সোনা ব্যাঙ আর দুই বোনের গল্প

সুস্মিতা সরকার মৈত্র



শহরতলিতে একটা পুকুর ছিল। সেই পুকুরে অনেক সোনা ব্যাঙ বাস করতো। দুর থেকে দেখলে মনে হত যেন হলুদ ফুল ফুটে আছে পুকুরভর্তি। বর্ষাকালে ওরা সারাদিন গলা ফুলিয়ে ডাকাডাকি করতো। গ্যাঙর গ্যাং, গ্যাঙর গ্যাং। আশেপাশের জলা বুজিয়ে অনেক বহুতল তৈরি হলেও ওদের পুকুরটা এখনো আছে। খবর আছে যে এই পুকুর বোজানো হবে না। তাই পরিবার নিয়ে সোনা ব্যাঙরা সবাই ভালই আছে।
এই পুকুরে বড়সোনা নামের এক সোনা ব্যাঙ তার বউ আর একমাত্র ছেলে ছোটসোনাকে নিয়ে বাস করে। ছোটসোনা খুব লক্ষ্মী ছেলে। বাবা মায়ের সব কথা শোনে। বাবা মা যা খেতে দেয়, চেটেপুটে খেয়ে নেয়। ওদের নতুন বন্ধু হয়েছে উমনো আর ঝুমনো।
পাশেই যে বহুতল বাড়িটি আকাশের বুক চিরে উঠেছে তার এক তলায় গ্যারাজ। রাস্তের ধারের দোতলার জানলা দিয়ে প্রায়ই দুটি ছোট মেয়েকে দেখা যায়। খুব হাসিখুশি আর চঞ্চল এই দুই বোন উমনো আর ঝুমনোর সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গিয়েছে সোনা ব্যাঙের। খাবার জোগাড় করতে যাওয়া আসার সময়, কিম্বা ছোটসোনাকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার সময় ওদের খুব গল্প হয় উমনো আর ঝুমনোর সঙ্গে।
একদিন সকাল বেলায় বড়সোনা বেড়িয়েছে খাবারের সন্ধানে। উমনো ঝুমনোর জানলার সামনে এসে দেখে দুই বোন মুখ কালো করে বসে আছে।
‘কি হয়েছে উমনো? মুখ কালো কেন ঝুমনো?’
‘মা বকেছে।’
‘কেন, কেন? কি করেছো তোমরা? দুষ্টুমি নাকি?’
‘না বড়সোনা। আমরা দুষ্টুমি করি নি।’
‘তাহলে মা কেন বকলেন?’
‘কালকে ট্যুর থেকে ফিরে বাবা আমাদের দুজনকে একটা করে খেলনা দিয়েছে।’
‘বাহ, দারুণ মজা তো তোমাদের। কিন্তু মা কেন বকলেন? তোমরা খেলনা নিয়ে ঝগড়া করেছো নাকি?’
‘না বড়সোনা। আমরা ঝগড়া করি নি।’
‘তাহলে?’
‘আসলে বুনু ওর খেলনাটা হারিয়ে ফেলেছে।’ বুনুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ঢোঁক গিলে এতক্ষণে দিদিভাই আসল কথাটা বলেই ফেলল। আর যেই না বলা, বুনুর চোখের জল আর বাধা মানল না।
‘আমি ইচ্ছে করে হারাই নি।’ চোখের জল মুছতে মুছতে বলল বুনু।
‘আহা কাঁদে না ঝুমনো। তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমারও কান্না পায় যে! খেলনাটা কেমন দেখতে আর কি করে হারাল সেটা বরং বল আমাকে।’
‘খেলনাটা আসলে একটা ছোট্ট গাড়ি। সবুজ আর সাদা রঙের। আমি জানলায় চালাতে গিয়ে ওটা রাস্তায় পরে গেল। বাবা খুঁজতে গিয়েছিল, কিন্তু পেল না।’ কাঁদতে কাঁদতে বলল ঝুমনো।
‘জানলায় চালাতে বারন করেছিল বাবা। মা বলেছে বাবা আর কক্ষনো আমাদের কিচ্ছু দেবে না।’ পাশ থেকে দুঃখী দুঃখী মুখে উমনো জানালো।
‘এটা তো ঠিক কর নি ঝুমনো। বাবা মায়ের কথা শুনতে হয়, তাই না?’
উমনো আর ঝুমনো জলভরা চোখে ঘাড় নাড়ল।
‘আচ্ছা, আমি একটু পরে আসছি’ বলে বড়সোনা আর দাঁড়াল না।

বড়সোনা তড়িঘড়ি বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। বড়সোনা রাস্তায় অনেক সময় অনেক কিছু কুড়িয়ে পায়। পছন্দ হলে সেগুলো বাড়িতে নিয়ে আসে। হয়তো সোনালী কোন গয়না পেল, ও সেটা বউকে দেয়। খেলনা কিছু পেলে ছোটসোনাকে দেয়। আজ উমনো ঝুমনোর সঙ্গে কথা বলে ওর মনে পরেছে কাল বাড়ি ফেরার সময় একটা খেলনা গাড়ি রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে। নিয়ে গিয়ে ছোটসোনাকে দিয়েছিল। ছোটসোনা তো খুব খুশি। ওটা নিয়ে অনেকক্ষণ খেলে তারপর ওটা নিয়েই ঘুমাতে গেল। কাল রাতের অন্ধকারে গাড়িটার রঙ দেখা হয় নি।
বাড়িতে ঢুকে বড়সোনা দেখল ছোটসোনা গাড়িটা নিয়ে খেলছে। মুখ দিয়ে বু বু বু বু আওয়াজ করছে আর গাড়িটা ঠেলে ঠেলে চালাচ্ছে। হ্যাঁ, গাড়িটা সবুজ সাদা। বড়সোনা বুঝতে পারলো এটাই ঝুমনোর গাড়ি। একটু মন খারাপ হোল। ছোটসোনা এত খুশি হয়ে খেলছে গাড়িটা নিয়ে, কিন্তু এটা ফেরত দিতে হবে।
‘ছোটসোনা’, আলতো করে ডাক দিল বড়সোনা।
‘কি বাবা?’
‘ছোটসোনা, তোমার এই গাড়িটা না পেলে কি খুব মন খারাপ করবে?’
‘কেন বাবা?’
‘আমি কুড়িয়ে পেয়ে তোমাকে দিয়েছিলাম। কিন্তু আসলে এই গাড়িটা ঝুমনোর। ওদের বাবা কালই ওদের জন্য নিয়ে এসেছেন। ঝুমনো হারিয়ে ফেলেছে আর খুব দুঃখ পেয়েছে।’ একটু দম নিল বড় সোনা। ‘এখন জানতে পেরেছি যখন তখন ফিরিয়ে তো দিতেই হবে। তুমি মন খারাপ কর না, আবার অন্য খেলনা পেলে আমি তোমাকে এনে দেবো।’
‘না বাবা, আমার মন খারাপ করবে না। তুমি ঝুমনোকে খেলনাটা দিয়ে এসো।’
ছোটসোনাকে একটা চুমু দিয়ে গাড়িটা নিয়ে বেড়িয়ে এলো বড়সোনা।

উমনো আর ঝুমনো তখনও জানলায় পা ঝুলিয়ে বসে। জানলার নিচে এসে বড়সোনা ডাকল ওদের।
‘ঝুমনো, দেখ তো, এটাই তোমার গাড়ি নাকি?’
‘হ্যাঁ, তাই তো। তুমি কি করে পেলে?’ খুশিতে ঝলমল করে উঠল ঝুমনোর চোখমুখ।
‘কাল যখন রাস্তায় পরে গিয়েছিল, আমি বাড়ি ফিরছিলাম। কুড়িয়ে পেয়ে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম।’
‘তাই? থ্যাঙ্ক ইউ বড়সোনা। তুমি খুব ভালো।’
‘আচ্ছা, মাকে বল এসে নিয়ে যেতে, আমি এখানে রেখে যাচ্ছি।’
‘কিন্তু তোমার মুখটা এমন কেন লাগছে বড়সোনা? দুঃখী দুঃখী?’ উমনো জিজ্ঞেস করল।
‘আসলে ছোটসোনা খেলছিল। ওর খুব পছন্দ হয়েছিল গাড়িটা। তাই ওর কথা ভেবে একটু খারাপ লাগছে।’ আমতা আমতা করে বলেই ফেলল বড়সোনা।
‘বড়সোনা একটু দাঁড়াও। আমরা আসছি।’ দুপদাপ করে উমনো আর ঝুমনো জানলা থেকে নেমে গেল।
‘বুনু, আমাদের তো দুটো গাড়ি, একটা না থাকলে আরেকটা নিয়ে দুজনে খেলতে পারব। এটা বরং ছোটসোনার জন্য দিয়ে দিই।’ উমনো ঝুমনোকে প্রস্তাবটা দিল।
‘হ্যাঁ, আমাদের তো আরও অনেকগুলো গাড়ি আছে। এটা নিয়ে ছোটসোনাই খেলুক। কিন্তু দিদিভাই, তোমার নতুন গাড়িটা নিয়ে আমাকে খেলতে দেবে তো?’
‘হ্যাঁ।’ দিদিভাই ঘাড় কাত করে বলল।
‘যাই, মাকে জিজ্ঞেস করে আসি।’
মায়ের সঙ্গে কথা বলে আবার হুড়মুড় করে জানলায় উঠে বসল উমনো আর ঝুমনো।
‘বড়সোনা, তুমি গাড়িটা নিয়ে যাও। ছোটসোনা খেলুক।’ হাসিমুখে বলল উমনো।
‘হ্যাঁ, আমাদের তো আরও আছে, আমরা সেগুলো নিয়ে খেলব।’ ঝলমলে মুখে বলল ঝুমনো।
‘না উমনো তোমাদের মা বকবেন। ঝুমনোর মন খারাপ হবে।’
‘মা রাগ করবে না বড়সোনা। মা বলেছে তোমাকে নিয়ে যেতে।’
‘আমারও মন খারাপ হবে না। বরং ভালো লাগবে যে গাড়িটা নিয়ে ছোটসোনা খেলবে। আমরা অন্য গাড়ি নিয়ে খেলব।’
‘থ্যাংক ইউ উমনো, থ্যাংক ইউ ঝুমনো।’ খুব খুশি হয়ে বড় সোনা বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। সঙ্গে সবুজ সাদা গাড়িটা।
গাড়িটা ফিরে পেয়ে কেমন খুশি হবে ছোটসোনা ভেবে বড়সোনার মনটা আনন্দে ভরে গেল। কিছুটা দূরে গিয়ে একবার পিছনে তাকাল। জানলায় দুই বোনের হাসিমুখ দেখা যাচ্ছে এ