বড় বড় চোখ করে বললো, অনেক ইংরেজকে তো বিপ্লবীরা বোম মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলো। তাই না ভোদুমামা ! আজ আমি বিপ্লবী আর মেনি ইংরেজ হয়ে যুদ্ধ করছিলাম । দাদুনের স্পঞ্জের বলটা আমার বোম । মেনি ইংরেজকে যেই না বোম মেরেছি আর তখনই মেনি ইংরেজ ওর নখ দিয়ে আঁচড়ে দাঁত দিয়ে কামড়ে বলটা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দিয়েছে। আমার কী দোষ বলো ? আচ্ছা ভোদুমামা , এখন তো আর আমাদের দেশে ইংরেজ নেই । ভারতমায়ের আর কোনও বিপদ নেই । ভারত মা'কে মুক্ত করারও দরকার নেই ।আর আমার বিপ্লবী হওয়া হবে না। তাই না গো ভোদুমামা ? ক্লাস ফোরের হুতু ভাগ্নে বিপ্লবী হবে , এ তো যেমন তেমন কথা নয় । চুপ করে এতক্ষণ সব শুনছিলো ভাগ্নের কথাগুলো। এবার নিরবতা ভেঙে ভোদুমামা বলে উঠলো , তোর কেন মনে হল তুই বিপ্লবীই হবি ? হুতু উত্তর দিলো বিপ্লবীরা মা'কে ভালোবাসে , মা'র কষ্ট তারা সহ্য করে না। তোকে এসব কে বললো ? ভোদুমামা জিজ্ঞেস করতে হুতু বললো , আমাদেরকে স্কুলে বাংলা পড়ান মধুবনী আন্টি ফিফটিনথ্ আগস্টে বলেছেন।
একটা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে ভোদুমামা বলতে শুরু করলো , ঠিক আছে হুতু , এখন থেকে তুই নিজেকে একজন বিপ্লবী বলে জানবি। তোকে বলে রাখি , স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীরা দীক্ষা নিতেন দেশমাতাকে স্বাধীন করার জন্য । তোর দীক্ষা নেওয়া হয়ে গেছে । হুতু অবাক হয়ে বললো, হ্যাঁ ! কেমন করে হলো ! কখন হলো ! ভোদুমামা বলে চললো , এখন আর ইংরেজ নেই ঠিকই । কিন্তু তার চেয়ে কম বিপদের মুখে নেই রে আমাদের দেশ মা। শুনতে শুনতে হুতুর মুখটা ক্রমশ দৃঢ় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগলো। ভোদুমামা বলে যাচ্ছে ,আমাদের মেধাবী ভালো ছেলেরা দুষ্টু লোকের পাল্লায় পড়ে খারাপ হয়ে যাচ্ছে । ওরা বুঝতেও পারছে না যে, দুষ্টু লোকের পাল্লায় পড়েছে । ওদের দিয়ে সমস্ত দেশে , সারা পৃথিবী জুড়ে অশান্তি আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে খারাপ লোকগুলো । একজন আরেকজনের সঙ্গে এক হয়ে মিলেমিশে না থেকে একে অন্যের সঙ্গে লড়াই করছে। অনেক রকম লোভ দেখিয়ে আমাদের দেশের সম্পদ , তথ্য বিদেশি দুষ্কৃতীরা নিয়ে নিচ্ছে । দেশের বহু পুরনো ঐতিহাসিক আবিষ্কারের মুদ্রা, পুথি , দেবদেবীর মূর্তি , পেইন্টিং চুরি করে নিয়ে চলে যাচ্ছে। এমনকী রবিঠাকুরের নোবেল পুরস্কারের মেডেলটাও বাদ রাখেনি। ভারতবর্ষ স্বাধীন দেশ হলেও এখন এইরকম নানা ধরণের বিপদের মুখে পড়ে ক্রমশ অন্ধকার থেকে আরও গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে তোর মা - আমার মা - আমাদের সবার ভারত মা। কথার মাঝখানে হুতুর ছোট্ট অমল মুখটা দু'হাতে ধরে তারপর ভোদুমামা বললো, সেই জন্য তুই , তোর মতো ছেলে মেয়েদের এখন থেকে বিপ্লবী হওয়া একান্তই জরুরি। বিপ্লব ঘটাতে হবে এইসব ক্ষতিকর বিপদের বিরুদ্ধে । এমন বিপ্লবের হাতিয়ার আজ আর বোম নয়। চাই জ্ঞানের আলো । তরবারির মতো যা বিপদের ঘন অন্ধকারকে চিরে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে দেবে। সেই আলোতে ঠিক ভুল , ভালো মন্দ যাতে চিনতে পারে মানুষ । যদি বা কেউ ভুল করে , অন্যরা যেন তাকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনে আবার তার ভুলটা সুধরে দিয়ে। কথা শেষ করে হুতুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল ভোদুমামা।
হুতু এবার ভোদুমামাকে জড়িয়ে ধরে বললো , দাদুনের জন্য আরেকটা স্পঞ্জের বল কিনে দাও..আর নষ্ট করবো না...।