পরিবার-পরিজন

শতাব্দী দাশ



এক যে ছিল মেয়ে। সোহাগের ক্ষীরপুতুল। উমরো-ঝুমরো চুল তার। শ্যামলা রঙ। হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নেচে বেড়ায়। দুলে দুলে গান গায়। চোখ বড় বড় করে কথা কয়। পলক ফেলতেই ভ্যানিশ হয়। পাখির মতো ফুড়ুৎ।

এক যে ছিল তার মা। সদা-ব্যস্ত। ব্যতিব্যস্ত। “ওরে কোথায় গেলি? ওরে বিচ্ছু, ওরে পাগল! কোথায় তুই? খাটের তলায়? বেরো বলছি! বেলা যায়!”

এক যে ছিল মুমতা্জ। রান্নাঘর থেকে সে হেসে ফেলে। “মেয়ের দুধ গরম হয়ে গেল, দাঁত মাজা হল না বৌদি?” টয়লেটে কুস্তোকুস্তি চলছিল। মায়ের ভ্রূ কুঁচকে ওঠে। ‘বৌদি’ মানে জিগ্যেস করছিল মেয়ে একবার। কাঠের দুটো বৌ-পুতুল আছে শো-কেসে। তাদের বলাছিল, “ও বৌ, তোমরা মুন্তাজের দিদি?”

সে যাক্গে, যাক্। এ যে ছিল মিতামাসি। ঠিক আটটায় সে রোজ কলিংবেল বাজায় আর হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে। মিতামাসির টুপটুপে নরম মন। মিতামাসির ঘাড়ে স্পনডাইলোসিস। মিতামাসির হাতে মেয়ের নরমসরম হাত, মনখারাপিয়া চোখ, বাড়ির চাবি দিয়ে মা বেরিয়ে যায়।

মা চলে যাবার বেলায় রোজ মেয়েটার গলার কাছে টনটন করে। মিতামাসি হয়ত তখন একনাড়ু ভাত গুঁজে দিয়েছে মুখে। গলা টনটনের চোটে ওয়াক্ ওঠে তার। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোজ ‘কাঁদব না’ ভেবেও ভ্যাঁ করে দ্যায় মেয়ে।

ইস্কুলের গাড়ি আসতে আসতে অবশ্য দুঃখু-টুঃখু ভোঁ-ভাঁ। তার আগেই ভাত খাওয়া নিয়ে একপ্রস্থ দক্ষযজ্ঞ হয়ে গেছে। মিতামাসির ঘাড়ের ব্যথা গেছে বেড়ে। পাশের ফ্ল্যাট ছুটে এসে ভাল্লুক সেজেছে, ঝুমঝুমি বাজিয়েছে। একা-কুম্ভ হয়ে মেয়ে তাও মুখে ঝাঁপি ফেলে বসে থেকেছে। তারপর এসেছে পুল-কার। গলায় বোতল ঝুলিয়ে সে মেয়ে যেই না উঠেছে, দাদা-দিদিরা কানে আঙুল দিয়ে আরো মন দিয়ে বই পড়তে লেগেছে। আজ তাদের ক্লাস-টেস্ট। আর সবচেয়ে পুচকি এই মেয়েটা যে মূর্তিমান এফ. এম রেডিও, তা কে না জানে! তার ওপর, হাজারবার ওকে বলা হয়, “আমরা বড়, আমাদের ‘তুই’ বলিস্ কেন?” তাতেও নো ভ্রূক্ষেপ। প্রিন্সিপালের ভয় দেখালে ত্রস্ত হয়ে বলে ওঠে “ ‘তুই’ বড়ম্যামকে বলিস্ না রে দাদা…”। মাথা খায়! ‘ইল-ম্যনার্ড্’ – পুলকারের মায়েরা ভাবে – “হবেই তো। এদিকে মা চাকরি করে, ওদিকে বাবা তো….।” ‘বাবা’ নিয়ে ছোট্ট মেয়েকে দুটো কথা জিগানোর মতো দুষ্টুলোক তাঁরা অবশ্য নন। কিন্তু মিতামাসিকে জিজ্ঞাসাবাদ চলে মাঝেসাঝে। সে-সব মেয়ের কানে যায়। তবে এত সহজে মনখারাপ করে ফেলার বান্দা সে নয়। এ সব শুনলে নৈঋতকোণে মুখ ফিরিয়ে ‘মা তো আছে…মা তো আছে…মা তো আছে’ মন্ত্র জপে তিনবার। মন খারাপ হু-উ-শ হয়ে যায়। ‘আমপাতা জোড়া জোড়া’, ‘ইকিড়-মিকিড়’ ‘এই নে ভাব…এই নে আড়ি’তে গমগম করতে করতে গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছয়।

সব্বাই জানে, ইস্কুলে আসা হয় আসলে সমমনস্ক বিচ্ছু খুঁজে পেতে। নিত্যনতুন দৌরাত্মি আবিস্কার করতে। টিফিন ভাগাভাগির মোচ্ছব করতে। এছাড়া মাঝেসাঝে এক-আধটা চক বা রঙপেন্সিল চিবিয়ে খেতেও ইস্কুলে আসা প্রয়োজন। ইস্কুল ভারি ভাল জায়গা, শুধু কোথায় যেন একটা ‘ডার্করুম’ আছে! বাড়াবাড়ি দস্যিপনা হলে যেখানে পাঠিয়ে দেবার হুমকি দেওয়া হয়। টিফিন-ব্রেকে বন্ধুরা অভিযান করে সেটি খুঁজে বেড়িয়েছে তারা। পা টিপে টিপে, হাতে হাত, সন্তর্পনে। কোথাও পাওয়া যায়নি – বিশাল ইস্কুল বাড়ির কতটুকুই বা তারা চেনে! অদেখা ‘ডার্করুম’ কখনও স্বপ্নে হানা দিলে মেয়ে ঘুমের মধ্যে মা-কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

ইস্কুল থেকে ফিরেও ঝাড়া দু-তিন ঘন্টার অপেক্ষা। দুধ খেয়ে, কমপ্লেক্সের দোলনায় দুলে, স্লিপ চড়েও সময় কাটে না। তারপর একসময় ধড়ে প্রাণ আসে। মা আসে। আপিসফেরতা বাজারের থলে বা মুদিরদোকান সেরে। তখান হইহই কান্ড, রইরই ব্যাপার। মায়ের ওপরেই বাংগি জাম্প, মায়ের ওপরেই সি-ডাইভ। মায়ের সাথে গলা ছেড়ে বেসুরো গান। ইস্কুলের গপ্পো। ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত মায়ের আঙুল আঁকড়ে থাকা।

সবচেয়ে খুশিয়াল দিন হল, যেদিন মা ইস্কুলে যায়। ধরা যাক্, টিচারের সাথে জরুরি মোলাকাত। সাতদিন আগে থেকে মেয়ে দিন গোনে। সেইসব দিনে মেয়ের প্রিয় খেলা হল, ছুটির লাইনে সবার পেছনে লুকিয়ে পড়া। মা তাকে দেখতে পায় না, সে পায় দূর থেকে। মায়ের চোখে উৎকন্ঠা আর খোঁজ দেখে তার আমোদ ধরে না। ‘এইভাবে আমি রোজ চোখ মেলে বসে থাকি তোমার জন্যে। কেমন!’

এইভাবে তাদের দুটিতে চলে যাচ্ছিল। হুতোশ তাদের ছিল নাকো। জগৎসংসারে আলগা সহানুভূতি দেখলেই শুধু তারা পোঁ পাঁ দৌড় মারত, আর কিছুতে নয়। আসলে মেয়ে তো তরঙ্গ ছড়াত সুখের। তার প্রকোপ থেকে বাঁচে, এমন সাধ্য মায়ের ছিল না।

এইরকম একটা সময়ে মেয়ের ক্লাসে ‘ফ্যামেলি’ পড়ানো শুরু হল। টিচার বোঝালেন, “তোমরা যে যার বাড়িতে এই যে একসাথে থাক, জড়িয়ে-মড়িয়ে, তোমরা হলে ‘ফ্যামেলি’। ‘ফ্যামেলি’তে আছে কারা? ফাদার। মাদার। আর তুমি। গ্র্যান্ডফাদার, গ্র্যান্ডমাদার – এঁরাও থাকতে পারেন বৈকি।” টিচার বলেন, ক্লাস সুর করে আওড়ায়। ‘ফা-দা-র’ ‘মা-দা-র’ ‘সিস্-টার’ ‘ব্রা-দার’। মেয়ে ভ্রূ কোঁচকায়। জানায়, ‘ফাদার’ তো নেই। টিচার হক্চকান – “নেই? বাবা নেই?” মেয়ে বলে, “আছে তো। খুব ভালবাসে। কত্ত গিফ্ট দেয়!”
“তাহলে?”
“ফ্যামেলি’তে নেই সে।”
বাবা আছে, কিন্তু সে তো ‘ফ্যামেলি’ নয়। টিচারের মুখে বিস্ময় ধুয়ে অস্বস্তির রঙ লাগে। সহজ কথাও এলোমেলো করে দেয় বড়দের, মেয়ে বোঝে।

মায়ের ডাক পড়ে।
“উই রেসপেক্ট ইওর প্রিভেসি। বাট শি ইজ গিভিং আউট দ্য ওয়ার্ড”।
মা নতমুখ। তারপর বলে, “ইট্স্ জাস্ট দ্য ট্রুথ। উই ডু নট্ হ্যাভ আ প্রবলেম…ইফ্ পিপ্ল্ কাম টু নো।”

সেই রাতে মেয়ে মা-কে খুব করে জড়িয়ে ধরে। যেন রাক্ষসের হাঁ-মুখে সেঁধিয়ে না যায়, সে ভয়ে আঁকড়ে ধরছে ডালাপালা। যেন ডার্করুম তাড়া করছে তাকে। মা-ও খুব করে জাপটে ধরে মা-কে। দুহাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে পলি সরায়। এমন উছল নদীতে পলি জমতে দেওয়া চলে না। কিছুতেই।

ছুটি পেতেই মা ও মেয়ে তাই পাহাড়মুখো হয়। মায়ের যখন আঁচল আর কোল দরকার হয়, মা পাহাড়ে যায়। পাহাড় আসলে মায়ের মা। সেই হিসেবে মেয়ের দিম্মা। সেই প্রাচীন দিম্মা পাহাড়ের ঠিকানায় এসে মেয়ের তো ভারি আহ্লাদ। মামাবাড়ির উঠোনের মতো তিড়িংবিড়িং নাচন তার। অর্কিডেরা তার তুতো ভাইবোন। ঝর্ণা সেই পিঠোপিঠি দিদি, যার সাথে গোপন শলা চলে দিনমান। পাহাড়-দিম্মা সবাইকে মেনে নেয়, বৈচিত্র্যে তার ভ্রূ-কুঞ্চন হয় না – দেখে মেয়ে।

আর অনেক দূরের যে নীল পাহাড়ের সারি…ওইটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। মাকে সে শুধায়, “ওইখানে কবে যাব? ওইটা নীল-নীল দেখায় কেন? ওইটা নিশ্চয়ই আরো ভাল। ওখানে বোধহয় অনেক পাখি আর অনেক প্রজাপতি? ওখানে পরী নেমে আসে? ওখানে কোনো ডার্করুম নেই? ওখানে যারা থাকে, তাদের বাবারা ফিরে আসে? ‘ফ্যামিলি’ হয়ে যায়?”

মা গালে টুসকি দ্যায় বোকাটার। বলে, “ধুর! নীল পাহাড় তো নীল নয় আসলে। দূর থেকে ওরকম দেখায়। কাছে গালে দেখবি সেই একই পাইনবন, একই রাস্তা, একই দোকান-পশরা, একই স্কোয়াশের খেতি। মানে আসলে, নানা রঙের মিশেল। দূর থেকে দেখায় নীল।”
“তাহলে ওই পাহাড়ে বসেও নীল-নীল ভাবছে কেউ আমাদের পাহাড়টাকে?”
“একদমই তো। ঠিকই তো।”

মেয়ে প্রথমে হতাশ হয়। তারপর নিশ্চিন্ত হয়। যাক্ বাবা। তাহলে ‘বেস্ট’টা ‘মিস্’ হয়ে গেছে, এমনটা নয়। বরং তা আছে নাগালেরই মধ্যে। এই যেমন পাড়ার ভল্টু কুকুর – ভারি সুন্দর। ইস্কুলের বাইরের আইসক্রিম-কাকুটাও খুব ভাল – চিবুক ধরে রোজ আদর করে দ্যায়। আর পুলকার-কাকু তাকে যে রোজ সামনের সিট দ্যায় – সে-ও ভারি মিষ্টি। আর সবচেয়ে ভাল হল, বর্ষায় জল থইথই স্কুলের উঠোন।

এই এত্তো ভালোর আবেশে মেয়ে ঘুমে ঢলে পড়ে। দেয়ালা দেখে চোখ জুড়োলে, তার গায়ে সন্ধের চাদর টেনে দ্যায় পাহাড়-দিম্মা।