রিন্টুর চাওয়া

নীতা বিশ্বাস



ক্লাসরুমের জানালা চোখ ফেরাতে দিচ্ছেনা রিনটুকে। সিঁড়িভাঙা অঙ্ক গুলো ভাঙার বদলে ভারা বেঁধে মজবুৎ উঠে গেছে চারতলাসমান উঁচুতে। মাথায় আট-দশখানা ইঁট নিয়ে রেজা গুলো অনায়াসে উঠে যাচ্ছে! যদি পা ফস্কায় তো! নিউটনের ল’ অফ মোশনের ফরমুলা ভেবে শিউরে উঠছে ও। আবার ওদের দারুণ ব্যালেন্স দেখে তারিফও করছে। স্কুলের নতুন বিল্ডিং যত উঁচু হচ্ছে, রিন্টুর তত মনে হচ্ছে জানালা টপকে ওদের কাছে চলে যায়। ইশ্‌, ওদের মতো যদি হতে পারতাম! রিন্টু ভাবে।
দুপুরে রোদ সরে গিয়ে জানালার নিচে মিষ্টি ছায়া পড়ে। ওরা সেই ছয়ায় বসে টিফিন ক্যারিয়র খুলে জলে ভেজা ভাত কি তৃপ্তি ভরে খায়। আমের আচারের গন্ধে জিভে জল এসে যায় রিন্টুর। মনে মনে ভাবে, ইশ আমি যদি ওই কুলি রেজা রাজমিস্ত্রী হতাম! নিজের টিফিনবক্স খুলে ব্রেড বাটার ডিমসেদ্ধ কলা দেখে গা গুলিয়ে ওঠে ওর। ডাস্টবিনে উপুড় করে ফেলে দেয় ওগুলো।
নিয়মমত পড়াশোনা তো করতেই হয় ওকে। কিন্তু সবথেকে ভালোবেসে পড়ে ও ইতিহাস আর ভুগোল। পেছন দিকে চলতে চলতে হাজার বছরের অতীত কে দেখতে পায় রিন্টু। যেসময়ের মাটিতে কোনো বিভাগের সীমারেখা টানা ছিলো না। ইতিহাস বইএর লেখাগুলো ছবি হয়ে, ছবিগুলো চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে। সেই প্রাগৈতিহাসিক গুহা-মানব দের দেখতে পায় ও। ওদের খাবার অন্বেষণের বিচিত্র উপায়, হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানোর অভিনব কৌশল শিহরিত করে ওকে। পদে পদে বিপদের হুংকার থেকে বাঁচার লড়াই লড়তে লড়তে কেমন করে ওরা শক্তির সাথে সাথে বুদ্ধিও অর্জণ করে নেয়। গুহার দেওয়ালে ছবি এঁকে ফুটিয়ে তোলে ওদের জীবন-সংগ্রামের দিনলিপি! কী কঠিন ছিলো তাদের জীবন যাত্রা। কি সরল ছিলো তাদের মন। ইশ্‌, আমি যদি সেই গুহামানব হতাম! রিন্টু হয়ে জন্মে রিন্টু একদম খুশি নয়।
রিন্টু ভাবে, কত ছেলে মেয়েই তো পড়া মুখস্ত করে চলেছে। একজন যদি তা না করে তাতে কার কিসের ক্ষতি! ভুগোল বই পড়তে পড়তে রিন্টু কত অজানা দেশে যে চলে যায়! কত প্রাচীণ শিলালিপি রিন্টু মুগ্ধ চোখে দেখে। কত আজটেক বান্টু মায়া সভ্যতার তলিয়ে যাওয়ার কাহিনি রিন্টুর চোখে জল এনে দেয়। তবু মুখ বুজে ওকে ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করবার প্রতিশ্রুতি পালন করতে হয়! কেউ ওর ভেতরটা পড়তে চায়না। অতীতের গভীরে বিচরণ করা একটা ছোট্ট ছেলেকে অভিভাবকরা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের রঙচঙে পাঠ পড়িয়ে চলে...
স্কুলের মস্তবড় বাগানে মালি কাকার পরিচর্যায় সারাবছর ফুলে ভরে থাকে। বাবার সাথে রিন্টুর বয়সি মালিকাকার ছেলে বুধিয়া মস্ত লম্বা পাইপে গাছের গোড়ায় জল দেয়। ঝারি দিয়ে পাতাবাহারের গাছ গুলোকে ধুয়ে পরিষ্কার তকতকে করে রাখে। এসব দেখতে দেখতে টিফিনের ছুটি শেষ হবার ঘন্টা বেজে যায়। টিফিন বক্স আর খোলাই হয়না। তাড়াতাড়ি বুধিয়াকে খাবারটা দিয়ে ক্লাসে ঢোকে। ভাবে, ইশ্‌, আমি যদি মালি কাকা হতাম! কিংবা তার ছেলেটা!
#
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেলা দুটো। স্কুল ভ্যান থেকে রিন্টু নেমে পড়ে মেন রোডের ধারে। রাস্তা আর বাড়ির মাঝে মহুয়ার মাঠ। মাঝারি এই মাঠের মঝখানে ভুঁইফোঁড়ের মত এক মহুয়াগাছ বিশাল ছায়া বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার গুড়িটার গায়ে সুদূর সময়ের চিহ্ন। সেই সময় বেয়ে রিন্টু কোথায় কোন কল্পরাজ্যে পাড়ি দেয়। রোজ সেই দেশ ঠিকানা পালটে নতুন হয়ে ওঠে। গাছের তলায় ছোট টিলার মতো দুটো পাথর। বাড়ি ঢোকার আগে এই পাথরের ওপর বসে ও। পাথর দুটোও খুশি হয়ে ওঠে। ওদের সাথে গল্প সেরে ঘরে ফেরে রিন্টু। সঠিক ফেরে কি! পা দুটো ফেরে কিন্তু মনটা দুপুরের হু হু হাওয়ার সাথে উড়ে যায় যে দেশে শুধুই থাকে অজানা গাছ, অচেনা ফুল পাখি আদিম সরল মানুষ; কোথাও কোন স্কুলবাড়ি নেই।
আজ ইঁট সিমেন্ট নিয়ে ভারা বেয়ে ওঠা রেজা দের অদ্ভুত ব্যালেন্সের কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনষ্ক রিন্টু মহুয়ার মাঠে নেমে অবাক! ওই বিশাল গাছের ছায়া জুড়ে কারা ওরা! বিচিত্র পোষাক পরা এক দল মানুষ, বাচ্চা কাচ্চা হাঁড়ি কুড়ি ছাগল গরু নিয়ে এক হৈ হৈ ব্যাপার! কাছে এসে দেখে ছোট ছোট তাঁবু খাটানো চলছে। বিস্ময়ে চোখের পলক পড়েনা রিন্টুর।
খাবার টেবিলে ভাত বেড়ে সুধামাসি ডাকছে। রিন্টুকে দেখেই সুধা মাসি বুঝেছে আজকের প্রশ্নের টপিক কি হবে। রিন্টুকে যত বিচিত্র গল্প শোনাবার লোক তো সুধামাসিই। মা-বাবার তো সারাদিন অফিসের ব্যাস্ততা!
সুধা মাসি বলে ওরা বেদের জাত। যাযাবর। পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে কোনো জায়গা ভালো লাগলে বোচকা নামিয়ে তাঁবু ফেলে কিছুদিন বিশ্রাম নেয়। ক্লান্তি দূর হলে আবার সব গুটিয়ে হঠাৎ করে চলে যায়।
যাযাবর মানে তো nomad মানে nomadic মানে gypsy (জিপসি) মানে বেদে বেদেনি! এদের কথা তো রিন্টু পড়েছে! আজ থেকে ক-ত ব-ছ-র আগে, প্রায় ফোর্টিন্থ সেনচুরিতে ভুমধ্যসাগরিয় দেশ গুলোতে ওদের অস্তিত্ব প্রথম জানা যায়। পথই ওদের সাথী। পথের নেশায় হাঁটতে হাঁটতে ওরা হাঙ্গেরি, পশ্চিম জার্মানী,ইটালি, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ডের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর আশ্চর্য! এদের ভাষায় নাকি আদি সংস্কৃতের ছোঁয়া আছে! তাই অনেকে মনে করে এই যাযাবর জিপসিরা ভারতবর্ষের। সেখান থেকেই ওরা ইউরোপ উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে। আবার হাজার বছরের অতীতে চলে যায় রিন্টু। আনন্দবিস্ময়ে শিহরিত হয়ে ওঠে ওর দিনগুলো। মা বারন করে দিয়েছে ওদের দিকে ঘেঁষতে। ওরা নাকি ছেলেধরা। ছেলেধরা কাকে বলে রিন্টু বুঝতে পারেনা। একটা কি যেন বাজনা বাজিয়ে ওরা কি সুন্দর সুর করে গান গায় মা যদি কোনোদিন শুনতো! যারা গান গায় প্রাণ খুলে তারা কি কখনো ছেলেধরা হতে পারে! খারাপ লোক হতে পারে! বড়দের মনটা ছোটদের মতো বুঝদার কেনো হয়না যে!
কেউ কারো ভাষা বোঝেনা অথচ ওদের ছোট ছোট ওর বয়সি ছেলে মেয়েদের সাথে রিন্টুর ভাব হয়ে গেছে। বন্ধুত্বের ভাষা বোধহয় সব দেশের সব জাতির মধ্যেই এক! সেখানে না-বোঝা বলে কিছু থাকেনা। অকারণে মানুষ মানুষকে কেন যে ভয় পায় বুঝতে পারেনা রিন্টু। কতদূর থেকে এসেছে ওরা। আবার কতদূর চলে যাবে। পথ ওদের কোনোদিনই ফুরোবেনা। ইশ্‌! আমি যদি ওদের মত যাযাবর হতাম! যদি রিন্টু বলে কেউ না থাকতো! যদি ওদের ঘরেই জন্মাতাম আমি! আফশোসে বুক ভেসে যায় রিন্টুর।
দীর্ঘশ্বাস কে ছুঁড়ে ফেলে দেয় রিন্টু। কী এক দূর্নিবার আকর্ষনে টানছে ওকে ওই বেদে বেদেনি জিপ্সির দল। পড়ার টেবিল, খাবার টেবিল, রাতের খাট-বিছানা সর্বত্র ওর চোখের সামনে ওদের ঘোরাঘুরি আর হাতছানি। রিন্টু ঠিক করে ফেলেছে, এবার আর ইশ্‌ নয়, দূরদূরান্তের গন্ধমাখা ওই মানুষ গুলোর সঙ্গে বেরিয়ে পড়বেই ও। একটা ছোট্ট ব্যাগে ও গুছিয়ে রেখেছে এক সেট জামা প্যান্ট আর সত্যজিৎ রায়ের লেখা ওর প্রিয় বইগুলো। আর কিছু চাইনা ওর। কিচ্ছু না। শুধু খেয়াল রাখতে হবে কবে ওরা এখান থেকে চলে যাবার প্ল্যান করছে। ওদের মতো সুন্দর সুরেলা গান আর ওই অপূর্ব তারের বাজনাটা বাজাতে বাজাতে কত দেশের মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলবে ও। ওদের মত সাপ খেলানো শিখবে, ওষুধ তৈরি করার গাছ পাতা শিকড় চিনতে শিখবে। আরো কত কি নতুন... ভাবতে ভাবতে এক অনাস্বাদিতপূর্ব আনন্দে মন মাতাল হয়ে উঠেছে রিন্টুর। আজ স্কুল ফেরত ওদের সাথে সব কিছু ব্যাবস্থা ও সেরে রাখবেই। এসব জল্পনায় মশগুল রিন্টু স্কুল-ভ্যান থেকে নেমে মহুয়ার মাঠের দিকে তাকাতেই ভীষণ জোর ধাক্কা খেলো। শূন্য মহুয়ার মাঠ দুপুর বেলার ধু ধু হাওয়ায় হু হু কান্নায় ভেঙে পড়তে লাগলো রিন্টুর বুকের ভেতরে।
কেউ যেন কোনোদিন ছিলোনা এখানে। এমনই কত মহুয়ার মাঠ জুড়ে স্মৃতি ছড়িয়ে রেখে যাযাবর রা এমনি ভাবেই নিরুদ্দেশের পথিক হয়ে যায় সকলের অজান্তে! কত রিন্টু আজও কাঁদে...