বড় হলে

সোমা (চক্রবর্তী) ঘোষ



পলা আর টুলা সবীতার দুই মেয়ে। ওদের বয়স যথাক্রমে বারো আর নয়। দুবেলা লোকের বাড়ি কাজ করে সবীতা সংসার চালায়। নারকেলডাঙার কোনো এক বস্তির এক কামরার ঘরে ওরা চারজন থাকে। ওদের বাবা রঘু, রাজমিস্ত্রীর কাজ করত। কিন্তু তার আবার হাঁপানির ব্যামো শুরু হয়েছিল কিছু বছর আগে, তাই সিমেন্ট বালির কাজ করলে অসুস্থ হয়ে পড়ত।
সবীতা স্বামীকে বলেছিল রাজমিস্ত্রীর কাজ ছেড়ে কোনও দোকানে গিয়ে বসতে। কিন্তু রঘুর মন অন্য কাজে সায় দেয় না। ইঁটের পরে ইঁট সাজিয়ে বিশাল অট্টালিকা থেকে শুরু করে মাঝারি মাপের বাড়ি আবার কখনও বা ছোট্ট সুন্দর ছবির মত বাড়ি বানিয়ে, বিভিন্ন বিত্তের মানুষের স্বপ্নকে লালন করা, তাকে ধীরে ধীরে সার্থক করে তোলার শিল্পী সে। তার পক্ষে দোকানঘরে বসে নিছক দর দাম করা অসম্ভব! তাই সামান্যই কাজে আর বেশীটা রোগশয্যায় রঘুর দিন কেটে যায়।
কিন্তু এভাবে তো চারটে মানুষের পেট চলে না। তাই সবীতাকে দুবেলা পাঁচবাড়ি ঠিকে ঝি এর কাজ নিতে হল। বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট পাট দিয়ে মোছা, কাপড় কাচা। এত কাজের পরেও বাবু বড়িতে বৌদিরা অম্লান বদনে আরও দুটো একটা অতিরিক্ত কাজের দাবী রেখে থেকে মাঝে মাঝেই।
সবীতা বোঝে তাকে দিয়ে ন্যায্য কাজের বেশী ব্যাবহার করে নেওয়ার বদ অভ্যাস প্রায় অধিকাংশ মালকিনের মধ্যেই রয়েছে। কারো বিপদে সে বুক দিয়ে দাঁড়াবে, কাজ করবে নিজের সীমার বাইরে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে- এতটুকু চিন্তা না করে। কিন্তু গিন্নীরা নিজেদের আলস্যের কারণে সবীতাকে ব্যাবহার করে নেবে দিনের পর দিন, এটা সে হতে দেবেনা। দেয়না কখনও। ফলতঃ, তার মালকিন বৌদিরা তাকে অন্যায্য ভাবে ব্যাবহার করে নিতে না পেরে সাময়িক বিরক্ত হলেও ওকে ছাঁটাই করতে পারেনা ওর সৎ ও দায়িত্ব সচেতন স্বভাবের জন্যে।
পাঁচ বাড়ি কাজ করা ঠিকে ঝি সবীতা একাধারে পরিশ্রমী সৎ এবং আত্মমর্যাদা সচেতন। সহজাত বুদ্ধির জোরে জীবন থেকে এই শিক্ষা সে গ্রহন করেছে। সবীতার হত দরিদ্র বাবা মনে করেনি মেয়ে সন্তানের লেখাপড়া করার কোনও প্রয়োজন আছে। বরং রঘু পাঠশালা পর্ব চুকিয়ে হাই ইস্কুলে কিছুদূর অব্দি লেখাপড়া করেছিল। তাই নিজের নাম সইটুকু করতে শিখে নিয়েছিল স্বামীর কাছেই নিরক্ষর সবীতা।
একবার এক কাজের বাড়ির আমায়িক মেসোমশাই সবীতাকে বলেছিলেন, “সবীতা, তোর মাথাটা খুব পরিষ্কার রে, পড়ালেখা করলে তুই আনেকদূর যেতে পারতি। সময় পেলে আমার কাছে আসিস। শেখার কি আর বয়েস হয়?’ একথা শুনে অব্দি সবীতার খুব ইচ্ছে হত যদি একদিন রঘু সুস্থ হয়ে ওঠে, আর ওর নিজের কাজ কম করলে চলে, সেদিন থেকে এই মেসোমশাই এর কাছে এসে পড়ালেখা শিখবে সে। যদিও এই ইচ্ছেপূরণ যে প্রায় অসম্ভব সে সবীতার ভালমতই জানা।
কিন্তু নিজের মেয়েদুটোকে নিয়ে দুচোখ ভরা স্বপ্ন রঘু আর সবীতার। ওই স্বল্প আয়ের মধ্যেও সবীতা, পলা টুলার জন্যে টাকা জমায়। না বিয়ে দেবার জন্যে নয়, ওদের শিক্ষার জন্যে।
দারিদ্রের মধ্যে যে আসম্মান আছে, উচ্চবিত্তের মানুষের দৃষ্টির মধ্যে যে সম্ভ্রমের অভাব আছে নিম্নবিত্ত শ্রেণীর জন্যে, তা বেঁধে সবীতাকে। আর সেই জ্বালা এক অদ্ভুত রকম তেজিয়ান আর জেদি করে তোলে তাকে। পলা টুলার মধ্যে এই জেদটুকু চারিয়ে দিতে থাকে সবীতা।
ওরা ছোট সবকিছু বোঝেনা। কিন্তু বিকেলে গলিতে খেলতে গেলে যখন বস্তির ওই শেষ মাথায়, দোতলা বাড়ির মেয়ে পিয়া আর তাই ভাই নেমে আসে পলা টুলার সাথে খেলা করতে, ওরা ভয়ে থাকে পাছে বাড়ির বড়রা দেখতে পায় আর বকা দিয়ে খেলা থেকে নিয়ে চলে যায়। পিয়ার অভিভাবকরা পছন্দ করেনা যে বাড়ির ছেলে মেয়েরা বস্তির বাচ্চাদের সাথে মিশুক। পিয়ার যদিও খুব ভাল লাগে পলা টুলাকে। পলা টুলারও খুব ভাল লাগে পিয়াকে।
কোনও কোনওদিন আসে লিওনা। কি সুন্দর মিষ্টি পুতুল পুতুল দেখতে ওকে। কেমন নতুন কায়দার ফ্রক পরে, প্যান্ট, স্কাট পরে। লিওনার বাবা মাকে দেখলে মনে হয় সিনেমার পোস্টারের নায়ক নায়িকাদের মত একেবারে। তাদের উঁচু গেটসহ বাগান আলা বিশাল বাড়ি, বড় গাড়ি, সাহেবি পোশাক। ওই তিনটে মাত্র মানুষের জন্যে কত্ব চাকরবাকর ওদের। পলা আর টুলা এমনকি টুয়াও ওদের দেখতে পেলে আবাক চোখে চেয়েই থাকে।
তবু লিওনা যখন কাজের লোকের হাত ধরে গলির মুখের রাস্তায় আসে তখন ওদের দিকে আড়চোখে দেখে। একদিন সাহস করে টুলা লিওনাকে হাতছানি দিয়ে ডাক দিল। আর লিওনা ছুট্টে এসে খেলায় যোগ দিল। একটু ছাড়া ছাড়া থাকলেও লিওনার ভালই লেগেছিল খেলতে। তারপর থেকে চলে আসে এক একদিন ওদের সাথে খেলতে। কেবল থেকে থেকেই ওর বাড়ির চাকর বলে ওঠে, “বেবি বাড়ি চল, কেউ দেখলে আমার কাজখান যাবে। তুমি ওইদিকে চল আমি তোমার সাথে খেলব নে।” লিওনা চাকরে কথা অগ্রাহ্য করে খেলতে থাকে। তবে ওর ভারি নাক উঁচু। সবসময় নিজের মতেই সবাইকে চালাতে চায়। যেটা প্রতিদিন মেনে নিতে বাকীদের ভাল লাগেনা।
পিয়ার ভাই বিট্টু ছোট্ট হলেও ধানি লঙ্কা একটা। একদিন সে এক ভয়ানক দুষ্টুমি করে বসল। লিওনার ফ্রকের পেছনের বেল্ট টেনে ধরে সুর করে বলতে লাগল, ‘এই যে ল্যাজ, এই দেখো ল্যাজ। লিওনার ল্যাজ’ আর এই শুনে টুয়া আর টুলা হেসে উঠল। পলা ওদের মধ্যে একটু বড়, ও বিট্টুর হাত থেকে লিওনার বেল্ট ছাড়িয়ে ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে ওকে চুপ করতে বলে।
লিওনার খুব মেজাজ। ও ভয়ানক রেগে গিয়ে বলল, “চুপ কর বাজে ছেলে। আমার ড্যাডকে বলে দিলে তোকে আর তোর দিদিকে আস্ত রাখবে না।”
পিয়া বলল, “তুমি খেলতে এসেছ কেন আমাদের সাথে? থাক’ না নিজের ড্যাডের কাছে”
“তুই আমাকে যেতে বলছিস? জানিস কে আমার ড্যাড? কে আমার দাদু?”
“ভয় পাব কেন তোমার ড্যাডকে আমরা? আমরা তো কিছুই করিনি। বিট্টু তো একটু মজা করেছে তোমার সাথে। মজা করলে রেগে যেতে হয়?” এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে পলা।
“তুমি বরং আমাদের সাথে ভাব করে নাও, কেমন?” টুলা দিদিকে দেখে সাহস করে বলে।
“ভাব তোদের সাথে?” লিওনার ফর্সা গাল দুটো কাশ্মিরী আপেলের মত লাল হয়ে উঠল, নাকের পাটা ফুলে উঠল। উত্তেজনা সামলিয়ে কোনোমতে সে মাথার চুল ঝাঁকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল পলাদের দিক থেকে। লিওনার চাকর বলে, “ বলেছিলাম এই সব ঝি-এর মেয়েদের সাথে না খেলতে- তুমি শুনলেনা” । “ঠিক বলেছিলে তুমি এই সব ছোটোলোকদের সাথে মিশতে নেই”- এই বলে হন হন করে হেঁটে বেরিয়ে গেছিল লিওনা, আর কোনো দিন এমুখো হয়নি।
বিট্টু সব দেখে শুনে কাঁদো কাঁদো হয়ে যায় দেখে পিয়া ভাইকে বলে, “ভাই, এসব যেন বাড়ি গিয়ে বলিসনা। তাহলে এখানে খেলতে আসা বন্ধ হয়ে যাবে। জানিস তো লুকিয়ে আসি।”

কিন্তু পলা টুলার মনে ওই ‘ঝি-এর মেয়ে’ ‘ছোটোলোক’ কথাগুল গেঁথে গেছিল। এটুকু ওরা জানত কথাগুল কেবল ওর আর টুলার উদ্দ্যেশ্যেই বলা। আর এও জানে কেনই বা পিয়া পলা-টুলা কে ভালবাসা সত্ত্বেও পিয়ার বাড়ির লোক ওদের সাথে মেলামেশা পছন্দ করেনা। সবাই ওদের ঘৃনার চোখে দেখে। কিন্তু কেন, কারণটা বুঝতে পারেনা।
সন্ধ্যায় পলা আর টুলা পড়তে বসেছে। দুজনের আজ ভীষন মন খারাপ। ইতিহাস বই খোলা পলার সামনে কিন্তু চোখে জল ভরে আসছে, অক্ষর গুল যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। টুলা অঙ্ক কষতে গিয়ে বার বার মুছে দিচ্ছে সংখ্যাগুল। মন নেই পড়াশোনায়।
“দিদি তুই কাঁদছিস?” টুলা বলে।
“কি হল, খাতায় কাটাকুটি করছিস কেন বার বার” পলা নাক টেনে চোখ মুছে মৃদু ধমক দেয় বোনকে।
“আমারও তো মন খারাপ”
“দূর বোকা, মন খারাপ কিসের? লিওনা খেলল না তো বয়েই গেছে। ওকে আমরা আর নেবইনা কোনোদিন। ”
“তাহলে তুই যে কাঁদছিস?”
“নাতো। মা রান্না করছে না, সেই ধোঁয়ায় চোখে জল এল।” বোনের কাছে ধরা দিতে লজ্জা পায় পলা।
সবীতা যখন সন্ধ্যেবেলা ফিরে এসে রান্না বসায় কেরোসিনের স্টোভ জ্বেলে, একটা মিষ্টি গন্ধের ধোঁয়ায় ভরে যায় তাদের এক কামরার বাড়িখানা তখন পলার মনটা ভালোলাগায় ভরে থাকে। মা যখন ডালে ফোড়ন দেয় গরম ডালের সুগন্ধে ম’ ম’ করে চারিপাশ, জিভে জল এসে যায় দুই বোনের। সামান্য আহার, কোনও দিন ভাতের সাথে কেবল কলমী শাক আর ডাল, কোনওদিন পেঁপের ডালনা। কোনওদিন তাও জোটে না কেবল ভাতে ভাত। তবু এক থালায় ভাত মেখে গরাস করে মা যখন মুখে তুলে দেয় কি যে অমৃত স্বাদ তার! বাবা হাতে কদাচিত টাকা পেলে মুর্গী নিয়ে আসে। মাসে এক দুবার মুরগীর ঝোল না চুনো মাছ জুটে যায়।
আজ ভেসে আসছে মাছ ভাজার গন্ধ। দুই বোনের মন মরা ভাব সবীতা কিভাবে যেন টের পেয়ে যায়, সে মাছ ভাজার চড় চড় শব্দকে ছাপিয়ে বলে, “ আজ তোদের জন্যে তাজা ট্যাংরা মাছ এনেছি। বেগুন দিয়ে চচ্চরি বানাবো। তাড়াতাড়ি পড়ে নে।”
টুলা বলে, “ আচ্ছা।”
ট্যাংড়া চচ্চড়ি শুনেও মেয়েদের উৎসাহ নেই দেখে একটু উদ্বিগ্ন হয় সবীতা। খেতে বসে টুলা যদিও বা দুঃখ ভুলে চোখ নাচিয়ে বড় বড় হাঁ করে এক এক গরাস খেয়ে নিতে থাকে কিন্তু পলার মন আজ সত্যি বিষণ্ণ। খাওয়ায় যেন রুচিই নেই তার। সবীতা নরম গলায় মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, “ আমাকে বলবি না পলা, কি হয়েছে?”
“ মা আমাদের কি দোষ? কেন সবাই এমন ভাবে আমাদের সাথে কথা বলে যেন আমাদের কত্ব অপরাধ?”
“কে কি বলেছে আমায় বল তো?”
“শুনলে তুমি কষ্টই তো পাবে মা! শুধু বল আমাদের দোষটা কি?”
“ দোষ কেন হবে? আমার মেয়েরা কি তেমন যে দোষ করবে? আর দোষ যদি করেও থাকে মাকে এসে বলে দেবে তো!।”
“আমরা কিচ্ছু করিনি মা, লিওনা দোষ করেছে।” টুলার পছন্দ হয়না দিদির এই রাখ ঢাক, তাই বলে দেয়।
“লিওনা কে?” সবীতা সবিস্ময়ে জানতে চায়।
“বড় রাস্তার ওপরে ঐ যে উঁচু গেট-আলা বাড়ির মেয়ে যে গো!” এবারও টুলাই উত্তর দেয়।
“ওমা সে তোদের সাথে খেলে বুঝি?” সবীতার বিস্ময় বাড়ে।
“রোজ খেলেনা। মাঝে মাঝে আসে। আজ এসেছিল। ওর তো বন্ধু নেই, রোজ গলি পেরিয়ে যাবার সময় আমাদের খেলার দিকে চুপি চুপি দেখত। তাই একদিন টুলা ওকে ডাক দিল খেলার জন্যে আর অমনি চলে এল। ”
“তারপর কি হল? কি দোষ করল তা বলবি তো?”
“ ওর আমাদের খেলা দেখে রোজ ইচ্ছে করত খেলতে, আমি বুঝতে পারি মা। তবু আসতে পারত না। তুমি তো জানো মা আমাদের সাথে খেলতে নেই। পিয়ার বাবা মাও তো চায়না আমাদের সাথে পিয়া আর বিট্টু খেলুক। তাইনা?” পলা এতটা বলে দম নেয়।
সবীতা গম্ভীর গলায় বলে, “যারা চায়না আসবেনা, তোরা দুই বোনে খেলবি। এত কথার কি আছে?” এবার পলা ও টুলা মিলে মা কে বিস্তারিত ঘটনার বর্ণনা দেয়। সব শুনে সবীতার মুখ কঠিন হয়। দু চোখ ঠিকরে যেন আগুন বেরিয়ে আসে।
সে বলে, “এতে আমাদের দোষ কেন হবে? গরীব বা বড়লোকে কি মানুষ ছোটো আর বড় হয়? বড় হয় মানুষ তার চরিত্রে।”
“মা তুমি আর বাবা লেখাপড়া জানোনা, আমরা বস্তিতে থাকি, আমাদের ভদ্রলোকের মত জামা নেই তাইজন্যে নাকি আমরা ছোটোলোক!” পলা বলে।
“আমাদের ছোটোলোক বলেছে লিওনা, ঝি-এর মেয়ে বলেছে! ” কাঁদতে কাঁদতে টুলা বলে।
সবীতা বুকে জড়িয়ে নেয় টুলাকে। বলে, “ লেখাপড়া করলে চাকরি হয় মানুষ আরামে থাকে, কিন্তু তার চেয়েও যেটা দরকার সেটা হল জ্ঞান হয়, তখন মানুষ তাকে সম্মান করে। কিন্তু যাদের লেখাপড়া করেও জ্ঞান হলনা তাদের চেয়ে ছোটো আর কে হয় বলতো?”
“মা তুমি কেন তাহলে দুখিয়াদের সাথে মিশলে আমাদের বক? বল ওদের সাথে না খেলতে? ওরাই কি তাহলে সত্যিকারের ছোটোলোক?” টুলা সরল ভাবে জানতে চায়।
“ মানুষ কখনও ছোটোলোক হয়না। কেবল শিক্ষা থেকেও যারা মানুষকে ছোটো চোখে দেখে তারাই ছোটো চিন্তার মানুষ। ওরা যে খারাপ কথা বলে, ওদের মা যে ওদের বলে দেয়না ওদের কি করা উচিত আর কি উচিত নয়। তাই বারণ করি মিশতে। কিন্তু ওরা যদি রোজ স্কুলে যায়, ওদের জ্ঞান হয় তবে কেন আমি মিশতে বারণ করব, বল?”
“তাহলে লিওনার বাবা মা, টুয়ার বাবা মা এরাই কি সব ছোটোলোক যে শিক্ষা থেকেও আমাদের শুধু গরীব বলে ঘেন্না করে?” পলা বলে রাগত স্বরে।
“ওকথা বলে না পলা! ওরা, ওদের মত আরও অনেকেই কেবল ওপর থেকে বিচার করে, গরীব মানুষকে ঘেন্না করে, ধরেই নেয় তাদের চরিত্র নেই। আর তাই মানুষকে সম্মান দিতে ভুলে যায়। দোষ আমাদের নয় রে দোষ ওদের।” বলতে বলতে সবীতার গলা ভার হয়ে আসে।
“ চরিত্র কি মা?” মায়ের রুক্ষ হাতখানা হাতে নিয়ে টুলা জিগ্যেস করে।
“আমি কি পড়াশোনা জানি যে এত বুঝিয়ে বলব, কিন্তু আমার মনে হয়, সৎ ভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচা, নিজেকে ও অন্যকে সম্মান দিতে শেখা, নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্ব নিতে শেখা আর মানুষের জন্যে মায়া মমতা রাখা – এটুকু থাকলেই বলা যায় সেই মানুষের চরিত্রটা পোক্ত। এর সাথে যদি জ্ঞান আর বুদ্ধি যোগ হয় তাহলে দুনিয়া তার কাছে নত হবে।”
“আমরা পড়াশোনা করে অনেক জ্ঞানী হব মা। আর কেউ আমাদের ঘেন্না করবেনা মা। তোমাকে বাবাকে কাউকে করবেনা। দেখো। ” পলা বলে।
“আর আমি বড় হয়ে চকরী করে তোমাকে অনেক আরাম দেব দেখো!” মায়ের গলা জড়িয়ে বলে টুলা। সবীতা অন্য হাতে পলাকেও টেনে নেয়, “তাইতো, আমার দুই মেয়ে চাকরী করলে আমি তখন আরাম করবনা তো কি?”
একটা অন্যরকমের দিনের আশায় তিন মা মেয়ে খুশীতে মেতে ওঠে। শয্যায় রঘুর চোখ দিয়েও দুফোঁটা আনন্দাশ্রু ঝড়ে পড়ে।