বর্ণ, রহিমা খালা আর মা

কাজী লামিয়া



আকাশে আজ অনেক মেঘ করেছে। মনে হয় খুব বৃষ্টি হবে। হয়তো ঝড়ও হতে পারে। জানালা দিয়ে বাইরেটাকে বেলা বারোটা না। সন্ধ্যে সাতটার মতো মনে হচ্ছে। আর এক ঘন্টার মধ্যেই স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার কথা। ক্লাসে বসে মনে মনে ভাবছিলাম, " ইস্.... আজকে যদি স্কুলটা একটু আগে ছুটি হয়ে যেতো, কত্তো ভালো হতো! একটু আগে বাড়ি ফেরা যেত। " কিছুক্ষণের মধ্যেই হুট করে বৃষ্টিটা নেমে গেল।

হঠাৎ পাশ থেকে রাহাত বললো, " আজকে স্কুলটা আগে ছুটি হয়ে গেলে আমরা মাঠে গিয়ে খেলবো বৃষ্টিটা কমে গেলে। কি বলিস?" আমি বললাম, "এই কাদায় তুই মাঠে গিয়ে খেলবি! সর্দি হলে ?" " ধুর্! কেমন বড়দের মতো কথা বলিস"- মুখ ভেংচে বললো রাহাত আর তখুনি ক্লাসে বাংলা মিস ঢুকলেন, " স্টুডেন্টস্ , ভারি বর্ষণের কারনে স্কুল কর্তৃপক্ষ আজ নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি ঘোষনা করেছে। তোমাদের যার যার দরকার অপিস রুম থেকে বাড়িতে জানিয়ে দিতে পার অথবা ক্লাসরুমে চুপ করে বসে থাকতে পারো। কিন্তু কেউ বের হয়ে বৃষ্টিতে ভিজবে না " নোটিশ শোনা মাত্র সবাই খুশীতে চিৎকার করে উঠল.... সবার মনের ইচ্ছে পূরণ হলো বলে!

" এই, চল চল চল.. আজকে আমরা সবাই মিলে বৃষ্টিতে ভিজি!", সাদমান বললো।
" চল্!", বলেই গৌরব, সাদমান, রাহাত একদৌড়ে মাঠে নেমে গেল। কী বৃষ্টি.. মাঠ ভাসছে। ওরা মাঠে গড়িয়ে, ডিগবাজি খেয়ে খেলছে। " এই বর্ণ, চল্ না আমাদের সাথে ! চল না প্লিজ বর্ণ?" রাহাত, আমি বললাম, " এভাবে ভিজলে মা খুব বকবে আমায়। তোরা খেলছিস খেল।"

" আচ্ছা! ", বলেই আমাকে এক হেচকা টান দিয়ে টেনে মাঠে নিয়ে গেল রাহাত। এই প্রথম, আমি বৃষ্টিতে ভিজছি বন্ধুদের সাথে। খুব ভালো লাগছিলো। স্কুলে যাওয়া আসার সময়টা সবসময় রহিমা খালা সাথে থাকে। আর সেই সময় রাস্তার ঝঞ্জাট পার করে বাড়ি ফিরতে পারাই অনেক বড় যুদ্ধজয় মনে হয়। আর মা, বৃষ্টি হলে মা তো ঘর থেকে বেরুতেই দেয় না! কাদার মধ্যে খেলতেও যে কী মজা। রাহাত কোথা থেকে একটা ফুটবল জোগাড় করল.. এখন আমরা বৃষ্টিতে ফুটবল খেলছি। খুব আনন্দ তবু থেকে থেকে আমার একটু ভয় ভয়ও করছে। রহিমা খালার বকুনি তো আছেই আর তারপর.. মাকে বলে দিলে মাও তো.. মা রেগে গেলে কী ভীষণ যে মারে। এসব ভাবতে ভাবতেই রহিমা খালাকে স্কুলের গেটে ঢুকতে দেখা গেল। খালাকে দেখামাত্র ভয় শুরু হলো আমার। মাঠ ছেড়ে উঠে এলাম বারান্দায়। "ওমা! একি অবস্থা! এইভাবে কেউ ভিজে এই বৃষ্টিতে? জ্বর আইবো তো। তুমি গাধা নাকি... বৃষ্টির মধ্যেই খাড়ায় আসিলা যে? ভিতরে গিয়ে বসলেই তো হইতো! আমি তো আইতেসিলাম এহনি। "

" আমি তো ভিজে ভিজে রাহাতদের সাথে বল খেলছিলাম। দ্যাখো ওরা এখনও খেলছে। "
আমার আঙুল বরাবর চোখ ঘুরিয়ে রাহাতদের দেখে খালার কী যে হলো, হুঙ্কার দিয়ে বলল" কি কইলা? তুমি ইচ্ছা কইরা ভিজসো ? আইজ খালি মা ঘরে আসুক.... তারপর বুজবা।", রহিমা খালাকে দেখতে ঠিক রাক্ষুসীর মত লাগছে। মনে মনে ভেংচে দিয়ে ভাবতে লাগলাম, ওরা খেলতে পারে আমি কেন নয়? রাস্তাতেও খুব জল জমেছে। আমার শীত লাগছে খুব। একটা রিক্সাও কোথাও যেতে চাইছে না। রহিমা খালা অনেক কষ্টে একটা রিক্সা জোগাড় করল। রাগ রাগ মুখে আমাকে রিক্সায় তুলল। বাড়ি পৌঁছে দেখি, লিরিক ঘুমিয়ে আছে। লিরিককে সুড়সুড়ি দিয়ে ঘুম থেকে জাগাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু রহিমা খালা.. সারাদিন কেবল আমাকে বকে। লিরিককে ঘুম থেকে তুললে আরো বকবে। লিরিক আমার চাইতে তিন বছরের ছোট। কিন্তু আমরা দুজন অনেক রকম খেলা খেলি একটুও ঝগড়া না করে। ওর ঘুম ভাঙ্গলে খেলব বলে ওর পাশে আমি শুয়ে থাকি। একটু পর যখন লিরিক উঠে যায় তখন ওকে কানে কানে বলি, "চল্ দুইজনে লুকোচুরি খেলি। খেলবি?" লিরিক রাজি। প্রথমে ও লুকালো, আমি খুঁজে বের করলাম। পরের বার আমি লুকালাম,ও খুঁজে বের করলো। আবার লিরিক। ওকে খুঁজতে খুঁজতে বাবা আর মায়ের রুমে ঢুকলাম। হঠাৎ পিছন থেকে হুড়মুড়িয়ে কিছু পড়লো যেন। পিছনে ঘুরতেই দেখি লিরিক পড়ে গেছে। শেলফের ওপরে উঠে লুকাতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে গেছে।
" তুই ওখানে কি করছিলি?! ব্যাথা পেয়েছিস? কোথায় পেয়েছিস? দেখি!"
লিরিক তখন জোরের সাথে কান্না শুরু করে দিল। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলো, "পায়ে আর মাথায় অনেক ব্যথা পেয়েছি, ভাইয়া!!"
ওদিকে লিরিকের কান্না শুনে দ্রুত রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছে রহিমা খালা। লিরিককে কোলে নিয়ে ওর পায়ে বরফ লাগিয়ে দিতে দিতে আমার দিকে চোখ বড় বড় করে বলছে, "এই ছেলেডা সবকিছুর মূল! এত বড় ছেলে, নিজের খেয়াল তো রাখতে পারেই না, ছোড বইনডারেও ব্যথা দেয়। কি দরকার ছিলো এইসব বাজে খেলা খেলনের? ছোড বইনরে ব্যথা দিয়া এহন তোমার শান্তি হইছে?!"

আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। খুব মন খারাপ লাগছে, মনে হচ্ছে আমারই জন্য এমন হলো। রহিমা খালা এখনো খুব বকছে। আমি তো ইচ্ছে করে কিছু করিনি.. রহিমা খালা সেটা মানলে তো..কেবল আমাকে বকে যাচ্ছে। শীত করতে শুরু করলো আবার। মাথাও কেমন ব্যথা করছে। জ্বর এলো... এবার? লিরিকটা ব্যথা পেয়েছে আমার জন্য। মা কিছুতেই মানবে না। আর যদি শোনে স্কুলেও অত ভিজেছিলাম তাহলে মা তো আমায় আজ সত্যি সত্যি মারবে। আটটায় মা অফিস থেকে বাড়ি ফেরে। তার আগে যদি শীত কমে যেত....হঠাৎ পাশের ঘর থেকে মার গলা ভেসে এলো। আটটা কি বেজে গেলো.. ভয় করছে, ঘড়িটা কই.. কিছুক্ষণ পর রহিমা খালা মাকে নিয়ে আমার রুমে ঢুকলো, "দেখেন আপা! লিরিকডারে এইরকম একটা ব্যথা দিয়া আপনার পোলা এখন ঘর আন্ধার কইরা ঘুমায়! কত ডাকলাম, সাড়া দেয় না। বইনের জন্য কোনো আফসোস, অপরাধ বোধ কিচ্ছু নাই এর!"

রহিমা খালার কথা শেষ হতেই মা বললো, "কী ব্যাপার, বর্ণ? কী শুনছি এইসব?"

মার কথায়, গলা শুকিয়ে কাঠ। মা বলল কী ব্যাপার উত্তর দাও! আলো জ্বেলে দিল রহিমা খালা। মা আমাকে উঠে বসতে বলছে। আমি বিছানায় উঠে বসছি কিন্তু কেমন যেন সব ঘুরছে। মা বলছে,” বলো কেন ব্যথা দিয়েছ লিরিককে? অত বড় ভাই, দায়িত্ববোধ তো নেই, আবার ব্যথা দিয়ে নিজে আরামসে ঘুমাচ্ছো.. কথা বল.. কেন ব্যথা দিলে বল”..
আমি জল খাবো বলতে চাইলাম। মাকে দেখতে পেলাম না।

কতক্ষণ পর আমি চোখ খুললাম..দেখি ডাক্তার আংকল ওষুধ লিখছে। আমাকে চোখ খুলতে দেখে মা বলল, "এত জ্বর গায়ে কাউকে বলবি না! রহিমাকে কেন বলিসনি..”

রহিমা খালা আমার মাথার কাছ থেকে বলে উঠলো.. “এর কুনোদিনও গিয়ান বুদ্ধি হইব না আফা..”

মা রহিমা খালাকে ধমকে বললো, “তুমি চুপ কর”
আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো.. “জ্বর কমে যাবে এখুনি।”