মায়ের সঙ্গে আড়ি

ইশরাত তানিয়া



জানলা দিয়ে টিং আজ আকাশ দেখছে না। পুরো আকাশ জুড়ে রোদ্দুর আর আলো। শীতের হাওয়া বইছে। আধভাঙা কমলালেবু হাতে নিয়ে টিং বসে আছে। মন দিয়ে দেখছে পিঁপড়ের সারি। একটি লাইন ধরে ওরা হেঁটে যাচ্ছে। মুখে মুখ লাগিয়ে। টিং এর ইচ্ছে করছে এক চিমটি চিনি এনে পিঁপড়েদের দিতে। ওরা তো মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। নিশ্চিত বুঝবে টিং ওদের বন্ধু হতে চায়।
মুশকিল হলো চিনির কৌটো রান্নাঘরে। মা সেখানে রান্না করছে। বাতাসে ফুলকপি আর শিম তরকারীর ঘ্রাণ। পিঁপড়েদের চিনি খেতে দেবে শুনলে খুব রাগ করবে মা। অবশ্য মায়ের সাথে টিংও রাগ করে আছে। মুখে কিছু বলেনি। আর কেনই বা রাগ করবে না? এই তো একটি দিন মাকে কাছে পাওয়া যায়। মা কলেজে পড়ায় তো, তাই ভীষণ ব্যস্ত। আজ ছুটি। তবু টিং মাকে পেল কই? এক সকাল সে ছবি এঁকেছে আর রঙ করেছে । ছবিতে মা আর টিং। মায়ের হাতে বেলুন আর টিং এর হাতে আইসক্রিম। ছবিটা যখন মায়ের হাতে দিল, মা তখন ফোনে নিন্নির সাথে কথা বলছে। দেখেও কেমন দেখল না। পাশের টেবিলে রেখে দিল। কথা বলতে বলতেই টিং এর চুলে ঝুঁটি করে দিল। তারপর ফোন হাতেই রান্নাঘরে ঢুকে গেল।
টিং ভেবেছিল মাকে স্কুলের গল্প বলবে। কাল ডোমেনিকা মিসের জন্মদিন ছিল। কার্ড বানিয়ে সেখানে একটি কবিতা লিখে সে মিসকে উপহার দিয়েছিল। মিস খুব খুশি কার্ড পেয়ে আর বলেছিল- “থ্যাঙ্ক ইউ, টিং! আমার জন্মদিনের সেরা উপহার এটি।” এই গল্পটি কাল রাতে মাকে শোনাতে চাইছিল টিং। তখনও হাতে ফোন। ভারি মন খারাপ হয় ওর। কমলালেবু রেখে সে পিঁপড়ে দেখতে লাগল। পিঁপড়ের নাকি ছয় পা। টিং বুঝতে পারছে না।
দুপুরে ভাত খেয়ে মা শুয়েছে। পাশে টিং। মায়ের সঙ্গে আড়ি। কোনো কথাই সে আর বলবে না। মাও কেমন! একটুকু বুঝতে পারছে না। লাল কমল আর নীল কমলের গল্প বলা শুরু করে মা’র চোখ ঘুমে বুজে এলো। দুপুরে একটু ঘুমোতে ইচ্ছে হয় না টিং এর। ওহ! কী বিচ্ছিরি এই ঘুম। তার চেয়ে ট্যাবে কার্টুন দেখা ভালো। আজ তো মন খারাপ তাই কার্টুনও ভালো লাগে না। বারান্দায় গিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল টিং। ওর পায়ের কাছে জলপাই আর কুলের আচারের বয়োম রোদ পোয়ায়। টিং এর চোখ জলে ভরে। মা একটুও ভালোবাসে না ওকে। গল্প তো শুনলই না। বললোও না। ঘুমিয়ে পড়ল। নিন্নি তো কবেই বলে দিয়েছে ওকে কুড়িয়ে এনেছে মা। তবে কি সত্যি তাই? হবে হয়তো!
আদি, রুশমি, সম একটু পর নিচে খেলতে আসবে। আজ না হয় টিং আগেই বেরুল। নভেম্বারের পড়ন্ত দুপুর নরম রোদ ছড়িয়েছে। ভেজা গাল মুছে টিং স্যান্ডেল পায়ে বেরিয়ে গেল। অন্যদিন এত কিছু লক্ষ্য করেনি। আজ দেখল ছোট ছোট গাছ রাস্তার ধারে আর গাছের গায়ে পানের খয়েরী পিক। ইশ! কে এমন করল? পাতাগুলো বলল- টিং, আমাদের গা ধুয়ে দাও। এখন টিং পানি পায় কই? ঐ তো পাশে নদী বইছে। টিং পা ডুবিয়ে দুহাত ভরে যেই পানি নিয়েছে এমনি ভুস করে মাথা তুলল বিরাট এক বোয়াল মাছ। বলল- মা’র সাথে রাগ করেছিস? আয়, আমার সঙ্গে থাকবি। জলের তলে কী ঠাণ্ডা! ভেজা ভেজা। ঢেউয়ের সাথে খেলবি। কত মাছ তোর সঙ্গী হবে! ঠিক তখন একটা কাঁকড়া এসে টিং এর পায়ের ছোট আঙুল কামড়ে দিল। মা গো! টিং পা ঝাড়া দেয়। বলে- বড্ড কাঁকড়া! আর আমার জামা কেমন ভিজে গেছে। ভীষণ সর্দি হবে জলের নীচে থাকলে। এই বলে দুহাতে পানি নিয়ে ফিরে এলো। ঢেলে দিল গাছের পাতায়। খুশি হলো ছোট গাছ।
গাছ আর নদীকে “টা-টা” দিয়ে হাঁটছে টিং। পায়ে নখের পাশে লালচে হয়ে আছে। সামনে কি বিশাল পাহাড়! পাহাড়ের ওপর গহীন অরণ্য। টিং ভাবল আদি, রুশমি আর সমের কথা। ওরাও পাহাড় ভালোবাসে। একা আসাটা ঠিক হয়নি। হঠাৎ ভয় লাগে টিং এর। মাথার ওপর বড় বড় গাছের পাতা সরসর করে কাঁপছে। ডালে বসে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী দুই পাখি। ব্যাঙ্গমী বলে- ও টিং, সোনা মেয়ে, মা’র সঙ্গে আড়ি নিয়েছিস বুঝি? আমিই তোর মা। আয়, গাছে উঠে আয়। এখানেই তুই থাকবি আমাদের সাথে। শুনে ভালোই লাগল টিং এর। কিন্তু কিছুতেই গাছ বেয়ে সে উঠতে পারল না। দুটো হাঁটু ছড়ে গেল। হাতের পাতা দুটোও ব্যথায় টনটন করছে। টিং বলে- না থাক, গাছে উঠে আর কাজ নেই। তুমি থাকো তোমার বাসায়।
বিকেল হয়ে এলো। টিং পাহাড় বেয়ে উঠছে। হাঁফ ধরে যায় ওর। চূড়োয় উঠে একটি ছোট্ট কুঁড়ে ঘর দেখতে পেল সে। যাক। এমন একটা ঘর পেলে ভালোই হয়। এখানেই থাকবে টিং। মা’র সাথে আর সে থাকছে না। টিং তো আর জানত না সেখানে থাকে কানী ডাইনী। ছোট ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে খায়। কুঁড়ের জানলায় উঁকি দিয়ে দেখে ঘর ফাঁকা। পেছনে গাছের নীচে মস্ত হাঁড়িতে টগবগ জল ফুটছে। বিচ্ছিরি এক বুড়ি উনুনের সামনে বসে। সাক্ষাৎ ডাইনী বুড়ি ঠিক যেমনটি সে দেখেছে গল্পের বইতে। বুড়ি কিন্তু টিংকে দেখেই বিকট হাসল আর দুহাত বাড়িয়ে ছুটে এলো। শনের মতো একমাথা চুল, কালো কালো দাঁত, সরু এক চোখ জ্বলছে। টিং ভয়ে কাঁপতে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ। ডাইনী বলে- ‘তোকে খাব। এত মিষ্টি দেখতে তুই। তোর হাড়গোড় না জানি কত মিষ্টি খেতে!’ একছুট্টে পাহাড় থেকে নামতে থাকে টিং। বুঝতে পারে কানী ডাইনী পিছু ছাড়েনি। ‘দাঁড়া পাজি মেয়ে’, ডাইনী বলে, ‘এই বয়সে আমি অত ছুটতে পারি?’ আছাড় খেয়ে পড়ে যায় টিং। এই বুঝি ডাইনী ধরে ফেলল! টিং আবার উঠে দাঁড়ায়। আবার ছুট। সারাটা গা কেটে ছড়ে গেল। টিং কাঁদছে ভীষণ। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে।
দৌড়তে দৌড়তে বাড়ির সামনে পৌঁছে গেল টিং। দুদ্দাড় সিঁড়ি ভেঙে মায়ের কাছে গেল। হাঁফাচ্ছে সে। মা এখনও ঘুমিয়ে। এক লাফে খাটে উঠে মায়ের বুকের ভেতর ঢুকে গেল সে। ঘুমের ভেতর মা টিংকে জড়িয়ে ধরল। আর তো কোনো ভয় নেই! কোথায় গেল কানী ডাইনী? ফিরে গেছে। মায়ের কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে নির্ঘাত। মায়ের গায়ের গন্ধে নাক ডুবিয়ে রাখে টিং। কী নরম আর মিষ্টি! ঘুমে টিং এর চোখ জড়িয়ে আসে। মায়ের চেয়ে ভালো আর কেউ নেই। আর কক্ষনো সে মা-কে ছেড়ে যাবে না।
...