বড় হওয়া

তমাল রায়


বাবলি আর সিনারি আঁকে না। আঁকতে বসলেই আঁকে মানুষের মুখ। কিন্তু মুখ গুলো যে কেন কেবল খারাপ হয়ে যায় কে জানে।
বাবলি যা জানে তার মধ্যে অনেক কিছুই পড়ে। কিন্তু যা কাল রাতে জেনেছে তা ও কখনোই আগে শোনেনি। কাল রাতে খুব গরম। ঘাম হচ্ছিল খুব।মা নিজেই বলেছিল স্নান করতে। আর ও যথারীতি উদোম হয়েই স্নান করতে গেল পাশের ঘরে টপ আর হট প্যান্ট খুলে। যেই না বেরিয়েছে ও মার মুখোমুখি। আর মা বলল টাওয়েল জড়াও আগে। ও ভাবছিল মজা করছে মা। শোনেনি। মা কানটি ধরে গালে একটা চড়। আর ও ভ্যাঁ। মা তখন চিৎকার জোড়েনি। বরং হিস হিসিয়েই বলছিল -কতবার বলেছি বড় হয়েছ। বোঝোনা? বুকগুলো দেখেছ? এভাবে কি করে বড় হবে তুমি। মা খুব আপসেট। বাবলিও। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল মা প্রায় ৩০ মিনিট। শেষে বাবা আসায় ও মুক্তি পেলো। ছাড়া পেয়ে ও বাবাকে বলল ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে,ও না’কি বড় হয়েছে। চেঞ্জ করবে,বেরিয়ে যাও। এবার ও আয়নায় দেখছিল শরীর নিজের। দশ এখন বাবলি। বেশী আর কই।চুল আঁচড়ে,পড়তে বসল। পড়ে আর কই। থেকে থেকেই আয়নার সামনে। বাবা দেখেও না দেখার ভান করছিলো। আর মুচকি হাসছিলো। বাবলি তা বুঝে রাগ করলো খুব। বললো সে খাবে না আজ রাতে। মা চিকেন মানচুরিয়ন রেঁধেছে। এনে সামনে রাখলো। বাবা বসল,মাও। ও কিন্তু খাবে না। আজ কিছুতেই খাবে না। কিন্তু লোভ ও লাগে যে। কি করে আর…

পড়তে ওর যে কেন ভালো লাগে না,কে জানে। পড়তে বসলেই মাথায় কি কি যেন সব ঘোরে। ভুতে ধরেছে বলে,কাজের দিদা। চেহারাটা দেখ,মুখে কালি,রোগা লিক লিকে।
আজ স্কুলে প্রেম বলেছে -তোকে চুমা খাবো অয়ন্তিকা। বাবলির ভালো নাম অয়ন্তিকা। বাবলির দাদা বলেছে -লিখে রাখবি সব,তো যে যা বলে। দাদা আরও ওস্তাদ। নিজের তো দাদা নয় পিসতুতো। কিন্তু মনে ধরেছিল কথাটা। ও লিখে রেখেছে রাফ কপিতে- Prem is a stupid.said toke chuma khabo.
ম্যাথস কপি নিতে ভুলে গেছিল,রাফ কপিতেই করে দেখাতে গেল অন্বেষা ম্যামকে। ম্যাম সোজা নিয়ে গেল প্রিন্সিপাল ম্যামের কাছে। ডাক পড়ল গার্ডিয়ানের। -বাড়িতে একটু ডিসিপ্লিন শেখান। বাচ্চা বড় কি এমনি হয়? মার কাজ ছিল। আসতে পারেনি। অগত্যা বাবাই গেছিল। ওর মা বলেছিল প্রেমের এগেইনস্টে কমপ্লেন করতে। সবাই ছোট। বাবা কমপ্লেন করেননি। শুনে চলে এসেছেন। বাবলির মুখ হাঁড়ি। কথা বন্ধ করেছে বাবার সাথে। বাবা কিছু বলেনি। কিই বা বলবে। বাবলি পোগো চ্যানেল দেখছে না। কার্টুন নেটওয়ার্ক ও। থমথমে বাড়ি। ভাগ্যিস পিসিমণি এলো। নইলে এমনটাই চলত।

বড় তো সবাই হয়,কিন্তু কি করে হয়? কলম্বাসের মত জাহাজ নিয়ে বেরুতে হয়? ও ঠিক বুঝে পায় না। সবাই বড় হয়,ওর বুঝি ইচ্ছে হতে নেই বড় হবার!
সবাই বেরিয়ে গেলে ঘর থেকে বাবলি,মার ব্রেসিয়ারটা নিয়ে পড়েছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলো কেমন লাগে। ধুস। হয়ই না। ঢল ঢল করে। খুলে ফেলে বাবাকেই এসে জিজ্ঞেস করল-বাবা মার মত হবে কবে? বাবা নিউজ চ্যানেল থেকে মুখ সরিয়ে কিছুক্ষণ সময় নিলো বুঝতে। পরে বলল-একটু তো লাগবে সময়,আগে বড় হও। মা যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। কটমট করে তাকালো,কিন্তু হেসেও ফেললো। মাকে এই জন্য বাবলি জিজ্ঞেস করেনা। কেমন যেন পিয়ালি ম্যামেরই মত। কেবল ক্যাঁট ক্যাঁট। বাবা তুলনায় ফ্রেন্ডলি। বাবাকে তবু জিজ্ঞেস করা যায়। বাবলি আজ কৌশানির বাড়ি গেছিল। কৌশানির দিদু বলছিল -কোনো ছেলের গায়ে হাত দেবে না। আর তোমার গায়েও যেন কেউ হাত না দেয়। লক্ষ্য রাখবে। দিন কাল খারাপ। কত কি ঘটে। রাতের খাওয়া শেষ হলে,ও বাবা আর মার মাঝে শোয়। এটাই দস্তুর বেশ কিছুদিনের। মাঝে ও একাই শুত আলাদা বিছানায়। উল্টোদিকের কাকীমা গলায় দড়ি দিল। সে রাতে ও তিনবার চমকে চমকে উঠেছিল। তারপর থেকে গত এক বছর ও এভাবেই শোয়। মুশকিল হল ওতো পাশবালিশ সরে গেলে ঘুমের মধ্যে ও বাবার গায়েই পা তুলে দেয়। আজ কেমন অস্বস্তি লাগছে। যদি বাবার গায়ে পা তুলে দেয়,কৌশানির দিদু যে বললো। বাবাও তো পুরুষ,তাই না। আজ আর ঘুম আসছে না। ও চোখ বন্ধ করে ঘাপটি মেরেই শুয়েছিল। বাবা মা ঘুমালে,ও উঠে এসে বসল জানলার এক্সটেন্ডেড বক্সটায়। চারদিকে তেমন কোনো শব্দ নেই,সবাই বোধ হয় ঘুমিয়ে গেছে। একটা সিকিউরিটি লাইটপোস্টে ঢং ঢং করে লাঠির বাড়ি মারছে,মানে চোর আমি আছি,তুমি এসো না প্লিজ। একটা কুকুর একা কি যেন খুঁজছে। হলুদ আলোয় কুকুরটাকে দেখে খুব মায়া হল বাবলির। ও ডাইনিং টেবল থেকে বিস্কিটের কৌটো এনে ছুঁড়ে দিচ্ছিল নীচে,কুকুরটার খেয়াল পড়তেই দৌড়ে এসেছে। খেয়াল করেনি। এভাবে কতক্ষণ,খেয়াল নেই। হঠাৎ দেখে কাঁধে হাত। চমকে উঠেছিল। বাবা। হাত ধরে বলল - বাবলি চল শুতে হবে। ও এসে শুলো। বাবা ওর মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছিল। আর বাবলি কি আড়ষ্ট।

টিভি দেখতে ভালো লাগে না আর। কেমন এক ঘেঁয়ে। ও ফেসবুকে একাউন্ট খুলতে গেছিল। মা বকেছে খুব। খবরদার। অথচ মা বাবা দুজনেই মোবাইল নিয়ে ঘাঁটছে সারাক্ষণ। আর তা নিয়ে দুজনে রাত হলে ঝগড়াও করে কত।
স্কুলে মোবাইল নিয়ে এসেছিলো আজ তৃণা। দেখাচ্ছিল অহন ওকে টেক্সট করেছে,আই লাভ ইউ তৃণা। তৃণার মুখে চোখে খুব হাসি। তৃণার বাবা মা দুজনেই চাকরি করেন। তৃণা একা ফ্ল্যাটে থাকে। আপদ বিপদ যদি কিছু হয়,তাই ফোনটা তৃণার কাছেই থাকে। কিন্তু স্কুলে ফোন আনা নিষিদ্ধ। ও এনেছে লুকিয়ে। জানতে পারলেই স্কুল টিসি দিয়ে দেবে। কিন্তু বাবলি ভাবছিল আই লাভ ইউ তো সিরিয়াল খুললেই। ও বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল,বাবা ওরা কি সত্যি ভালোবাসে? বাবা বলেছে - আরে ওরা পয়সা পায় অভিনয় করে,ওদের যা বলতে বলে বলে। এতো অভিনয়। তাহলে অহনেরটাও কি অভিনয়? মাথা ভর্তি প্রশ্ন গজ গজ করে। ঘুমই হয় না রাতে,খেতেও ইচ্ছে করে কই। ভাল্লাগেনা কিছুই। কদিন হল ভাল্লাগেনার জগতে ও ক্রমশ ঢুকে পড়ছে। কিসে যে ভালো লাগবে কে জানে।

ঝিন্টির একটা ডগি আছে ল্যাব্রাডর,আয়ুষের পাখি, আরে বাবা একা একা থাকা যায়? ও মাকে কত বলে,মা একটা বোন এনে দাও মানুষ করব। কিছুই দেবে না। ওই বা কেমন করে থাকে!
খরগোশ পুষেছে ও গোটা কয়। খরগোশগুলো খুব মিষ্টি। খাঁচা থেকে বার করে আনে রোজ,আদর করে অনেক। কিন্তু এক সাথে বার করলেই ঝামেলা। ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা। আর কি মারামারি। ও সামলাতেই পারেনা। দুজনকে ধরেই মারতে যায়। দেখে ফেলেছিলো সকালে যে কাকুটা কাগজ দেয়,সেই কাকুটা। কি বকলো। বাবলি তুমি না বড় হচ্ছ। বাবলি হাঁ করে চেয়ে,জানো না ওরা এখন আদর করছে। এখন এভাবে মারে। ব্যস। বাবলির মাথা গেল ধরে। ও রাগ করে বাবাকে এসে বলেছিল,বাবা বড় হলে কত কি জানতে হয়? বাবা ও হাসলো। বললো -অল্প অল্প। বেশী জানলেই মাথা খারাপ। ওমা কদিন পর খরগোশটা পাঁচ,পাঁচটা বাচ্চা দিলো। তিনটে মরল। দুটো বাঁচল। খুব যত্ন করেছিল বাবলি। মা স্কুল ছুটির পর এসেই দাঁত খেঁচালো। আমি পারবো না। তুমি এবার বোঝো বাবলি। আমার অত সময় নেই। বাবলি মাকে কিছু করতেও বলেনি। এমনকি মরা বাচ্চাগুলোও নিয়ে গিয়ে পাশের ভ্যাটে নিজেই ফেলে এসেছিল,খুব কষ্ট হচ্ছিল তাও। কেবল বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল -বাবা,মারামারিটাও আদর? বাবা কিছু উত্তর করেনি। বাবলির মন খারাপ হয়েছে খুব। বাবাতো ফ্রেন্ড ওকে বুঝিয়ে বলতে পারতো। ও কি এতই বোকা!

একা থাকার অভ্যাসটা ভালো। সবাই তাই থাকে। ও যে কেন পারে না। মা তো ড্যাম বিজি। বাবা তবু কিছু কথা শোনে। কিন্তু ওর যদি কেউ থাকতো,যাকে শেয়ার করবে। কেউ নেই। কেন?
মাসের ওই কটা দিন বিশেষ করে খুব লজ্জ্বা লাগতো,হুইসপার আল্ট্রাকেয়ার। বলতে বলতেই মা সরিয়ে দিতো চ্যানেল। ও জিজ্ঞেস করেছে বহুবার। মা বলেছে -বড় হও জানবে। কেন যে এত চুপ চুপ,ফিস ফাস,ওর মাথাতেই ঢোকেনা। আজ স্কুলে কৌশানির ব্যাগে দেখে অমন একটা প্যাকেট দেখেই বাবলি জিজ্ঞেস করেছিল,কিরে এটা? কৌশানি কেবল বলল,উফফ তুই না কিচ্ছু জানিস না। ভুত একটা। সেই থেকে ওর মন খুব খারাপ। কৌশানিও বড় হয়ে গেল,আর ও ছোটোই। বাড়ি ফিরে ইস্তক ও আজ খায়নি। অনেকক্ষণ স্নান করেছে। আর নিজের স্টাডি রুমের দরজা বন্ধ করে একলা হয়ে গেছে। আয়নার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুখ ভেংচেছে। ভুত একটা। ভুত তুই বাবলি। বলে কিছুক্ষণ হেসে গায়ে চাপা দিয়ে শুয়ে গেছে। কতক্ষণ শুয়ে ছিল খেয়াল নেই। ঘুম ভাংলো মার ডাকে। দরজা খোলো বাবলি। আর ওর মনে পড়ল স্কুলের ব্যাগটা বাইরে রাখা। আর তাতে আছে প্রেমের দেওয়া কাগজটা। -লাভ ইউ বাবলি। ইস মা যদি দেখে ফেলে খবর আছে। ও দরজা খুলেই দৌড়লো ব্যাগ আনতে। না ঠিক আছে। ওটা নিয়ে এসে একবার গন্ধ শুঁকলো। ইস কেমন একটা গন্ধ। বমি এলো। গলায় আঙুল দিয়ে বমি করলো। অনেক। কিন্তু পেটে তো কিছুই নেই। শুধু টক জল। এসে শুলো বিছানায়। আজ থেকে একা শোবে ও।

সারা রাত ও কাল ভুতের স্বপ্ন দেখেছে। ভুত গুলো দাঁত নখ বার করে ওকে যেন গিলতে আসছে।
আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে। ফার্স্ট ইউনিটের। জিওগ্রাফি,ম্যাথস,হিস্ ্রি,ফিজিক্স-ওয়ার্ক হার্ড। মাকে রেজাল্ট দেখালে বার করে দেবে বাড়ি থেকে। কতক্ষণ যে বসে খেয়াল নেই। দারোয়ান কাকু বললো -এই তুমাদের পুল কার তো কখন চলে গেছে। তুমি বসে? ও বাইরে এলো স্কুলের। মাথা কাজ করছে না। একটা গাড়ি থেকে মুখ বার করে চেনা একটা ড্রাইভার আঙ্কল বললো চলো তোমায় পৌঁছে দিই,গঙ্গার ধারেতো তোমাদের ফ্ল্যাট। ও মাথা নাড়লো। আর কিছুই খেয়াল নেই।
বাবা বসে,মাও। কৌশানির বাবা মা এসেছে দুজনেই। ও কিছুই জানেনা। মা কেবল কাঁদছে আর বলে চলেছে -আমার মেয়েটা আর বড় হবে না। ও কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর পাশ ফিরে শুলো। ঘোরার আগে কেবল বললো,আমায় একটু একা থাকতে দেবে? চোখ দিয়ে কেবল জল গড়িয়ে নামছে। বাবলি বড় হচ্ছে।