হাল্ক

রঞ্জনা ব্যানার্জী



আর্যের নিজের উপরেই রাগ হচ্ছে। উত্তরটা ওর জানা। কিন্তু যেইমাত্র মিস ওর নাম ধরে ডাকল সাথে সাথেই সব গুলিয়ে গেল। ক্লাসের লম্বা ছেলেরা পেছনের দিকে বসে। এটাই নিয়ম। আর্য এই ক্লাসে সবচেয়ে লম্বা। তাই পেছনের সারিতেই ওর জায়গা। মিসের হয়তো ধারণা, লম্বা ছেলেরা হয় বোকা নয় ফাঁকিবাজ। ইদানিং কেন জানি ক্লাসে পড়া ধরলে আর্য ঝটপট উত্তর দিতে পারে না; তোতলায়। তাড়া দিলে আরও ভড়কে যায়। তাই বলে ও অমনোযোগী নয়। দু’ বছর আগে অবশ্য ও বেশ ফাঁকিবাজই ছিল। মম দিদাই ওকে আমূল বদলে দিয়েছেন। মম দিদা হল আর্যের মায়ের ছোট মাসি। মমতা সেন। অনেক দিন আগে কানাডা চলে গিয়েছিলেন। ওখানের একটা স্কুলে পড়াতেন। গত বছর হঠাৎ একদিন ফোনে মাকে বললেন,
-আমার সময় কাটে নারে রুমকী !ক’দিন তোর কাছে ঘুরে যাব ভাবছি।
দিন পনের পরেই দিদা সত্যিই এলেন জন্মভূমি দর্শনে। এয়ারপোর্টে দিদাকে দেখে তো আর্য মুগ্ধ! টুকটুকে গায়ের রঙ। কটা চোখ। বব চুল। কী সুন্দর পাট করে শাড়ী পরা!
কিন্তু ক’দিন যেতেই মম দিদার শিষ্টাচার শিক্ষার ঠেলায় বাড়ির সবাই অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। জল খাওয়ার সময় ঢক ঢক আওয়াজ তোলা ‘অশিষ্ট’, খাবার চিবোনোর সময় মুখ বন্ধ করা ‘শিষ্ট’। কথায় কথায় ‘ধন্যবাদ’ বলা সবচে’ বিরক্তিকর ‘শিষ্টাচার’। রহিমা বুয়া তো তখন কিছু কাজ করলেই ধন্যবাদ না শোনা পর্যন্ত নড়তো না। মম দিদাকে নিয়ে আর্যের সেইসব ঝামেলার গল্প অনেকেরই জানা।
সেই সময়েই তো জিমিনির সাথে পরিচয়। জিমিনি কে? ‘পিনোকিও’ গল্পের ঝিঁঝিঁ পোকাটা নয় কিন্তু! একটা কাচ নীল রঙের মেয়ে মাছি। পুরো নাম, ‘পাউলা জিমিনি চেন’।সাজুগুজুর ঘটা দেখলে তোমার পিত্তি জ্বলে যাবে। রয়া আন্টির মত টুকটুকে লিপস্টিক পরে ঠোঁটে। আবার ছোট একজোড়া সানগ্লাস কপালের ওপর তুলে রাখে। কথা বলার সময় সামনের সরুসরু ঠ্যাঙে সেই সানগ্লাসের কাচ জোড়া অবিরাম ঘষতে থাকে।
আগে আর্যের মন খারাপ হলেই ও ছাদে চলে যেত আর লাউমাঁচাটার নিচে দাঁড়ালেই জিমিনি হাওয়া ফুঁড়ে উদয় হ’ত। ‘বারো’ তে পা দেয়ার পর অত সহজে আর আসে না জিমিনি। এলেও ধমকায়, ‘আর্যশ্রেষ্ঠ এখন তোমার নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়ার শৈলী শিখতে হবে’।
দু’মাস হতে চললো ওরা ঢাকায়। জিমিনি কি চেনে শহরটা? আর্যের চোখ ফেটে কান্না আসছে। মনে মনে জিমিনিকে ডাকে, ‘জিমিনি প্লি--জ দেখা দাও!’
বিশ্বে ক’টা মহাদেশ আর্‍্যের ভালই জানা আছে। এছাড়াও আমাদের আদি পুরুষের নিবাস যে আফ্রিকায় তাও জানে ও। এমনকি এই সেদিন ইথিওপিয়ায় তারও আগের আদিম মানুষের চোয়ালের হাড়ের যে ফসিল পাওয়া গেল সে খবরও অজানা নয়। কিন্তু যা হওয়ার তাতো হয়ে গেছে! সারা ক্লাস এখন হাসছে আওয়াজ তুলে। কেন যে ও ঘাবড়ে গিয়ে তোতলালো, ‘ফা-ফাইভ’! যদিও দুই আমেরিকা এক করলে ‘আমেরিকাস’ আর ইউরোপ এশিয়া এক করে ‘ইউরেশিয়া’, তাতে সংখ্যা পাঁচই হয়। কিন্তু কে বলবে? আড় চোখে দেখে হাসতে হাসতে চোখের জল গড়াচ্ছে জনির । আর্য জানে মহাদেশ বা মহাসাগর কোনটারই হিসেব জানা নেই জনির কিন্তু ক্লাসে চোখমুখ ঝলমল করে এমনভাবে থাকে যেন সব পারে। মিস ওকে পড়া তো ধরেনই না বরং প্রায়ই অফিসে পাঠানোর মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেন। ‘জনি কুড ইউ ডু মি এ ফ্যাভর?’ জনি ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে বলে, ‘স্যুউর ম্যাম’। ‘ব্রিং এ নিউ ডাস্টার ফ্রম মিসেস সেন প্লিজ’। গা জ্বলে যায় আর্যের। জনি বয়েসে ওর চেয়ে বড় কিন্তু দেখতে ছোটখাট তাই সামনেই বসে।
আর্য মাথা নিচু করেই শোনে মিস বলছেন, ‘ক্লাস প্লিজ বিহেইভ এন্ড আর্য আই এ্যাম রিয়েলি ডিসাপয়েন্টেড।’
এই স্কুলে আর্য নতুন। ক্লাস সিক্সের সেকেন্ড টার্মের পরই বাপির প্রমোশন ; ঢাকায় পোস্টিং। আর্যের দিদিভাই মানে বিন্তির এ লেভেল পরীক্ষা তখন কড়া নাড়ছে তাই বাপি একাই ঢাকা চলে এসেছিলেন। বিন্তির পরীক্ষার পরে সব গুছিয়েগাছিয়ে ঢাকায় আসতে আর্যদের আরও চার মাস লেগেছিল।
জনির বাবা আযম আঙ্কেল বাপির কলিগ। সেই সূত্রেই এই স্কুলে ভর্তি হওয়া। প্রথম দিনই ‘হাল্ক হাল্ক’ আওয়াজ দিয়েছিল ক্লাসের কেউ কেউ। আর্যের জন্যে ব্যাপারটা নতুন। ওর সময় লেগেছিল ধরতে যে ওরা আসলে ওকেই টিটকারী দিচ্ছে। আর কদিন পরেই নাসিরের কাছেই জেনেছিল এটা ‘জনি’র কাজ। এই স্কুলে কেবল নাসিরই ওর বন্ধু। এটা সত্যি যে আর্য দেখতে একটু বড়সড় কিন্তু তাই বলে ‘হাল্ক’! আগের স্কুলে এসব নিয়ে কখনো ভাবতে হয়নি। ওরা বন্ধুরা প্রায় সবাই একসংগেই বড় হয়েছে। কে লম্বা কে বেটে এসব নজরেই আসেনি কারো।
জনির একটা দল আছে স্কুলে। এর তার পিছু লাগে। মারামারিও করে। ক্লাসে সবাই জনিকে বেশ সমঝে চলে। ডোরা তো সেদিন রেশমা মিসের হোমওয়ার্কটা পুরো কপি করে দিয়েছিল আর জনি গদগদ হয়ে বলেছিল, ‘ইউ আর সাচ আ ডল ডোরা!’ ডোরাও হ্যালো কিটির বিল্লিটার মত চোখ পিটপিট করে ‘থ্যাংক্যু’ দিয়েছিল। আর্য ডোরাকে একদম পছন্দ করেনা। ডোরা যদিও পুতুলের মত দেখতে কিন্তু আর্যকে যখন চোখ নাচিয়ে বলে, ‘হাওডি হাল্ক?’ তখন ওকে মোটেও পুতুল পুতুল লাগে না একদম লালকমল নীলকমলের রাক্ষুসীদের আত্মীয় মনে হয়।
আর্যকে এখনও মিস বসতে বলেন নি। ব্ল্যাক বোর্ডে একটা বড় ওয়ার্ল্ড ম্যাপ টাঙালেন এইমাত্র। মহাদেশ গুলোর ওপরে হাতের পয়েন্টার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাম বলছেন। জনি প্লেন বানিয়েছে বেশ কটা। মিস পেছন ফিরলেই ছুঁড়ছে। মিস হঠাৎ বললেন, ‘আর্য পে এটেনশন আই’ল কাম ব্যাক টু ইউ এগেইন’। মিস পেছন ফিরতেই জনির ছোড়া কাগজের প্লেন এসে পড়ে ওর ডেস্কে। তাতে লেখা, ‘পুওর হাল্ক’। আর ঠিক তখনই মিস সামনে ফেরেন ‘হোয়াটস দ্যাট’? সবাই চুপ। মিস পয়েন্টারটা আর্যের দিকে তাক করে বলেন, ‘আর্য ব্রিং দ্যাট থিং আপ হিয়ার; নাউ।’ আর্য ভেবে পায়না কী করবে! আর তখুনি দেখে জিমিনি ঠিক মিস এর মাথার ওপরে গোত্তা মেরে ম্যাপের দিকে যাচ্ছে। তারপরেই রিনরিনে গলায় ওকে বলল, ‘আর্য নিয়ে এস প্লেনটা’। আর্য পুরো ক্লাসে আলতো চোখ বুলায় নাহ্‌ কেউ শুনেছে বলে মনে হয়না। সবাই মাথা ঘুরিয়ে ওকেই দেখছে।
অগত্যা প্লেন হাতে এগোতেই হয়। নাসিরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় নাসির ফিসফিস করে বলে, ‘সেভেন কন্টিনেন্টস আর্য’। জিমিনি সানগ্লাস পরিস্কার করছে যথারীতি। মিসকে প্লেনটা দিতেই জিমিনি হিসহিসিয়ে ওঠে, ‘তোমার সমস্যা কী আর্য? এমন তো তুমি ছিলে না!’ মিস তখন চোখ সরু করে প্লেনের গায়ের লেখাটা পড়ছেন, ‘পুওর হাল্ক? হোয়াট ডাস দ্যাট মিন?’ আর্য টের পায় চাপা হাসির গুঞ্জন। ‘নাউ ক্যান এনিওয়ান টেল মি হু মেইড দিস ইউনিক আর্ট পিস?’ সবার চোখ নিচু কেবল জনি আর্যের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে। প্রায় সাথে সাথেই নাসির হাত তোলে। মিস বলেন, ‘ইয়েস নাসির?’ আর্য অবাক! ‘মিস, আর্য হেল্পড মি টু মেমোরাইজ দ্য হোউল ম্যাপ। আই থিঙ্ক হি ক্যান শেয়ার দ্য টেকনিক’। মিস অবাক হয়, ‘ইন্টেরেস্টিং! শো মি আর্য’। আর্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মিস ভুলে গেছে প্লেনের কথা। মাথা ঘোরাতেই দেখে জিমিনির ঠোঁটে মিষ্টি হাসি, ‘তোমার সেরাটা দাও এবার’। আর্য মিসের হাত থেকে পয়েন্টার টা নিয়ে ওর পাঁচ কন্টিনেন্ট বলার কারণের যুক্তির ব্যাখ্যা দিয়েই শুরু করে। হঠাৎ নিজেকে ওর হাল্কের মতই শক্তিধর মনে হয়। আশ্চর্য ও কিন্তু একটুও তোতলাচ্ছে না! ওর বলা শেষ হতেই পুরো ক্লাস হাততালিতে ফেটে পড়ে। মিস বলেন, ‘ব্রাভো!’
জিমিনি কিছু বলেছিল কি? তবে জনি প্লেনের কারিগরের নাম না বলার জন্যে ছুটির পরে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল। জিমিনি মিলিয়ে গিয়েছিল হাওয়ায় যেমন যায় কিন্তু আর্য জানে যদি আবার কখনো ওর নিজের সাথে বোঝাপড়ার ভিতটা টলমলে হয় জিমিনি ঠিক হাওয়া ফুঁড়ে আসবেই।
------------------------------------------------------------ -------