ফুলপ্যান্ট

অদ্বয় চৌধুরী



আন্দুল স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে বাবার হাত ধরে, বাবার পা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল সানি। সামনে দুজনের লাইন রয়েছে। তারপরেই ওর বাবা। শনিবার দুপুর বেলা টিকিট কাউন্টারটা মোটামুটি খালিই থাকে। সানি দেখেছে আগেও। প্রত্যেক শনিবার ও আঁকা শিখতে যায়। আঁকার স্যরের বাড়ি তিনটে ষ্টেশন পরে, রামরাজাতলায়— যেখানে রাম ঠাকুর আছে। রামনবমীতে বিরাট মেলা বসে ওখানে। খুব ভীড় হয়। সানি দেখেছে সেই মেলা। বাবা নিয়ে গেছিল।
বাবা আরও একটা ধাপ এগিয়ে গেছে। এখন বাবার সামনে আর একজন মাত্র। টিকিট কাউন্টার থেকে বেরিয়েই এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম। ওখানেই ওদের ট্রেন আসবে। ওই প্ল্যাটফর্মটায় হাওড়া যাবার ট্রেন আসে। সানি দেখেছে ট্রেনের সামনে লেখা থাকে ‘হাওড়া’। দূরে একটা ট্রেনের হুইসল শোনা গেল মনে হচ্ছে। ওদের ট্রেনের সময় হয়ে গেছে অবশ্য। তার মানে ওদেরই ট্রেনের শব্দ এটা।
অন্যদিন বাবা যখন টিকিট কাটে তখন সানি একটু এগিয়ে যায় প্ল্যাটফর্মটার দিকে। এগিয়ে গিয়ে দেখে ট্রেন ঢুকছে কি না। কিন্তু আজ যায়নি। আজ ও একটু জড়সড় হয়ে আছে। কারণ আজই ও প্রথম ফুলপ্যান্ট পরে ট্রেনে চাপবে। এর আগেও ফুলপ্যান্ট পরেছে দু-একবার, কিন্তু ফুলপ্যান্ট পরে ট্রেনে চেপে দূরে কোথাও যায়নি। ওর খালি মনে হচ্ছে লোকে ওর দিকে তাকিয়ে দেখছে এবং হাসছে। ওকে নিশ্চয় বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে। স্যরের ওখানেও বাকিরা ওকে দেখে হাসবে ঠিক। ও মাকে বলেছিলও সে কথা, কিন্তু মা শোনেনি। মা বলেছে ফেরার সময় সন্ধ্যে হয়ে যাবে, হাফপ্যান্ট পরলে ঠাণ্ডা লাগবে। তাছাড়া মা বলেছে ও এখন ফুলপ্যান্ট পরার মতো বড় হয়ে গেছে। কিন্তু ও কি সত্যিই বড় হয়েছে? ওর তো এখনো রাত্রিবেলা একা একা বাথরুম যেতে ভয় লাগে! কেউ ওকে বড় বলে মানে না! সব বড় মানুষরা ওকে তুই তুই করে কথা বলে, কেউ ওকে কোনো পাত্তাই দেয় না! এসব যখন ভাবছিল সানি তখনই ট্রেনের হুইসলটা আবার শোনা যায়।
বাবা এবার কাউন্টারে এক নম্বর। টিকিট কাটবে। ও আর বাবার পাশে দাঁড়াতে পারবে না। কাউন্টারের সামনের স্ল্যাভটায় ওর মাথা ঠেকে যায়। ওর হাত ছেড়ে দিয়ে বাবা কাউন্টারের মধ্যে হাত গলিয়ে দেয়। ট্রেনের শব্দটা এবার অনেক কাছে শোনা যায়। এই প্ল্যাটফর্মেই ট্রেন আসছে। হাওড়া যাবার ট্রেন। ও বাবার থেকে সরে গিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যায়। সব লোকজন লাইনের সামনে এগিয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রেনে উঠবে বলে। প্ল্যাটফর্মের সামনেটা প্রায় খালি। একজন মাত্র দাঁড়িয়ে আছে টিকিট ঘরের মুখটায়। এই লোকটা বাবার ঠিক আগে টিকিট কেটেছে। সানি দেখে লোকটাকে। লোকটা ওখানে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবছে মনে হয়। সানি একবার পিছন ফিরে দেখে বাবার টিকিট কাটা হয়ে গেছে। তার মানে ওরা ট্রেনটা পেয়ে যাবে। ও আরও খানিকটা এগিয়ে লোকটার ডান দিকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বাবার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। লোকটা ওকে একবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে, তারপর হঠাৎ ওর কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “এই ট্রেনটাই কি হাওড়া যাবে? তুমি জান?” সানি একটু অবাক হয়ে গেলেও যতটা সম্ভব গম্ভীর গলায় বলে, “হ্যাঁ, এই ট্রেনটাই হাওড়া যাবে। আপনি উঠে পড়ুন নিশ্চিন্তে।” লোকটা ওকে “ধন্যবাদ” জানায়, তারপর এগিয়ে যায় লাইনের দিকে।


সেদিন সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরে এসে সানি ওর মাকে জানায় এরপর থেকে ও শুধু ফুলপ্যান্ট পরেই বেরোবে, হাফপ্যান্ট পরে আর বাইরে বেরোবে না।