পিকলুর পাখি

বেবী সাউ



"পাখি শুধু গান গায় " মা বলে । তুতাই বলে পাখি খায় । ঘুমায় । আমার ড্রয়িং খাতার পাখিটা দেখি হঠাৎ ডাকছে । আমাকে । ভাবলাম , যেমন আমি একদিন একদিন ঘুমের মাঝে সকালের স্কুলের জন্য রেডি হয়ে নিই , আর মা অবাক হয়ে অনেক আদর ছুঁয়ে দেয় , পাখিটাও কি ঠিক সেরকমই হল ! চিমটি কেটে দেখি পাখিটা হলুদ রঙের জালনা পেরিয়ে , অন্বেষার ঘরদোর পেরিয়ে আকাশে উড়ছে । ঠিক আমার কাইট এর মতো । মামার কিনে দেওয়া হেলিকপ্টার এর মত । সানি হাততালি দিচ্ছে । তেজু বলছে --" পিকলু পিকলু আর একটু ! আর একটু ! ঠোঁট টাকে ঠিক করে নে !আর একটু রঙ মাখিয়ে নে । পাখির রঙ ভালো লাগে । পাখি তাই লাল নীল ফল খায় । রামধনু খুঁজতে যায় আকাশের ।"

একটা মেঘ পাখিটার ডানা ছুঁয়ে ফেলল । নীল আকাশে একটা সিংহ । কেশর ফুলিয়ে ইয়া বড় চোখ করে পাখিটাতে ধরতে আসছে । সূর্যের মত তার রাগ । তেমনই তার লাল লাল চোখ । সূর্য আমার ভালো লাগে না । বৈশাখ জৈষ্ঠ্য সূর্যের মাস । আমার স্কুলে তখন সামার ভেকেশন । জুন জুলাই কেমন যেন । তেজু নেই, সানি নেই ।জেআরডি ফাঁকা । সূর্যের জন্য ঘুম থেকে জেগে পড়তে হয় । ঘুম পায় । পাখির স্কুল নেই ।কিন্তু মেঘ আছে ।আমার ভয় পাচ্ছে । ও গড ! ও বজরং বালী! পাখিটিকে সেভ রেখো । আকাশে কার কাছে যাচ্ছে ! সূর্যের কাছে ? পাখিকে বলে দেব সূর্য ভালো না । তুই বরং মুনের কাছে যা ! কত স্টার আছে । এলিয়ানরা আছে । ছোট্ট দেখে একটা ডোরেমন নিয়ে আসিস তো ফেরার পথে । দেবুর বাবা হারিয়ে গেছে । "আকাশে তারা হয়ে আছে" ,মা বলে । দেবু কত কাঁদে বাবার জন্য । আমার পাখিটা বরং একটা খবর এনে দিক ওই মুন-মুন আকাশ থেকে । সবাই অবাক হয়ে দেখুক , পিকলুর বার্ড টা কেমন সাহসী ! পিকলু ক্লাসে ফাস্ট হতে পারে না তো কি হয়েছে ! তার আঁকা পাখি তো পারে ।

আরেএএএ পাখিটা যাচ্ছে কোথায় ? ওর তো আইডেনটি কার্ড নেই । আঁকতে ভুলে গেছি ।মাগো, কি হবে ? ও গড ! যদি রাস্তা হারিয়ে ফেলে ! পুলিশ কাকুতো ওকে খুঁজে পাবে না আর ।রাজু মামা কি জানে কোথায় পাওয়া যাবে পাখিটাকে । রাজুমামার তো তোতাপাখি । কথা বলে । এ পাখিটি কি কথা শিখছে ? উফফ আমার খুব ভয় করছে । মাগো মাগো ! ও মাই গড ! আহা ! ফিরছে ফিরছে । এ পথে যাবে বুঝি । এই বুঝি লেগে গেল ইলেকট্রিক তারে ।ইসসস। আস্তে । মাকে হারিয়ে ফেলার মধ্যে আমার ঠিক এমনই ভয় করে । হোম টাস্ক না করলে মা বলে হারিয়ে যাবে । পাখি কি তখন মাকে খুঁজে আনবে । পাখিটাকে কি নামে ডাকি ? কি বলেন শাসন করে তাকে ? বকলে আবার পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে না তো আমায় ? অমিয় স্যার সাহিলকে বকলেন বলে সেদিন আমাদের স্কুলে কত পুলিশ । কত ঝগড়া । তারচেয়ে পাখিটার একটা নাম দিই । "বাঁশি " । এটা ভালো নাম । বাঁশি তুই ঠিক পথে আয় । এই দেখ আমার লাল পেনসিল বক্স । এই দেখ আমার হলুদ রঙের পেজ । আয় আমার খাতার পাতায় । এই দেখে যা ঘুমপাড়ানি গান ।

আর একটু ! আর একটু সোনা । ওই তো আমাদের অশ্বত্থ গাছের ভাঙা পাতা । মা লোক ডাকিয়ে ডাল ছেঁটে দিয়েছে । গাছকাকুদের কাছে ইয়া বড় বড় ব্লেড থাকে । তাই দিয়ে গাছের হাত কেটে দেয় । পা কেটে দেয়। নেস্ট কত ভেঙে পড়েছিল সেবার । তার ভেতর ছোট ছোট কিড বার্ড । বাঁশি তুই ওদিকে যাস না । ওই তো গাছ কাটার ঠকঠক শব্দ শোনা যাচ্ছে । ওদিকে যে কাঠবিড়ালী র বাচ্চা হারিয়ে গেছে । কত পাখি হারিয়ে গেল । বাঁশি তুই এদিকে আয় । মা আছে গাছের কাছে , বাবা আছে । তোর ডানা যদি কেটে নেয় । তোর হাতে যদি স্কুলের ব্যাগ ঝুলিয়ে দেয়! না না বাঁশি , তোকে যে দেবুর বাবার খোঁজ এনে দিতে হবে । রামধনু রঙ আনতে হবে । দেবুর যে রাতে ঘুম হয় না । বাবা নেই বলে ও যে স্কুলের ফি দিতে পারে না । দেবু বলছিল ও নাকি নেক্সট ইয়ার থেকে পাড়ার স্কুলে পড়বে । ওখানে নাকি দুপুরে পোকা চালের ভাত খেতে দেয় । ঝাল ঝাল তরকারি দেয় । আমরা তো ওকে আর পাবো না। ওর মা কাঁদেন , দেবু কাঁদে । বাঁশি লক্ষীটি আমার ! একটিবার যা ! দেবুর বাবাকে ফিরিয়ে আন ।

"পিকলু পিকলু! কি হয়েছে সোনা । ওঠে পড় । এখুনি ড্রাইভার আঙ্কেল এসে যাবে যে ! " পাখিটা ড্রয়িং খাতাতেই আনকমপ্লিট হয়ে পড়ে আছে ।এই রে! আজ ড্রয়িং স্যার নিশ্চয়ই বকবে !