দেখার ওপারে নীল একটা কার কথা

বৈভবী চক্রবর্তী ও নীলাব্জ চক্রবর্তী





- বাবা, তুমি একা থাকতে ভালবাসো ক্যানো?
- উঁ... ঠিক জানিনা ভ্যানোপ্রসাদ...
- উহহ, সবসময় অন্যমনস্ক... আমার সাথে তো কথাই বলতে চাইছ না... বলো ঠিক করে। ক্যানো তুমি একা থাকতে ভালবাসো?
- আররে... এই তো। কই অন্যমনস্ক? কি জানি, হুঁ... আসলে হয়তো আমি না, একা থাকা ব্যাপারটা আমায় ভালোবাসে রে...
- ওহহো... তোমার খালি ওইসব কথা... সেই যে বাজার কাকে বলে বলেছিলে একবার, যে দরজাটা শুধু একদিকে খোলে না কি যেন... ওইটা মনে পড়ল...
- হুঁ।
- আচ্ছা, তুমি কি ওই দরজাটা খুঁজে পেয়েছে বাবা?
- হা হা হা... না রে। খুঁজি না তো ওই দরজাটা। তবে না খুঁজেই পেয়ে গেলে হয়তো এতদিনে একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলতাম... সেই যে, ‘… অথবা একটি Cinema-র সন্ধানে’...
- না খুঁজলে পাবে কি করে ! আর তাহলে? সিনেমা হবেনা বাবা?
- কি জানি। দেখি।
- আর কবে তুমি সিনেমা বানাবে বাবা? আমি তো সেই ছোটবেলা থেকে শুনছি। কতো বড়ো হয়ে গেলাম। এবার আমার ন’ বছর হবে। ভাবো...
- হ্যাঁ, তাইতো। ঠিকই। দেখি। কখনো... কোনোভাবে... তবে...
- কি?
- একটা জানলা পেয়েছি। অন্যরকম। দেখাবো তোকে...
- কোথায়?
- বেশী দূরে না রে। কাছেই। ওই তোর সেই হাট্টিমাটিম গাছের রাস্তার কাছেই... আরও একটুখানি ওখান থেকে... একটু অন্যদিকে...





! @ # $ % ^ & * ( ) _ + < > > < + _ ) ( * & ^ % $ # @ !

কোনও চিহ্নের মানেই আমি বুঝতে পারিনি
তোর মতো করে
স্মৃতির বাইরে গিয়ে
দু’প্রান্তের একইরকম যাতায়াত
আয়নার কতোটা কাছে
জল ফিরে গ্যাছে ভাবিনি
বরং তিনটে মাত্রাওয়ালা একটা কাগজের কথা
তোর জন্য ভাবি
আলো ভেঙে ফেলছি এভাবে
আর উল্টে যাওয়া পারদের পিঠ জুড়ে
কথার রূপ দেখছি আসলে
তুই রূপকথা ভাবছিস...






- ওই দ্যাখ। বুঝতে পারছিস ?
- এটাই সেই জানলা! আমাদের বাড়ি থেকে অ্যাতো কাছে! কোনদিন দেখিনি তো আগে!
- এই তো আজ দেখা হয়ে গ্যালো... আমিও বেশীদিন আগে দেখিনি। কি জানি, এই জায়গাটা বোধহয় একটু অন্যরকম ছিলো আগে...
- কি অদ্ভুত জানলা। দু’দিকেই আকাশ! দেখার ভেতর কোনটা বাবা? দেখার বাইরে কোনটা? এখানে তুমি সিনেমা বানাবে? ফিল্ম? শুটিং হবে... বাবা, ক্যামেরা কোথায় বসবে?
- ক্যামেরা তো এখনও স্বপ্নের মধ্যেই বসে আছে রে ভ্যানো...



“I love dreams, even when they're nightmares, which is usually the case. My dreams are full of the same obstacles, but it doesn't matter”--- Luis Bunuel

স্বপ্ন – ভ্যানোপ্রসাদ

নাকি তখন আমাদের মিউজিক ক্লাস হবে। আমি একা একা একটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে উঠে যাচ্ছি যাচ্ছি... রাজেশ্বরী অদিতি আহেলী কেউ তো নেই। তারপর মনে হোলো মিউজিক রুম তো দোতলায়... আমি তো অনেকদূর উঠে এসেছি... জানলা দিয়ে দূরের একটা হাট্টিমাটিম গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। সিঁড়িটা শেষ হয়ে আসছে এবার। একটা ঘর আছে মনে হয়। আচ্ছা ভালো কথা। তারপর আমি দেখলাম কি সিঁড়ির শেষে একটা বড়ো ঘর... তারপর আর কিছু নেই কিন্তু। ছাদ। ঘরটায় গিয়ে দেখি অন্য অন্য বাচ্চা অন্য অন্য ম্যাম... আমি তো কাউকেই চিনি না এদের... আমি কোথায় চলে এলাম? দেখি ঘরের মেঝেটা সাদা আর কালো খোপ খোপ... একটা সাদা আর একটা কালো... একটা সাদা আর একটা কালো... স্কোয়্যার স্কোয়্যার... অগি আছে না অগি... ওই যে বেড়াল অগি... টিভিতে দ্যাখায় ফোর জিরো থ্রি মানে সি এন চ্যানেলে ... ওই অগির ঘরের মেঝের মতো মেঝে একদম... চেসবোর্ডের মতো... আর আর... ঘরে একটা নীল রঙের ফ্রিজ আছে... নীঈঈঈল রঙের... এখন কি বিকেলব্যালা? এখন আমার স্কুল ক্যানো? এই বাচ্চারা কারা? এই ম্যাম দুজন কারা? আমি তো কাউকে চিনি না। বাচ্চারাও মনে হোলো আমায় কেউ চেনে না... সবাই কালো কোট পরে আছে... আর তাতে হলুদ ব্যাজ। কিন্তু আমার তো স্কুলের ড্রেস। ম্যামরা পিঙ্ক কোট। একজন ম্যাম আমায় চিনতে পারলো... বললো, এসো বৈভবী, ইউ আর লেট। মনে হোলো আমাকেই বললো কিন্তু অন্য একজন আমার পাশ দিয়ে চলে গ্যালো। এ কোথা থেকে এলো? আমি তো একা একাই সিঁড়ি দিয়ে... তারপর দেখি সব বাচ্চারা ওই অগির মেঝের মতো মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে কালো কোট পরে... সবাই হামাগুড়ি দিচ্ছে... তার মধ্যে একটা বাচ্চা আমার খুব চেনা চেনা মনে হোলো... সে হাসলো আমায় দেখে। আর কেউ আমায় দেখতে পাচ্ছে না। ম্যামদের হাতে একটা সাদা স্টিক। সব বাচ্চা ভয় পাচ্ছে। ওই বাচ্চাটা আমায় দেখে হাসলো ক্যানো? ওই বাচ্চাটা আমার অতো চেনা চেনা ক্যানো? আমার হঠাৎ মনে হোলো আমার পেন্সিল-ইরেজার-কালার বক্স-শার্পনার সব সব হারিয়ে গেছে... এই মিউজিক ক্লাসে আসার আগে আমি সব হারিয়ে ফেলেছি... আমার ভয় লাগছিলো... আমার ঘাম হচ্ছিলো... তারপর ওই বাচ্চাটাকে আমি চিনতে পারলাম... একদম আমার মতো দেখতে... ওকেই ম্যাম ডেকেছিলো? ও-ই বৈভবী? আমার খুব ভয় লাগছিলো... আমি চিৎকার করছিলাম...
------------------------------
ছবিসূত্র –

১) বৈভবী চক্রবর্তী (এখন ক্লাস-থ্রি)-র করা স্কেচ। তিন বছর আগের। তখন কে.জি.-তে পড়ত।
২) বৈভবী-র করা। পেইন্ট-এ। তখন ক্লাস ওয়ান।
৩) নীলাব্জ চক্রবর্তী-র নেওয়া ফোটোগ্রাফ।