ভীলেদের গল্প

ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য



ভীল কাদের বলে জানো? আমাদের দেশে যত আদিবাসী মানুষ থাকেন, তাঁদের মধ্যে সবথেকে বেশী সংখ্যক মানুষ ভীল গোষ্ঠীর। গুজরাট, মধ্য প্রদেশ, ছত্তিসগড়, মহারাষ্ট্র আর রাজস্থান – এই ক’রাজ্যেই মূলতঃ এঁদের বাস।

ভীলেরা এককালে ছিলেন যাকে বলতে পারো ‘হান্টার-গ্যাদারার’। ছোট ছোট জীবজন্তু শিকার করে, বনের ফলমূল কুড়িয়ে এঁরা নিজেদের পেট ভরাতেন। এ-ছাড়া, বাড়ীতে গরু, ছাগল, মুরগী পালন করেও সংসার চালাতেন কেউ কেউ। ভীলেরা খুবই গরীব মানুষ আসলে। তবু এঁদের হাতের কাজ আর নাচ দেখার মতন। আজকাল অবশ্য চাষবাসই এঁদের মূল পেশা।

এতো গেল এঁদের সম্বন্ধে দু’কথা। এই ভীলগোষ্ঠীর একটা প্রাচীন গল্প আজ তোমাদের শোনাই।

একদিন মহাদেব, মানে আমাদের শিবঠাকুর, আর পার্বতী দুজনে বসে মর্ত্যের হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করছেন। মানে, কি করলে কি হয় এইসব আর কি। এমন সময় পার্বতীর ভাইয়েরা এলেন দিদির সঙ্গে দেখা করতে। ব্যাস, ভাইবোনে এক হলে যা হয়। গল্পে গল্পেই অনেকটা সময় কেটে গেল। এতোটাই, যে ভাইদের চলে যাওয়ার সময় যে কখন হয়ে এসেছে পার্বতী তা খেয়ালই করেন নি। তা, খেয়াল করে মনটা ভারী হল বটে, কিন্তু একটা ভাবনাও পার্বতীর মাথায় এলো। ভাইয়েরা এতোটা পথ উজিয়ে দেখা করতে এল। ওদের তো একটা উপহার-টুপহার কিছু না দিলেই নয়!

কিন্তু কি দেওয়া যায়? এই কৈলাসে সংসার। আর চ্যালাচামুণ্ডা বলতে তো ভূতের দল। স্বামী মহাদেবও তো সর্বত্যাগী। কি করবেন-কি করবেন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কিছুই না পেয়ে পার্বতী সেই মহাদেবেরই দ্বারস্থা হলেন। বললেন – ‘আপনি একটা ব্যবস্থা না করলে তো সম্মান থাকে না’।

মহাদেবও পড়লেন আতান্তরে। তিনি ভিখারী সাধু মানুষ! কোথায় কিই বা পাবেন উপহার দেওয়ার যোগ্য? তা-ছাড়া শালারা সব রাজার ছেলে। তাদের তো দেব বললেই কিছু দেওয়া যায় না! তবু অনেক ভেবেচিন্তে তিনি মনে মনে একখানা রূপোর কলসী তৈরী করে শালাদের বাড়ী ফেরার পথে রেখে দিলেন। কিন্তু পার্বতীর ভাইয়েরা চলে যাওয়ার সময় নিজেদের মধ্যে গপ্পে এতই মশগুল যে সেই কলসী তাদের চোখেই পড়ল না।

পার্বতীর মনের দুঃখ আর ঘোচে না। ভগবান মহাদেবের দেওয়া উপহার ভাইয়েরা দেখল না? কি করা যায় ভাবতে ভাবতে আবার তিনি শিবঠাকুরের শরণ নিলেন। বললেন, ‘আপনি এবার এমন কিছু ওদের দিন যার থেকে শিক্ষা নিয়ে ওরা জীবনে উন্নতি করতে পারে’। মহাদেব বললেন – ‘তথাস্তু’! বলে-টলে তিনি নিজের ষাঁড় নন্দীকেই পাঠিয়ে দিলেন শালাবাবুদের কাছে।

পার্বতী তো মহা খুশী। এতোটা আশা করেন নি তিনি। তিনি তো জানেন, নন্দী মহাদেবের কত প্রিয়। সেই প্রিয় নন্দীকেই তিনি উপহার দিয়ে দিলেন। ভাইদের বললেন – ‘দেখো। আমি তোমাদের দিদি। আমার কথা শোনো। এই ষাঁড় মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয় প্রাণী। খুব মন দিয়ে এর যত্ন কোরো। তোমাদের ভালো হবে। অনেক ধনসম্পদ হবে।’ ভাইয়েরাও মহা খুশী। তারা ড্যাং ড্যাং করে নন্দীকে নিয়ে বাড়ী চলল।

পার্বতীর কথায় তারা নন্দীকে ভালোমন্দ খাওয়ায়, স্নানটান করায়। বেশ যত্নেই রাখে। এমন করে দিন যায় মাস যায়। কিন্তু কিছু পাওয়া যায় না নন্দীর থেকে। কাঁহাতক ধৈর্য রাখা যায়? একটু একটু করে রাগতে রাগতে রাগ একদিন চরমে উঠলে ভাইয়েরা মিলে ফন্দী করল নন্দীকে জবাই করে দেখবে তার ভেতরে সত্যিই কি কি ধনরত্ন লুকোনো আছে। ব্যাস, যেমন কথা তেমন কাজ!

খবর গেল পার্বতীর কানে। সব শুনে তিনি একাধারে ভাইদের নির্বুদ্ধিতা আর লোভের জন্য যেমন লজ্জিত হলেন, তেমন রেগেও গেলেন প্রচণ্ড। তাদের ডেকে এনে তীব্র ভর্ৎসনা করলেন পার্বতী। ‘বোকা ছেলেরা, তোমরা জানো না স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল এই তিন ভুবনের মধ্যে নন্দী সবথেকে শক্তিশালী আর পবিত্র? মহাদেব নন্দীকে তোমাদের কাছে দিয়েছিলেন জমি চাষ করে সোনার ফসল ফলাতে। তা না করে লোভের বশে ওকে তোমরা মেরেই ফেললে? এমন আক্কেল তোমাদের?’ প্রচণ্ড রাগে তিনি অভিশাপ দিলেন ভাইদের, যে তারা বা তাদের বংশের কেউই আর চাষবাস করতে পারবে না।

ভীলেরা মনে করেন তাঁরা দেবী পার্বতীর ভাইয়ের বংশধর। আর তাঁর শাপেই চাষবাস করা তাঁদের হয়ে ওঠে না।

তবে সেই শাপ আজ কেটেছে, কি বলো?